Published : 17 Jul 2026, 03:07 PM
ক্ষতিকর কনটেন্ট বা ভিডিওর বিস্তার ঠেকাতে আইনি কড়াকড়ি আরোপের এক বছর পরও টিনএজারদের মধ্যে ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’ বা খাদ্যাভ্যাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন সব ভিডিওর সুপারিশ করেই যাচ্ছে ইউটিউব।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংগঠন ‘সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেইট’ বা সিসিডিএইচ-এর নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিবিসি লিখেছে, গবেষণার জন্য প্রথমবারের মতো অনিরাপদ ডায়েট ও শারীরিক গঠন সম্পর্কিত কনটেন্ট দেখার জন্য ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর নামে নকল অ্যাকাউন্ট তৈরি করে সিসিডিএইচ।
ফলাফলে উঠে এসেছে, আগের দুই বছরের তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও ইউটিউবের ‘আপ নেক্সট’ অ্যালগরিদম প্রতি ১০টি ভিডিওর মধ্যে একটিতে ক্ষতিকর উপাদান, যেমন অতিরিক্ত রোগা হওয়ার অহেতুক অনুপ্রেরণা বা কঠোর ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের ভিডিওর সুপারিশ করছে।
ইউটিউবের মূল কোম্পানি গুগল বলেছে, ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়ানো বন্ধে তাদের প্রতিশ্রুতি ‘অটল’ এবং এ প্রতিবেদনে যেসব ভিডিওর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো এরইমধ্যে প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘অফকম’ বলেছিল, ইউটিউব ও টিকটক তরুণদের সুরক্ষায় যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সংস্থাটি আরও জোরালো সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির তাগিদ দেওয়ার পরই সিসিডিএইচ-এর এ নতুন গবেষণাটি সামনে এল।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের ‘অনলাইন সেইফটি অ্যাক্ট’ বা অনলাইন নিরাপত্তা আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্যকর হয়। এ আইন অনুসারে, ইউটিউবের মতো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের জন্য ১৮ বছরের কম বয়সীদের জীবনাবসানের চেষ্টা ও খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধি বা ইটিং ডিজঅর্ডার উসকে দেয় এমন বিপজ্জনক কনটেন্ট থেকে রক্ষা করা এখন আইনি দায়িত্ব।
পাশাপাশি এসব কোম্পানির ব্যবহৃত অ্যালগরিদম কীভাবে তরুণদের ক্ষতি করতে পারে তা বিবেচনা করা এবং সেই ঝুঁকি কমানোও বাধ্যতামূলক। এ নিয়ম অমান্য করলে বিভিন্ন কোম্পানিকে তাদের বৈশ্বিক আয়ের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে, যা ইউটিউবের ক্ষেত্রে শত শত কোটি পাউন্ডে দাঁড়াবে।
যুক্তরাজ্যের লেস্টারের ২২ বছর বয়সী জেসমিন কৌর ১৩ বছর বয়সে ‘অ্যানোরেক্সিয়া’ বা খাদ্যাভ্যাসের এক ধরনের মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। তখন থেকে পরবর্তী ছয় বছর তাকে এনএইচএস-এর চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।
জেসমিন বলেছেন, “শুরুটা খুব স্বাভাবিকভাবেই হয়েছিল। আমি আরও ফিট হতে চেয়েছিলাম। ফলে অনলাইনে খোঁজ শুরু করি এবং ভেতরের সত্য না বুঝেই সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্টকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করি।”
ইটিং ডিজঅর্ডারের পেছনে অনেক জটিল কারণ থাকে এবং কেবল অনলাইন কনটেন্ট দিয়ে কারও এই সমস্যা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।
জেসমিন বলেছেন, ইউটিউব ও অন্যান্য সাইটের কিছু কনটেন্ট উপকারী হলেও ‘বেশিরভাগ সময়ই এগুলো পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলত’।
“হাসপাতাল থেকে ফেরার পর আমি সারাক্ষণ ফোনে পড়ে থাকতাম। শেষদিকে আমাকে এতটাই চরম পর্যায়ের কনটেন্ট দেখানো হত যে, আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম।”
পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় জেসমিন নিজের সব সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি এখন পেডিয়াট্রিক নার্সিংয়ে স্নাতকোত্তর এবং ছুটির দিনগুলোতে প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিটে কাজ করছেন।
‘একটি ক্ষতিকর ভিডিও মানেও অনেক’
