Published : 03 Jun 2026, 01:55 PM
জেফ বেজোসের মহাকাশ কোম্পানি ব্লু অরিজিনের রকেট বিস্ফোরণে তাদের একমাত্র সক্রিয় লঞ্চপ্যাডটি মারাত্মকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে, যা পুরোপুরি সংস্কার করতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
এ বিধ্বংসী দুর্ঘটনার ফলে নাসার চন্দ্রাভিযান ও অ্যামাজনের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রকল্পসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ মিশন এখন বড় ধরনের বিলম্ব ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
সোমবার নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেছেন, গেল সপ্তাহে ব্লু অরিজিনের একটি রকেট বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া লঞ্চপ্যাডটি পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার করতে ‘দীর্ঘ সময় লাগবে’।
এর আগে, বৃহস্পতিবার ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে এক উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে ব্লু অরিজিনের বিশালাকার রকেট ‘নিউ গ্লেন’-এর ‘হট-ফায়ার টেস্ট’ বা অগ্নি-পরীক্ষা চালাচ্ছিল। ঠিক ওই সময়ই রকেটটিতে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে এবং তা এক বড় অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়।
এ দুর্ঘটনার পর জেফ বেজোসের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে, ব্লু অরিজিনের সব কর্মী নিরাপদে রয়েছেন। দিনটিকে ‘কঠিন দিন’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত স্থানটি পুনরায় তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সিএনবিসি’র মরগান ব্রেনানের সঙ্গে ‘সিইও কাউন্সিল সামিট’-এ আলাপকালে আইজ্যাকম্যান বলেছেন, এ ধ্বংসস্তূপ কাটিয়ে লঞ্চপ্যাডটিকে আবার পুরোপুরি প্রস্তুত করতে ‘২০২৮ সাল পর্যন্ত’ সময় লেগে যেতে পারে।
“আমরা সবাই এ ভাবনাটি নিয়ে একমত যে, আমরা অবশ্যই ব্লু অরিজিনকে সফল হতে দেখতে চাই। ফলে আমাদের এখনকার কাজ হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা ও প্যাডটি পুনরুদ্ধার করা এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত দেওয়া ও রকেট বিস্ফোরণের মূল কারণ খুঁজে বের করা।
“চলুন আগে খুঁজে বের করি ঠিক কোথায় গলদ ছিল এবং তারপর আমাদের আবার সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।”
দুর্ঘটনার পর শুক্রবার আইজ্যাকম্যান, বেজোস ও ব্লু অরিজিনের সিইও ডেভ লিম্প ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চপ্যাডটি পরিদর্শন করেছেন এবং এ মহাকাশ গবেষণা কোম্পানিটির কর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রেখেছেন।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে লিম্প লিখেছেন, ব্লু অরিজিন এরইমধ্যে লঞ্চপ্যাডের কিছু অংশে পুনরায় প্রবেশাধিকার পেয়েছে এবং তা পুনরায় নির্মাণের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করেছে।
নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে ব্লু অরিজিনের সঙ্গে বেশ কয়েকটি চুক্তি রয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে মার্কিন নভোচারীদের আবার চাঁদের পৃষ্ঠে ফিরিয়ে নেওয়া।
