পম্পেইয়ের ধ্বংসাবশেষে ২ হাজার বছরের ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন
এসব উপাদানে ভয়াবহ এক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে প্রাচীন রোমান শহরটির ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে সেখানকার দৈনন্দিন জীবনের এক বিরল চিত্র ফুটে উঠেছে।
পম্পেই নগরীর ধ্বংসাবশেষের ভেতরে প্রায় দুই হাজার বছর ধরে বন্ধ হয়ে থাকা এক কাঠের আলমারি থেকে মেইকআপ সরঞ্জাম, পারফিউমের বোতল, মুদ্রা ও শিশুর হারসহ নানা ধরনের ব্যক্তিগত বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে।
এসব উপাদানের মাধ্যমে খ্রিস্টাব্দ ৭৯-এ মাউন্ট ভিসুভিয়াসের ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে প্রাচীন রোমান শহরটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে সেখানকার অধিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনের এক বিরল চিত্র ফুটে উঠেছে।
পম্পেইয়ের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক ‘ভিয়া দেল আবোনদানজা’র এক বাড়ির কক্ষ থেকে এ কাঠের আলমারিটি উদ্ধার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
আলমারির ভেতরে পাওয়া বস্তুগুলোর মধ্যে ছিল চিমটা, পারফিউমের একটি ছোট কাঁচের বোতল, একটি ধূপদানি ও ব্রোঞ্জের তৈরি একটি লণ্ঠন।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তুটি ছিল একটি হার, যাতে বিভিন্ন উপাদানে তৈরি ২০টিরও বেশি ছোট ছোট লকেট ছিল। এগুলো ‘বেস’ ও ‘মারকারি’’সহ বেশ কয়েকজন দেব-দেবীর অবয়বে তৈরি।
‘ক্রিপুনদিয়া’ নামে পরিচিত এই ধরনের হার প্রচলিতভাবে শিশুরা পরত। হারের ঝুলন্ত লকেটগুলো নড়াচড়ার সময় শব্দ করত, যা দেখে অভিভাবকরা সন্তানদের অবস্থান বুঝতে পারতেন। এগুলো পরিচয় শনাক্তেও ব্যবহৃত হত।
পম্পেই প্রত্নতাত্ত্বিক পার্কের পরিচালক গ্যাব্রিয়েল জুখট্রিগেল বলেছেন, “ক্রিপুনদিয়ার বিশেষ কাজ ছিল, যা সম্ভবত দূরে কোথাও থাকা মা-বাবার স্মৃতিচিহ্ন বহন করত। বিষয়টি ওই সমাজের মানুষের কাছে স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। কারণ তারা প্রায়শই স্থানান্তরিত হতেন।
“ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অনেকেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতেন ও ব্যক্তিগত এসব জিনিস সঙ্গে রাখতেন।”
আলমারিটিতে ৩৮টি ব্রোঞ্জের মুদ্রা, রান্নার পাত্র ও সীসার ওজন মাপার বাটখাড়াসহ একটি কাঠের বাক্সও মিলেছে, যা থেকে অনুমান করা হচ্ছে, ওই বাড়িতে কোনো ব্যবসায়ী বসবাস করতেন।
জুখট্রিগেল বলেছেন, “অগ্ন্যুৎপাতের তীব্রতায় এখানকার অধিবাসীদের কতটা দ্রুত ও আকস্মিকভাবে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল, তা অর্থ ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য নানা জিনিস ফেলে যাওয়ার ঘটনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে।”
গবেষকরা ওই বাড়ির এক ভাণ্ডারে রাখা বিশেষ মাটির পাত্র বা ‘অ্যামফোরা’র ভেতর থেকে দুটি ইঁদুরের খণ্ডিত কঙ্কালও উদ্ধার করেছেন।
আগে আবিষ্কৃত কিছু শিলালিপির সূত্রে বাড়িটিকে ‘করনেলিয়াস ম্যাক্সিমাস’ নামের এক ব্যক্তির বাসস্থান বলে মনে করা হত। তবে সেসব লেখা এখন আর দৃশ্যমান নেই।
১৯১২ সালে প্রথম বাড়িটির সামনের অংশ খনন করা হয়েছিল। তবে একটি বিস্তৃত সংস্কার প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা কেবল এখন এর ভেতরের কক্ষগুলোতে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন।
পাশাপাশি, পম্পেইয়ের শহরতলিতে অবস্থিত বিখ্যাত ‘ভিলা অফ দ্য মিস্ট্রিজ’-এও নতুন করে খননকাজ শুরু হয়েছে, যা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রথমবারের মত আলোর মুখ দেখেছে।
জুখট্রিগেল বলেছেন, “এর খননকাজ কখনই পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে আমরা সেই কাজটি সম্পূর্ণ করতে চাই। তবে আমরা এবার ধনাঢ্য মালিকদের থাকার জায়গা বা যেখানে চোখধাঁধানো ফ্রেস্কো চিত্রকর্ম রয়েছে সেখানে খনন করছি না, বরং আমরা অনুসন্ধানের জন্য বেছে নিয়েছি সেবকদের থাকার স্থানগুলোকে।
“এর মাধ্যমে ইতিহাসের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনীতির বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা মিলবে। কারণ ভিলা অফ দ্য মিস্ট্রিজের অধিকাংশ অধিবাসীই ছিলেন সেবক।”
প্রাচীন এই শহরটির ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে প্রতিনিয়তই নিত্যনতুন আবিষ্কার উঠে আসছে।
এর আগে, ২০২৫ সালে শহরের ধনাঢ্য এলাকা ‘রেজিও ৯’-এর ‘ভিয়া দি নোলা’ সড়কের একটি বাড়িতে খননকালের বড় ও সুসজ্জিত উষ্ণ স্নানাগার কমপ্লেক্সের সন্ধান মিলেছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, বাড়ির মালিক ধনী ও প্রভাবশালী অতিথিদের আপ্যায়ন ও প্রভাবিত করার জন্য এই স্নানাগার ব্যবহার করতেন।
এরও আগে, ২০২৩ সালে একই এলাকা থেকে সংকীর্ণ রুটি তৈরির কারখানা বা বেকারির সন্ধান মেলে। গবেষকদের ধারণা, সেখানে সেবকদের বন্দি রেখে জোরপূর্বক রুটি বানানোর কাজ করানো হত।
