Published : 12 May 2026, 02:01 PM
চীনের বেইজিংয়ের কাছে মহাপ্রাচীরের জিয়ানকৌ অংশে সাম্প্রতিক এক প্রত্নতাত্ত্বিক খননে মিং রাজবংশ আমলের প্রাচীন কামানসহ দুর্লভ সব নিদর্শন মিলেছে।
মহাপ্রাচীরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সবশেষ এ ঝলক দেখা গেছে ২০২৫ সালের শেষদিকে চালানো এই প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে, যেখানে মিং রাজবংশ আমলের দুর্ধর্ষ এ অস্ত্রটি যেন মহাপ্রাচীরের সামরিক গুরুত্বকেই তুলে ধরেছে।
এ অভিযানে কেবল সামরিক সরঞ্জামই নয়, বরং প্রাচীন চীনের সৈন্য ও শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবন এবং তৎকালীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা অজানা ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স।
পাহাড়ি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত বেইজিংয়ের নিকটবর্তী জিয়ানকৌ অংশে প্রাচীরের প্রতিটি ইট ধরে সংস্কার কাজ চালানোর সময় সেখানে খনন কাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়।
তিনটি ওয়াচ টাওয়ার এবং সেগুলোর সঙ্গে যোগ থাকা বিভিন্ন প্রাচীরে খননকাজ চালিয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা, যেখানে প্রাচীন চীনের সামরিক ও দৈনন্দিন জীবন যাপনের নানা চিহ্ন মিলেছে।
বেইজিং প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের সহযোগী গবেষণা ফেলো শাং হেং বলেছেন, সবচেয়ে স্বতন্ত্র আবিষ্কারটি ছিল মিং রাজবংশ আমলের এ কামান, যা সম্ভবত ১৬৩২ সালের।
এ কামানের গায়ে বেশ ভালোভাবে সংরক্ষিত এক শিলালিপি পাওয়া গেছে, যা বিশেষজ্ঞদের সেই সময়ের উৎপাদন পদ্ধতি ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার সুযোগ করে দেবে।
৩৫ ইঞ্চি লম্বা ও ২৪৭ পাউন্ড ওজনের এ কামানে ‘ছোংঝেন বছর ৫’ খোদাই করা আছে, যা বর্তমান ক্যালেন্ডার অনুসারে ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দ। কামানের নলের আকারসহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে ইউরোপীয় ধাঁচের ‘রেড-কোট’ কামানের সঙ্গে বেশ মিল রয়েছে।
কামানটি মহাপ্রাচীরে পাওয়া বিভিন্ন ব্যাটারি প্ল্যাটফর্ম বা অস্ত্র রাখার স্থানের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মানিয়ে যায়। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, এ ধরন ও আকারের বিভিন্ন অস্ত্র সম্ভবত তখনকার ওয়াচ টাওয়ার বা পর্যবেক্ষণ চৌকিগুলোর ওপর ব্যবহারের জন্য আদর্শ ছিল।
শাং হেং বলেছেন, “কামানটি চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সামরিক প্রযুক্তি বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ এক বাস্তব প্রমাণ দিয়েছে।”
কামানের পাশাপাশি উদ্ধারকারী দলগুলো মহাপ্রাচীরে নিয়োজিত সৈন্যদের ব্যবহৃত গুদাম ঘরগুলোর ভেতরের নানা সরঞ্জামও পেয়েছেন। যার মধ্যে ১১৮ নম্বর ওয়াচ টাওয়ারে ইট দিয়ে তৈরি একটি উত্তপ্ত বিছানা ও উনুন মিলেছে। এসব জিনিস থেকে সেই সময়ের সৈন্যদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
আবার ১১৭ নম্বর ওয়াচ টাওয়ারে ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দের এক অভিবাসন স্মৃতিস্তম্ভ বা ফলক পাওয়া গেছে, যা প্রাচীরের ওই অংশের নির্মাণকাল নিশ্চিত করেছে।
এ ছাড়া আলাদা তিনটি ইট থেকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। দুটি ইটের গায়ে ওজনের নির্দিষ্ট বিবরণ খোদাই করা ছিল, যা মিং আমলের ইটের ভাটাগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে আগের প্রচলিত বিভিন্ন ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
অন্যদিকে, প্রাচীরে ব্যবহৃত চুন-সুরকির ওপর চালানো তদন্তে দেখা গেছে, এসব ছিল উচ্চ-ম্যাগনেসিয়ামওয়ালা চুনের মিশ্রণ এবং এতে আঠালো ভাব বাড়ানোর জন্য উদ্ভিজ্জ আঁশ ব্যবহৃত হয়েছিল। বিষয়টি মিং রাজবংশের নির্মাণ কৌশলকে আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
তৃতীয় ইটের গায়ে খোদাই করা লেখাটি নির্মাণ কৌশল সম্পর্কে নয়, বরং তৎকালীন মানুষদের জীবনযাত্রা ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে ছিল। ইটের গায়ে লেখা কথাগুলোর অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, ‘মদ আর দুশ্চিন্তা ছাড়া জীবনে আর কিছুই নেই; তিন বছরের কঠোর পরিশ্রমে আমার চুল সাদা হয়ে গেছে’। ধারণা করা হচ্ছে, প্রাচীর নির্মাণের কাজে নিয়োজিত কোনো শ্রমিক এমনটি লিখেছিলেন।
শাং হেং বলেন, “এসব আবিষ্কার মহাপ্রাচীরকে নিছক এক প্রাণহীন সামরিক স্থাপনা থেকে জীবন্ত ঐতিহাসিক ভূদৃশ্যে রূপান্তরিত করেছে, যেখানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও দৈনন্দিন জীবনের এক মেলবন্ধন দেখা যায়।”
গবেষকরা সেখানে অনেক পরিমাণে শস্য ও ঔষধি উদ্ভিদ খুঁজে পেয়েছেন, যা সেই সময়ের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে চিকিৎসা সংক্রান্ত জ্ঞান সবকিছুরই ইঙ্গিত দিয়েছে। সেখানকার পশুর হাড় নিয়ে গবেষণায় গৃহপালিত ও বন্য উভয় প্রাণীরই অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যার মধ্যে পশু জবাইয়ের স্পষ্ট প্রমাণও মিলেছে।
এ খনন কাজ থেকে কেবল অস্ত্র বা সামরিক জীবনের সরঞ্জামই নয়, আরও অনেক কিছু খোঁজ মিলেছে। উদ্ধারকারী দল সেখানে ২৮টি নীলকান্তমণি পাথরের শিল্পকর্ম খুঁজে পেয়েছে।
এসব টুকরা নিয়ে করা গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, এগুলোর উৎস ছিল হুবেই, হেনান ও শানসি প্রদেশের নিকটবর্তী খনিগুলো, যা উত্তর চীন জুড়ে প্রচলিত প্রাচীন বাণিজ্য ব্যবস্থার আরও বড় এক প্রমাণ।
বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত এই দুর্গের ভেতরে অনেক আগের জীবনের নানা ধ্বংসাবশেষ মিশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও খনন কাজ হয়ত নতুন কোনো তথ্য সামনে নিয়ে আসবে।
শাং হেং বলেছেন, “মহাপ্রাচীরের ভূদৃশ্য ও ভৌগোলিক পরিবেশের খুব একটা পরিবর্তন না হওয়ায় তা ‘টাইম-ট্রাভেল’ বা সময় পরিভ্রমণ ধাঁচের সংস্কার গবেষণার জন্য আদর্শ স্থান হিসেবে গড়ে তুলেছে।”