১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে ইন্টারনেটে ভুয়া এআই ভিডিওর বন্যা

আধুনিক প্রযুক্তির এ অপব্যবহার সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত এবং ডিজিটাল জগতকে এক ‘ভুয়া খবরের কারখানায়’ পরিণত করছে।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে ইন্টারনেটে ভুয়া এআই ভিডিওর বন্যা
এর নেপথ্যে মূল উদ্দেশ্য কেবল প্রচার নয়, বরং ভিউ বাড়িয়ে সামাজিক মাধ্যম থেকে মোটা অংকের অর্থ আয় করা। ছবি: বিবিসি

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Mar 2026, 04:21 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:07 PM

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি অসংখ্য ভুয়া ভিডিও এবং ছবি। নতুন সব উন্নত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক শ্রেণির কনটেন্ট নির্মাতা এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে, যা এরইমধ্যে কোটি কোটি বার দেখা হয়েছে অনলাইনে।

তবে এর নেপথ্যে মূল উদ্দেশ্য কেবল প্রচার নয়, বরং ভিউ বাড়িয়ে সামাজিক মাধ্যম থেকে মোটা অংকের অর্থ আয় করা। আধুনিক প্রযুক্তির এ অপব্যবহার সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত এবং ডিজিটাল জগতকে এক ‘ভুয়া খবরের কারখানায়’ পরিণত করছে।

বিশেষজ্ঞরা ‘বিবিসি ভেরিফাই’কে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যের যুদ্ধ নিয়ে এআই দিয়ে তৈরি করা ভুল তথ্যের এক নজিরবিহীন জোয়ার তারা লক্ষ্য করছেন। কনটেন্ট নির্মাতারা এখন সহজে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে অর্থ আয় করছে।

বিবিসি’র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই যুদ্ধ সম্পর্কে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবি করতে অসংখ্য এআই জেনারেটেড ভিডিও ও জাল স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব কনটেন্ট এরইমধ্যে কয়েকশ কোটি বার দেখা হয়েছে।

‘কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি’র ডিজিটাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ টিমোথি গ্রেহাম বলেছেন, “এই প্রচারণার মাত্রা সত্যিই আশঙ্কাজনক এবং এ যুদ্ধের ফলে বিষয়টি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

“আগে কোনো পেশাদার ভিডিও তৈরি করতে যা প্রয়োজন হত এখন এআই টুলের সাহায্যে তা কেবল কয়েক মিনিটেই করা সম্ভব। বিশ্বাসযোগ্য কৃত্রিম যুদ্ধের ফুটেজ তৈরির পথে যেসব বাধা ছিল তা এখন কার্যত পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।”

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হয়েছে। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় বেশ কিছু দেশ এবং ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে।

দ্রুত পরিবর্তনশীল এ যুদ্ধ পরিস্থিতির সর্বশেষ খবর জানতে এবং প্রকৃত ঘটনা বুঝতে অনেকেই এখন সামাজিক মাধ্যমের ওপর নির্ভর করছেন।

এ পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স ঘোষণা করেছে, কোনো নির্মাতা যদি লেবেল বা সতর্কতা ছাড়াই যুদ্ধের ভুয়া এআই ভিডিও পোস্ট করে তবে তাদের মনিটাইজেশন প্রোগ্রাম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।

প্ল্যাটফর্মটির এ মনিটাইজেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের পোস্টে অনেক ভিউ, লাইক ও শেয়ারের বিনিময়ে এক্স থেকে অর্থ পেয়ে থাকেন।

‘অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট’-এর ইরান বিষয়ক গবেষক মাহসা আলিমারদানি বলেছেন, “বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত যে, এক্স বুঝতে পেরেছে এআই দিয়ে ভুয়া ভিডিও তৈরি এখন বড় এক সমস্যা।”

টিকটক এবং ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল কোম্পানি মেটাও একই ধরনের ব্যবস্থা নেবে কি না এমন প্রশ্নে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি কোম্পানিগুলো।

‘বিবিসি ভেরিফাই’ এআই দিয়ে তৈরি এমন এক ভিডিওর খোঁজ পেয়েছে, যা দেখে মনে হয় ইসরায়েলের তেল আবিব শহরে মিসাইল হামলা হচ্ছে ও পটভূমিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

এ ভিডিওটি তিনশটিরও বেশি পোস্টে ব্যবহৃত এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজার হাজার বার শেয়ার হয়েছে।

কিছু ব্যবহারকারী ভিডিওটি আসল কি না তা নিশ্চিত হতে ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব এআই চ্যাটবট গ্রক-এর সাহায্য নিয়েছিলেন। তবে বিবিসি ভেরিফাই দেখেছে, অনেক ক্ষেত্রে গ্রক ভুলভাবে দাবি করেছে যে ওই এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওটি আসলে সত্যি।

আরেকটি ভুয়া ভিডিও কোটি কোটি বার দেখা হয়েছে, সেখানে দাবি করা হচ্ছে, দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা আকাশচুম্বী ভবনে আগুন লেগেছে এবং একদল মানুষকে সেই ভবনের দিকে দৌড়ে যেতে দেখা যাচ্ছে।

