জাদুঘরের ড্রয়ারে ১০০ বছর লুকিয়ে ছিল মাংসাশী ডাইনোসর
১৯২৪ সালে প্রথম এ জীবাশ্মের খোঁজ মেলে। সেই থেকে এটা ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের একটি ড্রয়ারে পড়ে ছিল। কয়েক বছর আগ পর্যন্ত কেউ এর দিকে খেয়াল করেননি।
যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ উপকূলীয় আইল অব ওয়াইট দ্বীপে পাওয়া গেছে প্রায় ১২ কোটি বছর আগের বাঘ আকারের এক ভয়ংকর শিকারি ডাইনোসরের মাথার খুলির একাংশ।
প্রাগৈতিহাসিক যুগের এই আবিষ্কারের মাধ্যমে ‘মেগার্যাপ্টোরান’ নামের রহস্যময় মাংসাশী ডাইনোসর গোষ্ঠী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
এগুলো প্রধানত দ্রুত দৌড়ে শিকার ধাওয়া করা ও হাতের বড় থাবা দিয়ে শিকার চিরে ফেলার জন্য পরিচিত ছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
গবেষকরা বলছেন, আবিষ্কৃত জীবাশ্মটি ‘ইনভিক্টিবেলাট্রিক্স অ্যাম্বারিনা’ নামের নতুন এক প্রজাতির ডাইনোসরের, যা ক্রেটেসিয়াস যুগের মেগার্যাপ্টোরান ডাইনোসর বংশের শুরুর দিকের এক সদস্য।
ইউরোপ মহাদেশ থেকে আবিষ্কৃত এটাই প্রথম মেগার্যাপ্টোরান। এটি আদি মেগার্যাপ্টোরানদের মাথার খুলির গঠন বোঝার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে এই গোষ্ঠীর ছড়িয়ে পড়ার ধরন জানতে সাহায্য করছে।
আকারে কিছুটা ছোট হলেও ইনভিক্টিবেলাট্রিক্সের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৬ ফুট ও ওজন বড় আকারের বাঘের মতো। গবেষকরা বলছেন, এদের দেহ হয়ত তন্তুময় এক ধরনের পলক বা পেখমে ঢাকা ছিল।
সকল মাংসাশী ডাইনোসরের সমন্বয়ে গঠিত ‘থেরোপড’ দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল মেগার্যাপ্টোরানরা।
গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক ও ইংল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ লিডস’-এর পোস্টডক্টরাল গবেষক ক্যাসিয়াস মরিসন বলেছেন, “অন্যান্য থেরোপড ডাইনোসরের তুলনায় মেগার্যাপ্টোরানরা বেশ ব্যতিক্রমী। এদের মাথা ছিল তুলনামূলক ছোট ও সরু।
“তবে এদের হাত ছিল দীর্ঘ ও শক্তিশালী। সেই সঙ্গে হাতে ছিল বড় বড় থাবা ও দেহে কঙ্কাল ছিল অত্যন্ত হালকা গঠনে তৈরি। এ শারীরিক বৈচিত্র্য থেকে বোঝা যায় মেগার্যাপ্টোরানরা ছিল চটপটে শিকারি।
“এরা দ্রুত দৌড়ে শিকার ধাওয়া করতে পারত এবং শক্তিশালী দীর্ঘ হাত ও ধারালো থাবা ব্যবহার করে শিকারকে পাকড়াও করার পাশাপাশি পেট চিরে ফেলত।”
বিজ্ঞানীদের জানামতে সবচেয়ে বড় মেগার্যাপ্টোরান ছিল ‘মাইপ’, যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩৩ ফুট। ইনভিক্টিবেলাট্রিক্সের বিলুপ্তির প্রায় ৫ কোটি বছর পর ডাইনোসর যুগের শেষভাগে দক্ষিণ আমেরিকার পাতাগোনিয়া অঞ্চলে রাজত্ব করত এরা।
ইনভিক্টিবেলাট্রিক্সের মতো ছোট আকারের মেগার্যাপ্টোরানরা ছোট আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী, ক্ষুদ্র সরীসৃপ ও ডাইনোসর ছানাদের শিকার করত। আর বড় মেগার্যাপ্টোরানরা লক্ষ্য বানাত বড় বড় তৃণভোজী ডাইনোসরকে।
টিরানোসরাস রেক্সের মতো বড় শিকারিদের শিকার করার কৌশলের একদম বিপরীত ছিল মেগার্যাপ্টোরানদের পথ। টিরানোসরাস নিজেদের বড় মাথা, দাঁত ও প্রকাণ্ড কামড়ের শক্তির ওপর নির্ভর করত, যেখানে তাদের ছোট্ট দুটো হাত শিকারের কাজে প্রায় কোনো ভূমিকাই রাখত না।
অন্যদিকে, মেগার্যাপ্টোরানদের মূল শক্তিই ছিল এদের হাত ও থাবা। তবে ‘আইল অব ওয়াইট’-এ ইনভিক্টিবেলাট্রিক্স মূল বা শীর্ষ শিকারি ছিল না।