এ বছরের শেষদিকে নিউ গ্লেন রকেটে মানবহীন ‘ব্লু মুন ল্যান্ডার’ মহাকাশে পাঠানোর জন্য ব্লু অরিজিনকে বেছে নিয়েছে নাসা। ‘এমকে-১’ নামেও পরিচিত ‘ব্লু মুন ল্যান্ডার’।
আইজ্যাকম্যান বলেছেন, এ ল্যান্ডারটিকে চাঁদে পাঠাতে হলে এমন এক রকেটের প্রয়োজন, যা অনেক ওজন বহন করতে পারে। আর এ পরিস্থিতির কারণে নাসাকে সম্ভবত ‘ফ্যালকন হেভি ল্যান্ড’ বা ফ্যালকন হেভির ওপর নির্ভর করতে হবে, যা ইলন মাস্কের মালিকানাধীন মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্সের তৈরি শক্তিশালী রকেট।
“ভারী ওজন বহনের সক্ষমতার কথা বলতে গেলে সত্যিকার অর্থেই অনেক ওজন বহনের ক্ষেত্রে আপনার হাতে স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিন এ দুটি পথই রয়েছে। আর তাদের মধ্যে একটির লঞ্চপ্যাড তো এখন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ল।”
মাস্কের স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন ৯’ ও ইউনাইটেড লঞ্চ অ্যালায়েন্সের ‘ভলকান’ নামের শক্তিশালী বিভিন্ন রকেটের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতার লক্ষ্য নিয়েই ব্লু অরিজিন এ নিউ গ্লেন রকেটের নকশা করেছিল।
ব্লু অরিজিনের কাছে নিউ গ্লেন রকেট উৎক্ষেপণের জন্য কেবল একটিমাত্র লঞ্চপ্যাডই ছিল। এ কারণে বৃহস্পতিবারের রকেট বিস্ফোরণটি তাদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ভ্যানডেনবার্গ স্পেস ফোর্স বেইস’ থেকে আরেকটি নিউ গ্লেন লঞ্চপ্যাড চালুর পরিকল্পনা তাদের রয়েছে বটে, তবে সেই প্যাডটি এখনও নির্মাণাধীন অবস্থায় আছে।
এ বিষয়ে আইজ্যাকম্যান বলেছেন, “আমাদের কাছে অনেক তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। আমার দল সবার আগে সামনে এনেছে মানব মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে এযাবতকাল আমরা যতগুলো লঞ্চপ্যাড তৈরি করেছি এবং যতগুলো প্যাড আমাদের পুনর্নির্মাণ করতে হয়েছে তার একটি সময়রেখা। আপনি যদি দ্রুত গতিতেও কাজ করেন তা-ও এ ক্ষত কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে।”
এ দুর্ঘটনাটি ব্লু অরিজিনের অন্যান্য গ্রাহকদের ওপরও বড় প্রভাব ফেলছে, যার মধ্যে অন্যতম অ্যামাজন। বেশ কয়েকটি আসন্ন মিশনের অংশ হিসেবে এ সপ্তাহেই অ্যামাজনের নতুন মহাকাশভিত্তিক ইন্টারনেট প্রকল্প ‘লিও’র জন্য ৪৮টি স্যাটেলাইট বহনের কথা ছিল ব্লু অরিজিনের।
বেজোসের ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা অ্যামাজনের সামনে এখন মার্কিন ‘ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন’ বা এফএফসি’র এক ‘কড়া ডেডলাইন’ বা সময়সীমা রয়েছে, যেখানে আগামী মাসের মধ্যে তাদের পরিকল্পিত স্যাটেলাইটের প্রায় অর্ধেক মহাকাশে পাঠাতে হবে।
একইসঙ্গে এ বছরের শেষদিকে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য তারা এ লিও সেবাটি চালু করতে কাজ করে যাচ্ছে, যা স্পেসএক্সের স্টারলিংক ইন্টারনেটের সঙ্গে প্রতিযোগিতার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি।
এ ছাড়া ‘এএসটি স্পেসমোবিল’ নামের আরেকটি কোম্পানি সরাসরি মোবাইল ডিভাইসে সংযোগকারী স্যাটেলাইট সিস্টেম তৈরি করছে। তারাও কিছু রকেট উৎক্ষেপণের জন্য ব্লু অরিজিনের ওপর নির্ভরশীল।
এ দুর্ঘটনার প্রভাবে সোমবার পুঁজিবাজারে অ্যামাজনের শেয়ারের দাম ৬ শতাংশেরও বেশি কমে বন্ধ থেমেছে, যেখানে এর আগে শুক্রবার তাদের শেয়ারের দর প্রায় ১৭ শতাংশ ছিল।