১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ইরানে ব্যবসা নিয়ে মার্কিন আদালতে বিচারের মুখে হুয়াওয়ে

দুই দেশের মধ্যকার তীব্র প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ও ওয়াশিংটনের মাধ্যমে বেইজিংয়ের সামরিক খাতে মার্কিন প্রযুক্তির ব্যবহার ঠেকানোর চেষ্টার মধ্যেই এ বিচার হতে যাচ্ছে।

ইরানে ব্যবসা নিয়ে মার্কিন আদালতে বিচারের মুখে হুয়াওয়ে
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এ প্রযুক্তি যুদ্ধ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের মতো একাধিক খাতে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Sep 2026, 07:08 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:56 AM

ইরানের সঙ্গে ‘ব্যবসা পরিচালনা ও ব্যাংক জালিয়াতি’র অভিযোগে চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত ফৌজদারি বিচারকার্য মার্কিন ফেডারেল আদালতে শুরু হতে যাচ্ছে।

এইচএসবিসি’সহ বিভিন্ন ব্যাংককে প্রতারণার অভিযোগে চীনের প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আট বছর আগে মার্কিন প্রসিকিউটরদের গোপন অভিযোগ দায়েরের পর এবার মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের মুখে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে জুরি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ বিচারকার্য শুরুর কথা রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা সংক্রান্ত প্রতারণা ছাড়াও মার্কিন পাঁচ প্রযুক্তি কোম্পানির ‘ট্রেড সিক্রেট’ চুরির ষড়যন্ত্র এবং উত্তর কোরিয়ায় ব্যবসা ও ২০০৯ সালে তেহরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নজরদারি সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ে মিথ্যা বলার অভিযোগ রয়েছে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে।

মার্কিন সরকারের সঙ্গে কোনো চীনা কোম্পানির প্রাথমিক ও সবচেয়ে বেশি নজরে আসা সংঘাতগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম। দুই দেশের মধ্যকার তীব্র প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ও ওয়াশিংটনের মাধ্যমে বেইজিংয়ের সামরিক খাতে মার্কিন প্রযুক্তির ব্যবহার ঠেকানোর চেষ্টার মধ্যেই এ বিচার হতে যাচ্ছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এ প্রযুক্তি যুদ্ধ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের মতো একাধিক খাতে ছড়িয়ে পড়েছে।

২০১৮ সালে ভ্যানকুভারে হুয়াওয়ের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠাতার কন্যা মেং ওয়াংজৌর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এ আইনি লড়াই শুরু হয়, যা যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও কানাডার মধ্যে তীব্র এক কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছিল।

ইরান-সংক্রান্ত অভিযোগগুলোতে দোষী সাব্যস্ত হলে তা ওয়াশিংটনের সেই অবস্থানকে আরও শক্ত করবে, যার ভিত্তিতে ২০১৯ সালে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির মতো অপরাধ কার্যক্রমের কথা বলে হুয়াওয়েকে মার্কিন বাণিজ্য কালো তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জজ অ্যান ডনেলির নেতৃত্বাধীন এ বিচার প্রায় তিন মাস ধরে চলার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আগে থেকে নির্ধারিত বৈঠক সূচীর সঙ্গে মিলতে পারে।

বিচার পরিচালনার জন্য সম্ভাব্য জুরিরা চীন ও ইরান সরকার সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্বলিত ২৭ পৃষ্ঠার প্রশ্নপত্র পূরণ করেছেন।

হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আনা অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন, অর্থ পাচার, র‌্যাকেটিয়ারিং, ওয়্যার ফ্রড বা তারবার্তা জালিয়াতি ও বিচার কাজে বাধা দেওয়া।

তবে হুয়াওয়ে এসব অভিযোগের সবকটিতেই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছে এবং যে কোনো ধরনের বেআইনি কাজের কথা অস্বীকার করেছে।

এ ফৌজদারি মামলার ভিত্তি ২০১২ ও ২০১৩ সালে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, যেখানে হুয়াওয়ে ও ইরানে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোম্পানি স্কাইকমের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছিল।

২০১০ সালে ইরানের বৃহত্তম মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে ১৫ লাখ ডলারের নিষিদ্ধ ঘোষিত হিউলেট-প্যাকার্ড বা এইচপি কম্পিউটার সরঞ্জাম বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল স্কাইকম, যা উঠে এসেছিল রয়টার্সের প্রতিবেদনে।

এছাড়া, ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মেং ওয়ানঝৌ স্কাইকমের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছিল।

চীনা প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি ঠেকাতেই এ মামলা: বেইজিং

মামলাটিকে চীনা প্রযুক্তির উত্থান ঠেকানোর বৃহত্তর অভিযানের অংশ হিসেবে বর্ণনা করে দীর্ঘদিন ধরে এর সমালোচনা করে আসছে বেইজিং।

শনিবার এক বিবৃতিতে হুয়াওয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “মার্কিন সরকারের সার্বিক বয়ানটি পুরোপুরি মিথ্যা।”

বর্তমানে হুয়াওয়ে কেবল নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম বা স্মার্টফোনেই আটকে নেই, বরং চীনের এআই চিপ পাওয়ার কেন্দ্রে রয়েছে এ কোম্পানি।

এদিকে, এ ফৌজদারি মামলাকে কোম্পানিটির প্রতিযোগিতাবৃত্তিকে দুর্বল করার অপচেষ্টা এবং বাণিজ্য প্রাইভেসি চুরির অভিযোগগুলোকে দীর্ঘদিনের মীমাংসিত বাণিজ্যিক বিরোধের নতুন রূপায়ন হিসেবে উল্লেখ করেছে হুয়াওয়ে।

চীনা কোম্পানিটি দোষী সাব্যস্ত হলে মার্কিন প্রসিকিউটররা তাদের অবৈধ কার্যক্রম থেকে পাওয়া অর্থ বাজেয়াপ্তের দাবি করবেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম আমলেই কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের হয়েছিল। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে হুয়াওয়ের যন্ত্রপাতির ব্যবহার ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি এসব সরঞ্জাম গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ব্যবহার হতে পারে এমন আশঙ্কায় অন্যান্য দেশকেও তাদের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক থেকে হুয়াওয়েকে বাদ দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল।

এ মামলার অভিযোগপত্রে ১৯৯৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যবর্তী সময়ের কথিত বেআইনি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে স্কাইকমকে ব্যবহার করে হুয়াওয়ের ইরানভিত্তিক ব্যবসার জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবা সংগ্রহের অভিযোগ আনা হয়েছে।

পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই দেশ থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, অভিযোগপত্রে নাম প্রকাশ না করা হলেও সূত্র ও রয়টার্সের পর্যালোচিত নথিপত্র অনুসারে, স্কাইকম সম্পর্কিত ১০ কোটি ডলারের বেশি দামের মার্কিন ডলার লেনদেন নিষ্পত্তি করেছে এইচএসবিসি ব্যাংক।

প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেছেন, মেং ওয়ানঝৌ এইচএসবিসির এক নির্বাহীর কাছে দেওয়া উপস্থাপনায় স্কাইকমের ওপর হুয়াওয়ের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে আনুষঙ্গিক অভিযোগ তুলে নেওয়ার বিষয়ে প্রসিকিউটরদের সঙ্গে হওয়া এক সমঝোতার অংশ হিসেবে তিনি স্বীকার করেছিলেন এসব বিবৃতি সত্য নয়।