সেখানে আরও বড় আকারের থেরোপড ও রকমারি তৃণভোজী ডাইনোসর চরে বেড়াত। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বর্তমানকালের হায়েনার মতো পরিবেশগত ভূমিকা রাখত এ ইনভিক্টিবেলাট্রিক্স।
ডাইনোসরদের বংশলতিকায় মেগার্যাপ্টোরানদের অবস্থান ঠিক কোথায় তা নিয়ে জীবাশ্মবিদদের মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়েছে।
গঠন ও শিকার করার কৌশলে পার্থক্য থাকলেও অনেকের ধারণা, মেগার্যাপ্টোরানরা টিরানোসরাসেরই নিকটাত্মীয় ছিল, যারা ক্রেটেসিয়াস যুগের শেষদিকে উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করেছিল।
‘অপরাজিত নারী যোদ্ধা’
‘ইনভিক্টিবেলাট্রিক্স’ শব্দটির অর্থ ‘অপরাজিত নারী যোদ্ধা’।
গবেষক মরিসন বলেছেন, অতি সাধারণ পথচলা শুরু করলেও সময়ের পরিক্রমায় মেগার্যাপ্টোরানরা দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকায় শীর্ষ শিকারিতে পরিণত হয়।
সেখানে এরা হয়ে ওঠে রাজত্বকারী ‘রানী’, ঠিক যেমন উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ায় রাজত্ব করত ‘একচ্ছত্র সম্রাট’ খ্যাত টিরানোসরাস রেক্স।
বিজ্ঞানী দল এখন এ রহস্যময় মেগার্যাপ্টোরানদের বিবর্তনের ইতিহাস উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন। বহুল প্রচলিত একটি তত্ত্ব অনুসারে, মেগার্যাপ্টোরানদের উৎপত্তি ঘটেছিল এশিয়ায়।
এরপর এরা ইউরোপ হয়ে আফ্রিকায় ও সেখান থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসরদের বিলুপ্তি ঘটার পূর্ব পর্যন্ত এরা বহাল তবিয়তে সেখানে টিকে ছিল।
তবে এতদিন ইউরোপে কোনো মেগার্যাপ্টোরানের অস্তিত্বের জীবাশ্ম প্রমাণ না থাকায় এ তত্ত্বে বড় ঘাটতি ছিল। নতুন এ আবিষ্কার সেই শূন্যতা পূরণ করল।
গবেষণাপত্রের সহ-লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ কলেজ লন্ডন’-এর গবেষণারত শিক্ষার্থী চার্লি শেরার বলেছেন, “মাংসাশী থেরোপড ডাইনোসরদের অন্যতম রহস্যময় এ গোষ্ঠীর বিবর্তন বুঝতে এই আবিষ্কার ভূমিকা রাখবে।”
ইনভিক্টিবেলাট্রিক্সের জীবাশ্মটি মাথার কঙ্কালের একটি অংশ, যা প্রায় এক শতাব্দী আগে আবিষ্কৃত হয়েছিল। ১৯২৪ সালে লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম এটি সংগ্রহ করে।
শেরার বলেছেন, “সেই থেকে জাদুঘরের একটি ড্রয়ারে পড়ে ছিল এটা। কয়েক বছর আগ পর্যন্ত কেউ এটার দিকে খেয়ালই করেনি।”
শারীরিক গঠনে টিরানোসরাস রেক্সের তুলনায় ইনভিক্টিবেলাট্রিক্স কিছুটা ছোট হলেও মানুষের জন্য এটা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
কোনো মানুষ যদি টাইম ট্রাভেল করে সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে চলে যায় তবে টি-রেক্সের চেয়ে ইনভিক্টিবেলাট্রিক্স মানুষের জন্য বেশি প্রাণঘাতী হতে পারে।
গবেষক মরিসন বলেছেন, “টি-রেক্সের মতো বড় আকৃতির ডাইনোসরের জন্য মানুষ অনেক ছোট এক শিকার। এদের যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন তাতে মানুষকে শিকার হিসেবে ধরা খুব একটা লাভজনক মনে হবে না।
“ফলে টি-রেক্স হয়ত মানুষের দিকে খেয়ালই করবে না। তবে ইনভিক্টিবেলাট্রিক্সের মতো তুলনামূলক ছোট ডাইনোসরের জন্য মানুষ একদম সঠিক আকারের শিকার।
“মানুষের ওজন এদের ওজনের তিন বা চার ভাগের এক ভাগ, যা এদের জন্য বেশ স্বাস্থ্যকর ও তৃপ্তিদায়ক এক বেলা খাবারের মতো। মানুষকে ধাওয়া করে পাকড়াও করার মতো দারুণ চপলতা ও গতি ইনভিক্টিবেলাট্রিক্সের ছিল।”
