Published : 19 Sep 2025, 02:07 PM
‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’ বা মধ্যবয়সের সংকট কথাটি প্রায়ই শোনা যায়। তবে বেশিরভাগ মানুষের ধারণা, এ সংকট কেবল ৩৫ বছর বয়সে শুরু হয়। নতুন গবেষণা বলছে, এমনটি সত্যি নয়।
মধ্যবয়সী সংকটের উৎস কোথায় এবং প্রায় ৬০ বছর পুরানো এ ধারণাটি আজকের দিনে ঠিক কতটা প্রাসঙ্গিক তা খতিয়ে দেখেছেন ‘লন্ডনের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি’র উদ্ভাবন ও ইংরেজি বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক নাওমি উইনটার-ভিনসেন্ট।
মধ্যবয়সী সংকট কথাটি প্রথম ব্যবহার করেছেন ইলিয়ট জ্যাকস। তিনি কানাডীয় একজন মনোবিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্যে চলে এসেছিলেন।
‘ডেথ অ্যান্ড মিডলাইফ ক্রাইসিস’ নামের এক গবেষণাপত্রে প্রথমবারের মতো এ সংকটের ধারণাটি ব্যাখ্যা করেছেন জ্যাকস, যা ১৯৬৫ সালে প্রকাশ পেয়েছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ সাইকোঅ্যানালাইসিস’-এ।
এ গবেষণাপত্রে ইতিহাসের কিছু বিখ্যাত সৃজনশীল মানুষ যেমন দান্তে থেকে শুরু করে রেনেসাঁ যুগের শিল্পীদের উদাহরণ দিয়ে জ্যাকস দেখিয়েছিলেন, কীভাবে ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে এসব ব্যক্তিদের কাজের ধরন বদলে যায় বা তাদের সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যেতে থাকে।
এরপর ধীরে ধীরে সাধারণ সংস্কৃতিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এ ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’ শব্দটি, যেখানে মানুষ নিজের জীবনের মাঝপথে এসে সবকিছু নতুন করে ভাবার তাড়না অনুভব করেন। যেমন– হঠাৎ করে চাকরি বদলানো বা আচমকা শখের দামী কিছু একটা কিনে ফেলার মতো বিষয়।
ইংল্যান্ডের ‘কর্নওয়ালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ‘হন্টেড মডার্নিটিজ, প্রেজেন্ট পাস্টস অ্যান্ড স্পেকট্রাল ফিউচার্স’ নামের উপস্থাপিত এক গবেষণাপত্রে উইন্টার-ভিনসেন্ট বিশ্লেষণ করেছেন, আজকের দিনে যখন মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি দিন বাঁচছে তখনও কি জ্যাকসের এ ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’ তত্ত্বটি প্রযোজ্য কি না? সম্মেলনটির আয়োজক ছিল ফালমাউথ ইউনিভার্সিটি, আর এতে সহপৃষ্ঠপোষকতা করেছে’‘নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।
উইনটার-ভিনসেন্ট বলেছেন, “জ্যাকস বাইবেলে উল্লিখিত ‘সত্তর বছর বয়স’কে জীবনের গড় আয়ু হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন, যাকে বলা হয় ‘থ্রি স্কোর অ্যান্ড টেন’। আর সেই অনুসারে, জীবনের মাঝপথে অর্থাৎ ৩৫ বছর বয়সে ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’ দেখা দিতে পারে– এমন ধারণার কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি।
“জ্যাকস এও বলেছিলেন, বিষয়টি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। ফলে এমন নয় যে, আপনি ৩৫ হলেই সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবয়সী সংকটে পড়বেন। তবে আমার ধারণা, ২০২৫ সালে এসে মধ্যবয়স ধারণাটি আর আগের মতো নেই। এখন মানুষের জীবনের ধারা বদলে গিয়েছে। মানুষ বিয়ে বা পরিবার শুরু করছে দেরিতে, বাড়ি কিনছে অনেক দেরিতে এবং অবসরও নিচ্ছে আগের চেয়ে অনেক দেরিতে। ফলে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ মানুষের কাছে এখন ৩৫ বছর বয়সকে মধ্যবয়স বলা ঠিক খাটে না।”
নিজের এ গবেষণার জন্য জ্যাকসের কাজ বিশ্লেষণের সময় সেখানে কিছু সীমাবদ্ধতা খুঁজে পেয়েছেন উইনটার-ভিনসেন্ট।
তিনি বলেছেন, প্রথমত জ্যাকসের তথ্য ‘তত ভালো নয়’। কারণ তার তত্ত্বটি এসেছে কেবল কিছু বিখ্যাত মানুষের কাজ বিশ্লেষণ করে। যারা ৩৫ বছর বয়সের দিকে তাদের সৃজনশীলতায় পরিবর্তন দেখিয়েছিলেন। তবে এ নিয়ে নিজে সরাসরি কোনো গবেষণা করেননি তিনি।
