Published : 04 Mar 2026, 01:35 PM
মহাকাশের বিশাল আকারের কিছু তারা অনন্য এক তেজ নিয়ে জন্মায়, যেখানে সাধারণ তারার চেয়ে এরা অনেক বেশি উজ্জ্বল, বড় ও অল্প সময়েই বিলীন হয়ে যায়, ঠিক যেন তারা জগতের কোনো রক স্টার-- এমনই এক দানবীয় তারার খোঁজ পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
রয়টার্স লিখেছে, ‘ডব্লিউওএইচ জি৬৪’ নামের এ তারাটিকে তারা জগতের জিমি হেনড্রিক্স বলা যেতে পারে, যা ভরের দিক থেকে সূর্যের চেয়ে ২৮ গুণ। তারাটির অবস্থান পৃথিবীর ছায়াপথ মিল্কি ওয়ের পার্শ্ববর্তী ‘লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউড’-এ।
‘রক’ন রোল’ জগতে হেনড্রিক্স যেমন অনন্য ছিলেন তেমনই পরিচিত বিশালাকার বিভিন্ন তারার মধ্যে এ তারাটি অন্যতম। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে করা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, তারাটি এমন আচরণ করছে, যা আগে কোনো তারার মধ্যে দেখা যায়নি।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এ ধরনের বিশালাকার তারার জীবন ইতিহাস সম্পর্কে এখনও সম্পূর্ণ ধারণা নেই। তবে ‘ডব্লিউওএইচ জি৬৪’-এর নতুন পর্যবেক্ষণগুলো তাদের গবেষণায় নতুন তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে।
গবেষকরা ২০১৪ সালে তারাটির রঙে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন, যা এর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ারই সংকেত। তারাটি লাল থেকে হলুদ রঙে রূপান্তরিত হচ্ছিল। আগে ‘এক্সট্রিম রেড সুপারজায়ান্ট’ বা অতিকায় লাল তারা হিসেবে পরিচিত হলেও দ্রুত এক ‘ইয়ালো হাইপারজায়ান্ট’ তারায় পরিণত হয়।
মহাজাগতিক সময়ের হিসেবে এ পরিবর্তনটি দ্রুত ঘটেছে এবং এতে কোনো ধরনের অগ্ন্যুৎপাত বা বিস্ফোরণের প্রমাণ মেলেনি। এথেন্সের ‘ন্যাশনাল অবজারভেটরি’তে এ গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী গঞ্জালো মুনিওজ সানচেজ।
তিনি বলেছেন, “সাধারণত কোনো তারার বিবর্তন ঘটতে শত কোটি বছর সময় লাগে। মানুষের আয়ুষ্কালের মধ্যে আমরা কেবল আকস্মিক ও প্রচণ্ড ঘটনাগুলোই দেখতে পাই, যেমন অগ্ন্যুৎপাত, দুটি তারার মিলে যাওয়া বা এদের বিস্ফোরক মৃত্যু বা সুপারনোভা।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’তে।
প্রধান লেখক মুনিওজ সানচেজ বলেছেন, “বর্তমানে প্রচলিত কোনো তারা মডেলই ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর এ নাটকীয় রূপান্তরকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারছে না।”
সূর্যের তুলনায় এ তারাটির উজ্জ্বলতা প্রায় ৩ লাখ গুণ এবং এর ব্যাস প্রায় দেড়শ গুণ বড়। এ তারা আমাদের সূর্যের জায়গায় থাকলে এর উপরিভাগ আমাদের সৌরজগতের পঞ্চম ও ষষ্ঠ গ্রহ বৃহস্পতি ও শনির কক্ষপথের মাঝামাঝি দূরত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত হত। আলোর গতিতে ভ্রমণ করলেও এ তারার উপরিভাগ একবার প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় লাগবে।
প্রায় ১ কোটি বছর বয়সী ডব্লিউওএইচ জি৬৪ তারাটি বর্তমানে এর আয়ুষ্কালের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর বিপরীতে, আমাদের সূর্যের বয়স প্রায় সাড়ে চারশ কোটি বছর ও এর আরও প্রায় পাঁচশ কোটি বছরের আয়ু বাকি আছে। পৃথিবী থেকে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এ তারা। এক আলোকবর্ষ মানে এক বছরে আলো যতটা দূরত্ব অতিক্রম করে, যা প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী মুনিওজ সানচেজ বলেছেন, “ডব্লিউওএইচ জি৬৪ বিশালাকার এক তারা এবং সূর্যের তুলনায় এর আচরণ সম্পূর্ণ আলাদা।”
সূর্যের ভরের তুলনায় প্রায় ৮ থেকে ২৩ গুণ বড় তারাগুলো সাধারণত ‘রেড সুপারজায়ান্ট’ বা লাল অতিদানব তারায় পরিণত হয়ে শেষ পর্যন্ত ‘সুপারনোভা’ হিসেবে বিস্ফোরিত হয়।
তবে যেসব তারার ভর সূর্যের ২৩ থেকে ৩০ গুণ, এদের পরিণতি নিয়ে অতটা নিশ্চিত হওয়া যায় না। এরা সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হয়, নাকি সরাসরি সংকুচিত হয়ে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয় বা লাল অতিদানব দশা থেকে হলুদ হাইপারজায়ান্টে রূপান্তরিত হয়ে জীবন শেষ করে– এসব এখনও স্পষ্ট নয়।
ব্ল্যাক হোল হচ্ছে মহাকাশের প্রচণ্ড ঘনত্বের এক বস্তু, যার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এতই বেশি যে আলোও সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী মুনিওজ সানচেজ বলেছেন, “ফলে এ রহস্যের সমাধান হতে পারে এ নতুন তারা।”
ডব্লিউওএইচ জি৬৪’কে বোঝার ক্ষেত্রে আরও জটিল বিষয় হচ্ছে, এ তারা এক ‘বাইনারি সিস্টেম’ বা যুগ্ম তারা ব্যবস্থার অংশ, অর্থাৎ মহাকর্ষীয় টানে অন্য একটি তারার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
গবেষকরা এ সঙ্গী তারাটির আকার বা বৈশিষ্ট্য এখনও নির্ধারণ করতে পারেননি। তবে তারা বলেছেন, কোনো এক সময় এই দুটি তারা একে অপরের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর সাম্প্রতিক পরিবর্তনের বিষয়ে গবেষকরা কিছু ধারণা দিয়েছেন। তাদের মতে, হতে পারে আমাদের পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার আগেই তারাটিতে কোনো এক প্রচণ্ড আলোড়ন ঘটেছিল। যার ফলে তারাটি লাল রং ধারণ করে এবং এখন সেটি আবার তার স্বাভাবিক শান্ত হলুদ অবস্থায় ফিরে আসছে।
আবার এমনটিও হতে পারে, ডব্লিউওএইচ জি৬৪ ও এর সঙ্গী তারাটির মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার কারণে সাময়িকভাবে তারাটিকে ‘রেড সুপারজায়ান্ট’ বা লাল অতিদানব তারার মতো দেখাচ্ছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী সানচেজ বলেছেন, “জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ অসাধারণ তারা ব্যবস্থাটির ওপর নজর রাখা অব্যাহত রেখেছেন। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় তারারা কীভাবে বেঁচে থাকে ও বিলীন হয় আমাদের সেই ধারণা বদলে দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ডব্লিউওএইচ জি৬৪।”