Published : 08 Sep 2025, 04:50 PM
কাজ কিংবা বিনোদনের মাঝখানে সবচেয়ে বিরক্তিকর জিনিসগুলোর একটি হলো ধীরগতির কম্পিউটার। দিনভর ব্রাউজিং, স্ট্রিমিং বা একসঙ্গে একাধিক অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের পর এমনটা প্রায় সবার সঙ্গেই ঘটে।
হঠাৎ করেই কম্পিউটারের ফ্যান অবিরাম ঘুরতে থাকে, অ্যাপ্লিকেশনগুলো বারবার ফ্রিজ বা ক্র্যাশ করে, এমনকি ওয়েবসাইট লোড হতে বা ডকুমেন্ট সেভ হতেও অস্বাভাবিক সময় নেয়। অনেকেই প্রশ্ন করেন “আমার কম্পিউটার এত স্লো কেন?” আর এর উত্তর ও সমাধান আসলে খুব দূরে নয়।
প্রযুক্তি সাইট ‘হাও স্টাফ ওয়ার্কস’ লিখেছে, কিছু কারণ রয়েছে যেগুলোয় খেয়াল রাখলে কম্পিউটার ধীর হওয়া থেকে কিছুটা রক্ষা করা সম্ভব। এগুলো হলো-
র্যাম ফুরিয়ে আসা
টেক বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ ব্যবহারকারীরা বলছেন ধীরগতির প্রধান কারণগুলোর একটি হলো র্যাম বা র্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরি কমে যাওয়া।
র্যাম হলো কম্পিউটারের অস্থায়ী মেমোরি যেখানে প্রসেসর দ্রুত ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ফাইল জমা রাখে। কোনো সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন বেশি রিসোর্স ব্যবহার করলে, বিশেষ করে ব্যাকগ্রাউন্ডে আপডেট চলতে থাকলে তা কম্পিউটারকে ধীর করে দেয়।
খোলা প্রতিটি অ্যাপ্লিকেশনই সিপিইউ ও র্যাম-এর জায়গা দখল করে। ব্রাউজারের আলাদা ট্যাব, ব্যাকগ্রাউন্ড প্রক্রিয়া, স্পটিফাইয়ের মতো মিউজিক স্ট্রিমিং কিংবা অ্যান্টিভাইরাসের স্ক্যান সবকিছু মিলে যখন র্যাম শেষ হয়ে আসে তখন সিপিইউ চাপে পড়ে যায় এবং প্রোগ্রামগুলো ধীরে চলে, ফ্রিজ হয় কিংবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
প্রথম পদক্ষেপ হলো অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ্লিকেশনগুলো বন্ধ করে দেওয়া।
উইন্ডোজে কন্ট্রোল+অল্টার+ডিলিট চাপ দিয়ে টাস্ক ম্যানেজার খুলে দেখা যায় কোন প্রোগ্রাম সবচেয়ে বেশি র্যাম ও সিপিইউ ব্যবহার করছে।
ম্যাক কম্পিউটারে অ্যাপ্লিকেশনস > ইউটিলিটিস > অ্যাক্টিভিটি মনিটর-এ গিয়ে একই তথ্য জানা যায়।
ক্রোমবুকে ব্রাউজারের উপরে তিনটি ডটে ক্লিক করে > মোর টুল > টাস্ক ম্যানেজার-এ গিয়ে তা দেখা সম্ভব।
যেসব প্রোগ্রাম বারবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায় সেগুলো বন্ধ করতে হবে। অতিরিক্ত ব্রাউজার ট্যাব খোলা থেকেও সমস্যা বাড়ে। ১০-২০টি ট্যাব একসঙ্গে খোলা থাকলে র্যাম দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়।
তবে, সমস্যা কেবল সফটওয়্যারে নয় অনেক সময় হার্ডওয়্যারেরও সীমাবদ্ধতা থাকে। চার বছরের বেশি পুরোনো কম্পিউটার বা বাজেট মডেলগুলোতে সাধারণত কম র্যাম থাকে যা নতুন ও মেমোরি-খেকো অ্যাপ্লিকেশন চালাতে যথেষ্ট নয়।
