Published : 06 Apr 2026, 11:53 AM
প্রযুক্তি বিশ্বে অ্যাপলের ৫০ বছর পূর্ণ হলেও গারাজ থেকে শুরু হওয়া এ প্রতিষ্ঠানটির পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না।
স্টিভ জবসের হাত ধরে আসা যুগান্তকারী সাফল্যের পাশাপাশি লিসা কম্পিউটার থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ভিশন প্রো’র মতো বেশ কিছু ব্যর্থতাও অ্যাপলের ইতিহাসে রয়েছে।
বিবিসি লিখেছে, অ্যাপলের মতো খুব কম কোম্পানিই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহারকে এতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছে। এ সপ্তাহে ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা এ কোম্পানিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল স্যান ফ্রান্সিসকোর এক গারাজে, দুই বন্ধুর হাত ধরে।
দীর্ঘ এ পথচলায় কোম্পানিটি যেমন অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে তেমনই কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতারও মুখে পড়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন অ্যাপল পণ্য ব্যবহার করেন।
আর্থিক সেবাদাতা কোম্পানি ‘হারগ্রিভস ল্যান্সডাউন’-এর প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়াল বলেছেন, এ সাফল্যের পেছনে হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি অ্যাপলের মার্কেটিং কৌশলের বড় ভূমিকা রয়েছে।
“অ্যাপল কেবল পণ্য নয়, বরং স্বপ্ন বিক্রি করেছিল।” সেইসঙ্গে তারা ব্র্যান্ডিংকে পণ্যের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়েছিল, যা সেই সময়ে ছিল বেশ নতুন ধারণা।
তবে অ্যাপলের দূরদর্শী সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের মৃত্যুর পর তাদের সাফল্যের গতি কিছুটা কমেছে। কারণ কোম্পানিটি এখন নতুন কিছু উদ্ভাবনের চেয়ে আগে থেকে থাকা প্রযুক্তির মানোন্নয়নের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে।
জবসের সঙ্গে ১২ বছর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করা কেন সেগাল বলেছেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ও কোম্পানিকে লাভজনক রাখার ক্ষেত্রে বর্তমান সিইও টিম কুক ‘অসাধারণ কাজ’ করেছেন।
তিনি আরও বলেছেন, অ্যাপলের অনেক একনিষ্ঠ ভক্ত বর্তমান পর্যায় নিয়ে আগের মতো রোমাঞ্চিত নন, কারণ, ‘তাদের কাছে পুরোনো অ্যাপল মানেই ছিল স্টিভ জবস’।
অর্ধশতক পেরোনো অ্যাপলের সাফল্যের মুকুটে কিছু ব্যর্থতার কাঁটার কথা এবার জেনে নেওয়া যাক–
‘অ্যাপল লিসা’
১৯৮৩ সালে বাজারে আসা ‘অ্যাপল লিসা’ নামের পার্সোনাল কম্পিউটারটি কিছু ক্ষেত্রে ছিল পথপ্রদর্শক। সে সময় এর দাম ছিল প্রায় ১০ হাজার ডলার, যা ছিল ব্যয়বহুল।
অ্যাপল লিসা প্রথম দিকের এমন এক পিসি, যাতে ‘গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেইস’ ও মাউস ব্যবহৃত হয়েছিল।
তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষক পাওলো পেসকাতোর বলেছেন, ব্যবসায়িক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা এ কম্পিউটারটি ছিল ‘অতিরিক্ত দামি’, যার ফলে তা বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারেনি।
তিনি বলেছেন, এ ব্যর্থতা থেকে প্রমাণ মেলে, ‘পণ্যের সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করতে না পারলে সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকাই যথেষ্ট নয়’।
অ্যাপল তাদের এ ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছিল। এর ঠিক এক বছর পরেই তারা প্রথম ‘ম্যাকিনটশ’ বাজারে আনে, যার দাম ছিল গ্রাহকবান্ধব, ২ হাজার ৪৯৫ ডলার।
‘বাটারফ্লাই’ কিবোর্ড
২০১৫ সালে ল্যাপটপের জন্য চালু হয়েছিল অ্যাপলের ‘বাটারফ্লাই’ কিবোর্ড ডিজাইন, যা কোম্পানিটির ‘নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে বিরল এক ভুল পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছেন ‘অ্যাপল গিক’ ক্রেইগ পিকারেল।
ম্যাকবুক এয়ার-এর মতো বিভিন্ন ডিভাইসের জন্য তৈরি এ ডিজাইনে দুই দিকে কব্জাওয়ালা কিবোর্ড সুইচ ব্যবহৃত হয়েছিল, যা অনেকটা প্রজাপতির ডানার মতো দেখাত।
তবে ডিভাইসটি গ্রাহকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার তৈরি করেছিল। পিকারেল বলেছেন, অনেকে মনে করতেন এ মেকানিজমের কারণে কিবোর্ডে টাইপ করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এতে মনে হচ্ছিল অ্যাপল ‘টেকসই হওয়ার চেয়ে পাতলা হওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে’।
শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের মধ্যে কোম্পানিটি তাদের নতুন ১৬ ইঞ্চি ম্যাকবুক প্রো উন্মোচন করে, যেটিতে আর বাটারফ্লাই কিবোর্ড রাখা হয়নি।
‘ভিশন প্রো’
সিসিএস ইনসাইটের প্রযুক্তি বিশ্লেষক বেন উড বলেছেন, অ্যাপলের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের এক উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা হল ‘ভিশন প্রো’ হেডসেট। অ্যাপল ওয়াচের পর এটিই ছিল কোম্পানির বড় কোনো নতুন পণ্য।
উড বলেছেন, মিক্সড রিয়ালিটির ওপর অ্যাপলের এই বড় বাজি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কারণ ডিভাইসটি ছিল বেশ ‘ভারী ও ঝামেলার’ এবং অ্যাপলের অন্যান্য পণ্যের তুলনায় এতে কনটেন্টের যথেষ্ট অভাবও ছিল।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট ইনফরমেশনের তথ্য অনুসারে, বাজারে ছাড়ার কেবল কয়েক মাস পরেই কোম্পানিটি সাড়ে তিন হাজার ডলার দামের এ হেডসেটটির উৎপাদন কমিয়ে দেয়। আশানুরূপ চাহিদা না থাকা ও বিক্রি না হওয়া পণ্যের বড় মজুতই ছিল এর কারণ।
উড বলেছেন, এ হোঁচট খাওয়ার ফলে অ্যাপল সম্ভবত স্মার্ট চশমার মতো সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত পা বাড়ানোর বিষয়ে এখন অনেক সতর্ক থাকবে।