অনলাইন জগতের ক্ষতি নিয়ে কাজ করা অলাভজনক গবেষণা সংগঠন সিসিডিএইচ এই নতুন আইন কার্যকর হওয়ার আগের ও পরের পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র পেতে যুক্তরাজ্যের এক ১৩ বছর বয়সী কিশোরীর কৃত্রিম প্রোফাইল ব্যবহার করেছে।
গবেষকরা প্রথমে ডায়েট ও বডি ইমেজ সংক্রান্ত ১০টি সম্ভাব্য ক্ষতিকর ভিডিও দেখেন, যা এ ধরনের কনটেন্টের প্রতি নতুন কোনো ব্যবহারকারীর আগ্রহ দেখানোর আচরণেরই একটি অনুকরণ। এরপর তারা ইউটিউবের ‘আপ নেক্সট’ অ্যালগরিদমের সুপারিশকৃত পরবর্তী ১০০টি ভিডিওর ওপর বিশ্লেষণ চালান।
ফলাফলে উঠে এসেছে, ২০২৬ সালে এসে এসব রেকমেন্ডেশন বা সুপারিশের প্রতি ১০টির মধ্যে ১টি ভিডিও ক্ষতিকর ইটিং ডিজঅর্ডার কনটেন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তবে ২০২৪ সালে সিসিডিএইচ-এর করা একই পরীক্ষায় প্রতি চারটি ভিডিওর মধ্যে একটি ক্ষতিকর পাওয়া গিয়েছিল, যা থেকে বোঝা যায় বর্তমান পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের টিনএজারদের প্রোফাইল ব্যবহার করে পরীক্ষাটি করা হলে সেখানেও একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায়।
সিসিডিএইচ-এর সিনিয়র রিসার্চ ম্যানেজার আলেকজান্দ্রা জনসন বলেছেন, এ প্রতিবেদন থেকে ‘কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে’, যা থেকে ইঙ্গিত মেলে, আইনি কড়াকড়ির ইতিবাচক প্রভাবও রয়েছে।
তবে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, “তবে এমন একটি ভিডিও মানেও অনেক বেশি। আমরা চাই না এ ধরনের কোনো কনটেন্ট, বিশেষ করে কোনো সংবেদনশীল ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছাক। কারণ অ্যালগরিদমের সামান্য এক ধাক্কাই তাদের বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।”
ইউটিউবের সুপারিশ করা বিভিন্ন কনটেন্টের মধ্যে ছিল অতিরিক্ত চিকন হওয়াকে আদর্শ মনে করা মেয়েদের সংকলন নিয়ে তৈরি একটি ‘থিনস্পো’ বা ‘থিনস্পিরেশন’ অ্যাকাউন্ট; একটি ভিডিও, যেখানে দৈনিক কেবল ১৭০ ক্যালরি গ্রহণের ডায়েট প্রমোট করা হচ্ছিল, যা টিনএজারদের স্বাস্থ্যকর মাত্রার চেয়ে কম এবং অবচেতন মনকে প্রভাবিত করে ওজন কমানোর দাবি করা আরেকটি ভিডিও, যার সঙ্গে যোগ একটি নথিতে ‘সবচেয়ে জীর্ণ ও কঙ্কালসার দেহ’ পাওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়েছিল।
গবেষণায় ‘ক্রাইসিস প্যানেল’ বা সতর্কবার্তা বক্স নিয়েও অনুসন্ধান চালিয়েছেন গবেষকরা। সংবেদনশীল বিষয়ের ভিডিওর নিচে নীল রঙের এ বক্সটি ব্যবহারকারীদের নির্ভরযোগ্য সহায়তা সেবা বা কাউন্সেলিংয়ের সন্ধান দিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে এসে ইউটিউবের অ্যালগরিদমের সুপারিশকৃত ক্ষতিকর ইটিং ডিজঅর্ডার ভিডিওগুলোর কোনোটিতেই এ ক্রাইসিস প্যানেল চালু হয়নি, অথচ সিসিডিএইচ ক্ষতিকর বলে মনে করেনি এমন অন্যান্য সাধারণ ডায়েট ও বডি ইমেইজের ভিডিওর নিচে এ সতর্কবার্তা ঠিকই দেখা গেছে।
এ বিষয়ে গুগল বলেছে, তারা ইউটিউবে এমন কনটেন্ট নিষিদ্ধ করেছে, যা ইটিং ডিজঅর্ডারে উৎসাহিত করে বা এর নির্দেশনা দেয়। তবে একইসঙ্গে তারা ‘লোকজনকে সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প শেয়ার করার সুযোগ দেয়’।
সিসিডিএইচ-এর প্রতিবেদনে উঠে আসা ভিডিওগুলো কমিউনিটি গাইডলাইন লঙ্ঘনের দায়ে এরইমধ্যে প্ল্যাটফর্মটি থেকে সরিয়ে ফেলেছে ইউটিউব।
প্লাটফর্মটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমাদের দর্শকদের সুস্বাস্থ্যই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের কার্যক্রমকে আরও উন্নত করতে আমরা এনএইচএস, মাইন্ড ও মিক্স-এর মতো বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি।”
ইউটিউব এখন বিশেষজ্ঞদের তৈরি বিশেষ কিছু ভিডিও প্ল্যাটফর্মটিতে যোগ করেছে, যা কোনো টিনএজারর অ্যাকাউন্ট থেকে হতাশা বা ইটিং ডিজঅর্ডারের মতো বিষয় লিখে সার্চ করা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামনে আনে।
শিশু ও তরুণদের মধ্যে ইউটিউবের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণে সিসিডিএইচ তাদের গবেষণার জন্য এ প্ল্যাটফর্মটিকে বেছে নিয়েছে। যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম-এর তথ্য অনুসারে, ৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের প্রায় ৮৮ শতাংশই ইউটিউব ব্যবহার করে।