টেক বিশেষজ্ঞ ফিল ভ্যামের মতে, “অনেকে মনে করেন ৪ জিবি র্যাম যথেষ্ট কিন্তু আজকাল স্মার্টফোনেও এর চেয়ে বেশি র্যাম থাকে। বাস্তবে, ন্যূনতম ৮ জিবি র্যাম দরকার আর ১৬জিবি র্যাম হলে ৯৯ শতাংশ ব্যবহারকারীর জন্য যথেষ্ট হবে।”
তাই বলা যায় ধীরগতির কম্পিউটারের পেছনে বড় কারণ র্যাম ঘাটতি ও রিসোর্সের অযথা ব্যবহার। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ বন্ধ করা, স্টার্টআপ প্রোগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করা ও পর্যাপ্ত র্যাম ব্যবহার করলেই সমস্যার বড় অংশ কমে আসবে।
হার্ড ড্রাইভ পূর্ণ হয়ে যাওয়া
কম্পিউটার ধীরগতিতে চলার আরেকটি সাধারণ কারণ হলো হার্ড ড্রাইভ পূর্ণ হয়ে যাওয়া। হার্ড ড্রাইভকে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি মেমোরি হিসেবে দেখা হয় কিন্তু এটি কেবল স্থায়ী ডেটা সংরক্ষণেই ব্যবহার করা হয় না, অস্থায়ী ফাইলও এখানে সেইভ হয় যা বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন মসৃণভাবে চালাতে সাহায্য করে।
যদি হার্ড ড্রাইভ প্রায় পূর্ণ হয়ে যায়, তবে কম্পিউটার স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মসৃণভাবে কাজ চালানোর জন্য হার্ড ড্রাইভের অন্তত ২০ শতাংশ জায়গা ফাঁকা রাখা উচিত।
সমাধানের জন্য অস্থায়ী ফাইল মুছে ফেলা, অপ্রয়োজনীয় সফটওয়্যার আনইনস্টল করা এবং বড় ফাইলগুলো ক্লাউডে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেমন ম্যাক-এ ছবি ও ভিডিও আইক্লাউডে রাখা যায়, উইন্ডোজ ব্যবহারকারীদের জন্য মাইক্রোসফট ওয়ানড্রাইভ আছে আর গুগল ব্যবহারকারীদের জন্য রয়েছে ১৫ জিবি ফ্রি স্টোরেজ সুবিধা।
কেবল জায়গা না থাকার কারণে নয়, পুরোনো প্রযুক্তির হার্ড ড্রাইভ ব্যবহার করলেও গতি কমে যেতে পারে। পুরোনো হার্ড ড্রাইভে ঘূর্ণায়মান ডিস্ক ব্যবহার হয় যা সময়ের সাথে ত্রুটি এবং পারফরম্যান্স সমস্যার সৃষ্টি করে। এতে ‘ফ্র্যাগম্যান্টেশন’ নামে একটি সমস্যা হয় যেখানে ফাইলগুলো এক জায়গায় না থেকে টুকরো টুকরো হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকে ফলে কম্পিউটার গুরুত্বপূর্ণ ডেটা দ্রুত খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ে।
এ কারণে পুরোনো ডিস্ক-ভিত্তিক হার্ড ড্রাইভ মাঝে মাঝে ‘ডিফ্র্যাগ’ করা দরকার। তবে বিশেষজ্ঞরা সবাই মনে করেন, ডিস্ক-ভিত্তিক ড্রাইভের বদলে আধুনিক এসএসডি ব্যবহার করাই ভালো, কারণ, এতে ফাইল ছড়িয়ে পড়ার সমস্যা হয় না।
পুরোনো সফটওয়্যার ব্যবহার
পুরোনো সফটওয়্যারও কম্পিউটার ধীরগতির আরেকটি কারণ। অ্যাপল বা মাইক্রোসফট নতুন অপারেটিং সিস্টেম রিলিজ করলে মূলত নতুন ফিচারের প্রচার করা হয় কিন্তু নিয়মিত আপডেটগুলোতে থাকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্যাচ ও পারফরম্যান্স ফিক্স। এসব আপডেট না করলে কম্পিউটার ধীরে চলে।