এআই দিয়ে তৈরি এ ভিডিওটি এমন এক সময়ে অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যখন দুবাইয়ের বাসিন্দা এবং পর্যটকরা ওই শহরে ড্রোন ও মিসাইল হামলা নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন।

গবেষক আলিমারদানি বলেছেন, “এই ধরনের ভুয়া ভিডিও ইন্টারনেটে পাওয়া যাচাইকৃত তথ্যের ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং আসল বিভিন্ন প্রমাণ খুঁজে বের করাকে অনেক কঠিন করে তোলে।”

বিবিসির বিশ্লেষণে এ যুদ্ধের এআই দিয়ে তৈরি কৃত্রিম স্যাটেলাইট ছবিও উঠে এসেছে।

যুদ্ধের প্রথম দিনে বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর ‘ফিফথ ফ্লিট’ সদর দপ্তরে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার বেশ কিছু আসল ভিডিও যাচাই করেছে বিবিসি।

তবে এর পরের দিনই ইরান সরকারের মদদপুষ্ট পত্রিকা ‘তেহরান টাইমস’-এর এক্স অ্যাকাউন্টে একটি বানোয়াট ছবি শেয়ার করা হয়, যেখানে দাবি করা হয়েছে, ওই ঘাঁটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এ ভুয়া ছবিটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনলাইনে প্রকাশিত বাহরাইনের এক মার্কিন নৌঘাঁটির আসল স্যাটেলাইট ছবির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। গুগলের ‘সিন্থআইডি’ জলছাপের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এ ভুয়া ছবিটি গুগলেরই কোনো এক এআই টুল ব্যবহার করে তৈরি বা এডিট হয়েছে।

আসল স্যাটেলাইট ছবি ও এআই দিয়ে বানানো ছবি উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, বাইরে পার্ক করা তিনটি গাড়ি ঠিক একই জায়গায় রয়েছে। অথচ দাবি করা হয়েছিল, ছবি দুটি এক বছরের ব্যবধানে তোলা। বাস্তবে এক বছরের ব্যবধানে এসব গাড়ি হুবহু একই অবস্থানে থাকা অসম্ভব।

গুগলের ভিডিও জেনারেটর ‘ভিও’সহ ওপেনএআইয়ের ‘সোরা’, চীনের এআই অ্যাপ ‘সিড্যান্স’ ও ‘এক্স’-এর নিজস্ব এআই গ্রক বর্তমানে জনপ্রিয় এআই প্ল্যাটফর্মের তালিকায় রয়েছে।

জেনারেটিভ এআই বিশেষজ্ঞ হেনরি আজডার বলেছেন, “বাস্তবসম্মত এআই কারসাজি বা ম্যানিপুলেশন তৈরির জন্য বর্তমানে যত ধরনের টুল পাওয়া যাচ্ছে তা নজিরবিহীন।

“আমরা এর আগে কখনও এসব টুলকে এত সহজে, সাশ্রয়ী ও সবার হাতের নাগালে থাকতে দেখিনি।”

প্রযুক্তি নীতি বিষয়ক অলাভজনক সংগঠন ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর নির্বাহী পরিচালক ভিক্টোরিয়া রিও বলেছেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কনটেন্ট আপলোডের প্রক্রিয়াটি এখন প্রায় পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড করা সম্ভব। এ কারণেই অনলাইনে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।”

মঙ্গলবার ‘এক্স’-এর পণ্য প্রধান বলেছেন, এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ছড়ানো অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে ৯৯ শতাংশই আসলে ‘মনিটাইজেশন গেইমিং’ বা চালাকি করে অর্থ আয়ের চেষ্টা করছে। তারা এমন সব কনটেন্ট পোস্ট করছে, যা মানুষের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা বা কৌতূহল তৈরি করে, যাতে প্ল্যাটফর্মের ‘ক্রিয়েটর রেভিনিউ শেয়ারিং’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ পকেটে ভরা যায়।

তবে এক্স কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি কতজন এ প্রোগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে বা তারা ঠিক কত অর্থ আয় করেছে। তবে বিশেষজ্ঞ টিমোথি গ্রেহামের ধারণা অনুসারে, ভেরিফাইড ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে প্রতি ১০ লাখ ভিউয়ের বিপরীতে এক্স প্রায় ৮ থেকে ১২ ডলার দেয়।

“এ আয়ের জন্য একজন নির্মাতাকে অবশ্যই এক্স প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন নিতে এবং তিন মাসের মধ্যে অন্তত ৫০ লাখ অর্গানিক ভিউ পেতে হয়।

“একবার এই প্রোগ্রামে ঢুকে পড়তে পারলে এআই দিয়ে তৈরি ভাইরাল বিভিন্ন কনটেন্ট অনেকটা অর্থ ছাপানোর মেশিনের মতো কাজ করে। এসব প্লাটফর্ম যেন ভুল তথ্য ছড়ানোর এক চূড়ান্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।”

‘ক্রিয়েটর রেভিনিউ শেয়ারিং’ প্রোগ্রাম নিয়ে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি এক্স।