জ্যাকসের তত্ত্বে আরেকটি সমস্যা রয়েছে। কারণ তিনি তত্ত্বটি পুরোপুরি পুরুষ কর্মীদের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করেছিলেন, যেখানে নারীদের জীবনে কীভাবে সন্তান পালন ও শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন আসে যেমন প্রিমেনোপজ বা মেনোপজের আগের সময়ের ওঠানামা নিয়ে কেবল সামান্যই উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
এ ছাড়াও, মধ্যবয়সী সংকটের ধারণাটি বিজ্ঞানসম্মতভাবে খুব বেশি সমর্থিত নয়। উইনটার-ভিনসেন্ট আরও বলেছেন, “তত্ত্বটি অবশ্যই চমকপ্রদ তবে সবাই ৩৫ বছর বয়সে একসঙ্গে এই সংকটে পড়বে– এমন ধারণার পক্ষে প্রমাণ বা তথ্যের বিষয়টি স্পষ্ট নয়।”
তবে উইনটার-ভিনসেন্টকে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে জ্যাকসের মূল গবেষণাপত্রের সেই লেখাটি, যেখানে জ্যাকস বলেছেন, কেবল মধ্যবয়সই মানুষের জীবনের সৃজনশীলতার কথা বলেছে না, বরং সেই বয়সে যে সংকট আসে তার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি অর্থাৎ, জীবনের গড় আয়ুর মাঝপথে সৃজনশীলতা ও সংকট উভয়কেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন জ্যাকস।
উইনটার-ভিনসেন্ট বলেছেন, “জ্যাকস বলছেন, মধ্যবয়সী সংকটের আগে সৃজনশীলতা মানুষের জীবনে আগুনের মতো ঝলসে উঠে। বিষয়টি যেন একসঙ্গে পুরোপুরি তৈরি হয়ে মানুষের মনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। তিনি বিষয়টিকে ‘প্রেসিপিটেট ক্রিয়েটিভিটি’ বা হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়া সৃজনশীলতা বলে বর্ণনা করেছেন, যেন এ সময় মানুষ নিজেকেই বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেন।
“তারপর জ্যাকস আরও বলেছেন, মধ্যবয়সে মানুষের মৃত্যু ও বাস্তবতা নিয়ে নতুন উপলব্ধিও তৈরি হয়। মানুষ এ সময় বুঝতে পারে জীবনের স্বাভাবিক শেষ রয়েছে, যা পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আর এ উপলব্ধি থেকে মানুষের ভেতরে যা জন্ম নেয় তাকে তিনি ‘আকৃতিবদ্ধ সৃজনশীলতা’ বলেছেন, যার ভিন্ন ভিন্ন গুণও রয়েছে।”
জ্যাকসের মতে, জীবনের প্রারম্ভিক সময় থেকে মধ্যবয়সে প্রবেশ করার এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এক ধরনের ‘আরও পরিপক্ক’ সৃজনশীলতার জন্ম নেয়। তবে আজকের সমাজে মৃত্যু মানেই মানুষের কাজ করার বা সৃজনশীল থাকার ক্ষমতার এক প্রাকৃতিক সীমা– এমন ধারণাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে মনে করেন উইনটার-ভিনসেন্ট।
তিনি বলেছেন, বর্তমান সমাজে এমন অনেক মানুষই রয়েছেন যারা আয়ু সীমা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এখন, তারা কি জ্যাকসের এই মধ্যবয়সী সংকটের তত্ত্বের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারবেন?
সমাজের এ চরম চিন্তাধারার অংশকে বাদ দিলে উইনটার-ভিনসেন্ট মনে করেন, জ্যাকসের মূল তত্ত্ব থেকে এখনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখার রয়েছে।
“আমার ধারণা, আমাদের সংস্কৃতিতে সবাই কেবল ‘সংকট’ বিষয়টিতেই আটকে রয়েছেন মানুষ। তবে জ্যাকস আসলে বলতে চেয়েছেন, সংকটের পরে কী হতে পারে। মৃত্যুর বাস্তবতা বা জীবনের সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়ার পরও মানুষের মনে এক ধরনের ভিন্নধারার গভীর, মূল্যবান ও চিন্তাশীল সৃজনশীলতার জন্ম নেয়।
“আসলে, নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে ফেলা মানেই যে সব কিছু থেমে গেল, তা নয়, বরং এ উপলব্ধি জীবনে নতুন এক উদ্দেশ্য বা গভীরতা যোগ করে। আমরা সাধারণত এ ‘সংকট’-এর খারাপ দিকটাই বেশি দেখি। তবে জ্যাকস আসলে এ ধারণার ইতিবাচক দিকই আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন।”