১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কিছু চাকরি ‘মানুষের জন্য সংরক্ষিত’ রাখার পক্ষে বিল গেটস

“যে হাতিয়ারটি মানুষকে আগের চেয়ে বেশি শেখার সুযোগ করে দিচ্ছে সেই একই হাতিয়ার মানুষকে কম শেখার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।”

কিছু চাকরি ‘মানুষের জন্য সংরক্ষিত’ রাখার পক্ষে বিল গেটস
গেল তিন বছরের মধ্যে এআই নিয়ে এটাই তার প্রথম বিস্তারিত নিবন্ধ। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Aug 2026, 10:05 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:54 PM

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের আগ্রাসন থেকে মানুষের কর্মসংস্থান বাঁচাতে কিছু নির্দিষ্ট খাতে ‘মানুষের জন্য সংরক্ষিত’ চাকরির পক্ষে জোর আহ্বান জানিয়েছেন বিল গেটস।

একইসঙ্গে প্রযুক্তিটির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রস্তুত নয় বলেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।

‘টার্বুলেন্ট এআই এরা ইজ হিয়ার: দ্য চয়েসেস উই মেক আর ক্রিটিকাল’ শিরোনামের প্রায় ছয় হাজার শব্দের দীর্ঘ এক নিবন্ধে এআইয়ের হাত থেকে পেশা রক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে পরিবেশ সুরক্ষায় ‘অভয়ারণ্য’ গড়ে তোলার নীতির সঙ্গে তুলনা করেছেন এক সময়ের শীর্ষ ধনী ও মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা।

গেল তিন বছরের মধ্যে এআই নিয়ে এটাই তার প্রথম বিস্তারিত নিবন্ধ বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।

বিল গেটস লিখেছেন, “অনেক পেশা চিরতরে হারিয়ে যাবে। আমার ধারণা, এআই ও রোবটের যত উন্নতিই হোক না কেন, কিছু কাজ আমাদের কেবল মানুষের জন্যই নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে।

“আমি এ ক্ষেত্রটিকে ‘হিউম্যান রিজার্ভড’ বা ‘মানুষের জন্য সংরক্ষিত’ বলতে শুরু করেছি। পদটি আমার পছন্দ, কারণ তা আমাকে প্রকৃতি বা বনের অভয়ারণ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, যেখানে অবকাঠামো বা রাস্তাঘাট তৈরির সুযোগ থাকার পরও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতির কথা ভেবে আমরা তা করা থেকে দূরে থাকি।”

নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে গেটস বলেছেন, ছয় বছর আগে অ্যালঝেইমার্সে আক্রান্ত তার বাবার সেবাযত্নে নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা ছিল অমূল্য।

“আমার বাবার পরিচর্যায় তারা যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন তা অনন্য ও কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব; কোনো রোবটের পক্ষে এমনটা করা উচিতও নয়। চিন্তা করুন তো কোনো মারাত্মক বা নিরাময় অযোগ্য রোগের খবর আপনাকে একটি রোবট এসে দিচ্ছে! প্রযুক্তিগতভাবে রোবটের পক্ষে এটা বলা হয়ত সম্ভব তবে নৈতিকভাবে তা কখনোই হওয়া উচিত নয়।”

জেফরি এপস্টেইন কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ানোর পর বুধবার প্রকাশিত এ নিবন্ধটি বিল গেটসের অন্যতম বড় কোনো প্রকাশ্যে বক্তব্য বা উপস্থিতি।

গেল মাসে গেটস ফাউন্ডেশনের নির্দেশনায় থার্ড পার্টির করা এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এপস্টেইনের সঙ্গে ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও কর্মীদের কম করে হলেও ৩০টির মতো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওইসব বৈঠকের মধ্যে কিছুসংখ্যকে বিল গেটস নিজেও ছিলেন।

এপস্টেইনের অপরাধে জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ গেটসের বিরুদ্ধে নেই, এবং তিনি নিজের ৮৯০০ কোটি ডলারের দাতব্য ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে বহাল রয়েছেন।

যৌন অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে সময় কাটানোর বিষয়টি নিয়ে আগেই গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করে গেটস বলেছিলেন, সেই প্রতিটা মিনিটের জন্য তিনি অনুতপ্ত।

গেটস বলেছেন, এআইয়ের প্রভাব কতটা ব্যাপক হতে পারে সে বিষয়ে বিশ্বের সরকারগুলো এখনও প্রস্তুত নয়।

“সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হতে হবে এআই ঠেকানোর জন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা বা রূপরেখা তৈরি করা। ৯/১১-এর হামলার পর মার্কিন সরকার কেবল একটি সেবা বা জাতীয় নিরাপত্তা উন্নত করার লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক পুনর্গঠনটি করেছিল।

“এআইয়ের জন্য এর চেয়ে বহুগুণ বেশি কিছু করা প্রয়োজন। কারণ এআই কেবল জাতীয় নিরাপত্তাই নয়, বরং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, করারোপ, জ্বালানি, নির্বাচন, বায়ু ও পানি, জনস্বাস্থ্য, আর্থিক ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পরিবহন, সরকারি মালিকানাধীন জমি ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার মতো প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। ফলে নতুন এ কাঠামো তৈরি ও তা বাস্তবায়নে বিশ্বের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আদৌ উপযুক্ত কি না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।”

বিশ্বজুড়ে এ সংকট ঠেকানোর অংশ হিসেবে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কিছুটা সহযোগিতার প্রয়োজন হবে’ বলেও উল্লেখ করেছেন গেটস।

এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ক্রমাগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে আগামী নভেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক বৈঠকের আয়োজন করতে কাজ করে যাচ্ছেন গেটসের সহকর্মীরা।

বিশ্বজুড়ে কোভিড মহামারীর পর প্রথম কোনো বিদেশী উদ্যোক্তা হিসেবে তিন বছর আগে প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন এ প্রযুক্তি বিলিয়নেয়ার। নিবন্ধে শিক্ষার ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গেটস।

“যে হাতিয়ারটি মানুষকে আগের চেয়ে বেশি শেখার সুযোগ করে দিচ্ছে সেই একই হাতিয়ার মানুষকে কম শেখার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

“প্রাথমিক এক জরিপে দেখা গেছে, এআইয়ের অত্যধিক ব্যবহার মানুষের বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে ও তরুণদের মধ্যে এ প্রভাব আরও বেশি স্পষ্ট।”