সমাধান হিসেবে নিশ্চিত হতে হবে যে, সর্বশেষ অপারেটিং সিস্টেম আপডেট ইনস্টল করা আছে। উইন্ডোজে সেটিংস > আপডেট অ্যান্ড সিকিউরিটি > উইন্ডোজ আপডেটে গিয়ে, আর ম্যাক-এ সিস্টেম প্রেফারেন্সেস > আপডেটস এ গিয়ে, আর ক্রোমবুকে সেটিংস > অ্যাবাউট ক্রোমওএস থেকে আপডেট চেক করা যায়।
ভাইরাস আক্রমণ
কম্পিউটার ধীর হয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো ভাইরাস বা ম্যালওয়্যারের সংক্রমণ। ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা ভাইরাস কম্পিউটারের ভেতরে ঢুকে গেলে তা ব্যাকগ্রাউন্ডে অযাচিত প্রক্রিয়া চালিয়ে র্যাম ও প্রসেসরের ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলে এবং স্বাভাবিক কাজকে ধীর করে দেয়।
এ ধরনের সমস্যার জন্য বিশেষজ্ঞরা সবসময় অ্যান্টিভাইরাস বা অ্যান্টিম্যালওয়ার সফটওয়্যার ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এসব প্রোগ্রাম নিয়মিত স্ক্যান চালিয়ে সন্দেহজনক ফাইল, বট এবং ক্ষতিকর সফটওয়্যার খুঁজে বের করে। তবে কেবল সফটওয়্যার ব্যবহার করলেই হবে না সেটি নিয়মিত আপডেট রাখাও জরুরি। অনেক সময় পুরোনো অ্যান্টিভাইরাসই উল্টো কম্পিউটারকে ধীর করে ফেলে কারণ তারা ঠিকভাবে কাজ করতে না পেরে নিজেই সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
ডিভাইস অতিরিক্ত গরম হওয়া
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ডিভাইস গরম হওয়া। যদি দেখা যায় কম্পিউটারের ফ্যান সারাক্ষণ চলছেই বা ল্যাপটপের নিচের অংশ স্পর্শ করলে অস্বাভাবিক গরম লাগে তবে বুঝতে হবে এটি ওভারহিট হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত তাপ সার্কিট বোর্ড ও হার্ডওয়্যার নষ্ট করে দিতে পারে। একইসঙ্গে পারফরম্যান্সও কমে যায়। কারণ, আধুনিক প্রসেসরগুলো উচ্চ তাপমাত্রা এড়াতে নিজে থেকেই গতি কমিয়ে দেয় যাকে বলা হয় ‘থার্মাল থ্রটিং’।
সাধারণত কম্পিউটারের ভেতরের ফ্যান, ভেন্ট ও হিট সিংক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। তবে ব্যবহারকারীরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ল্যাপটপ কখনো কোলে বা বিছানার মতো নরম জিনিসের ওপর ব্যবহার করা উচিত নয় এতে ভেন্ট আটকে যায় এবং তাপ বের হতে পারে না।
ধুলো জমাও একটি বড় সমস্যা, কম্পিউটার ভেতরে ধুলো জমে গেলে ফ্যান ঠিকমতো কাজ করে না এবং তাপ ভেতরেই আটকে যায়। তাই নিয়মিত পরিষ্কার করা দরকার। ডেস্কটপ হলে কভার খুলে কমপ্রেসড এয়ার দিয়ে ফ্যান, ভেন্ট ও অন্যান্য অংশ পরিষ্কার করা যায়। প্রয়োজনে আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল দিয়ে কটন সোয়াব বা কাপড় ব্যবহার করে সূক্ষ্ম অংশও পরিষ্কার করা যেতে পারে।