১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

পারমাণবিক যুদ্ধ ও এআই ঝুঁকিতে মানবজাতি: ল্যানসেট

এসব ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম হলেও এআইয়ের তৈরি জৈব অস্ত্রের মাধ্যমে মানবসভ্যতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে।

পারমাণবিক যুদ্ধ ও এআই ঝুঁকিতে মানবজাতি: ল্যানসেট

আগামী ৭৫ বছরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন ১৭টি প্রধান সংকট চিহ্নিত করেছে ল্যানসেট কমিশন। ছবি: ম্যাগনিফিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 11 Oct 2026, 06:08 PM

Updated : 11 Oct 2026, 06:08 PM

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ক্ষতিকর ব্যবহার ও পারমাণবিক যুদ্ধের কারণে আগামী ২১০০ সালের মধ্যেই মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন এক বৈশ্বিক মূল্যায়নে সতর্ক করেছে ল্যানসেট।

বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নালটির প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত ১৭টি বড় সংকটের মধ্যে এ দুটিকে তালিকার শীর্ষে রাখার কথা প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন’-এর ‘ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন’-এর পরিচালক অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারে বলেছেন, “বর্তমানের নেতাদের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তই আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।”

আগামী ৭৫ বছরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন ১৭টি প্রধান সংকট চিহ্নিত করে ল্যানসেট কমিশন এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে ধনী দেশগুলোর পক্ষ থেকে সাহায্য বরাদ্দ কমানো, জলবায়ু সংকট ও শৈশবকালীন অপুষ্টি।

‘ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ’-এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব হুমকি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে সেগুলোকে সম্মিলিতভাবেই ঠেকাতে হবে, প্রতিটি সংকট ঠেকানোর জন্য ‘বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার পথও’ রয়েছে।

বর্তমান প্রবণতার ভিত্তিতে প্রতিটি হুমকির কারণে অসুস্থতা, প্রতিবন্ধীতা বা অকাল মৃত্যুর ফলে সুস্থ জীবনের কত বছর হারাতে হতে পারে তার একটি গাণিতিক হিসাব বা ‘ডিসঅ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স’ মডেল তৈরি করে তালিকাটি প্রস্তুত করেছে ল্যানসেট।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এআইয়ের ক্ষতিকর ব্যবহার (যার মধ্যে জৈব অস্ত্র অন্তর্ভুক্ত) ও পারমাণবিক যুদ্ধের ফলে তৈরি পারমাণবিক দুর্ভিক্ষ আগামী ৭৫ বছরের মধ্যে মানবজাতিকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।”

এসব ঘটার সম্ভাবনা কম হলেও পারমাণবিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে পর্যাপ্ত কণা ছড়িয়ে পড়ে সূর্যালোক আটকে দিয়ে বিশ্বজুড়ে দুর্ভিক্ষ ডেকে আনার বা এআইয়ের তৈরি জৈব অস্ত্রের মাধ্যমে মানবসভ্যতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা এগুলোর রয়েছে।

প্রতিবেদনটির সঙ্গে প্রকাশ পাওয়া ল্যানসেটের সম্পাদকীয়তে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “এসব ঝুঁকি বাস্তবে রূপ নিলে যে মাত্রার ক্ষতি হবে তা মানবজাতির জন্য সর্বনাশের শামিল।”

যেসব ঝুঁকি ১০০ কোটির বেশি প্রাণহানি ঘটাতে ও যেগুলোকে ‘মারাত্মক বড় ধরনের বিপর্যয়কর হুমকি হিসেবে ল্যানসেট চিহ্নিত করেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, বায়ু দূষণ, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়া, শৈশবকালীন অপুষ্টি, জলবায়ু বিপর্যয়, প্রচলিত যুদ্ধ, বৈদেশিক সাহায্য হ্রাস, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, উচ্চ রক্তচাপ, আয়ের বৈষম্য, শিক্ষার নিম্ন হার, প্রাকৃতিকভাবে তৈরি মহামারি, স্থূলতা, খারাপ মানসিক স্বাস্থ্য, ধূমপান ও অস্বাস্থ্যকর বার্ধক্য।

তালিকায় কোনো হুমকিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে সেটার কারণে বিপুল সংখ্যক সুস্থ জীবন হারানোর ঝুঁকির পাশাপাশি এর সম্ভাব্য সমাধান বা প্রতিকারের পথও রয়েছে।

কমিশনের সদস্য ও ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’-এর সংক্রামক রোগ মহামারি বিষয়ের অধ্যাপক ইব্রাহিম আবুবাকার বলেছেন, ‘সবাই দেখুন, আপনাদের ভয় দেখাতে চাই, মানবজাতি অমুক অমুক হুমকির মুখোমুখি’ - এমন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা কাজ শুরু করেননি।

“আমরা এই মূল ভাবনা থেকে শুরু করেছি, আপনি যদি আজকের একজন নীতি নির্ধারক হন তা বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক পর্যায়েই হোক বা জাতীয় পর্যায়ে তবে এগুলোই সেই সম্ভাব্য হুমকি যার মুখে আপনি পড়তে পারেন। এখন যদি আপনি পদক্ষেপ নেন তবে বড় মাত্রার ক্ষতি আটকে দিতে পারেন।”

প্রতিবেদনে প্রতিটি হুমকির ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো ও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মডেল বা গাণিতিক অনুমিতি তৈরি করা হয়েছে।

এতে দেখা গেছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে না দিয়ে তা ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে পদক্ষেপ নিলে সুস্থ জীবনের প্রায় ১৮৯ কোটি বছর হারিয়ে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।

উচ্চ আয়ের অঞ্চলগুলোতে স্থূলতা ও খারাপ মানসিক স্বাস্থ্যের মতো সংক্রামক নয় এমন রোগগুলোই ছিল প্রধান হুমকি। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের অঞ্চলগুলোতে স্বাস্থ্যহানির মূল কারণ ছিল শিক্ষার নিম্ন হারের মতো সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক বড় বড় দাতাগোষ্ঠী বা দেশ গত এক বছরে বৈদেশিক সাহায্য বরাদ্দে বড় ধরনের কাটছাঁটের ঘোষণা দিয়েছে।

কমিশন দেখেছে, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহায়তার সম্ভাব্য বিপর্যয় বা বরাদ্দ কমে যাওয়ার কারণে ২১০০ সালের মধ্যে অন্তত ১৫০ কোটি প্রাণহানি ঘটতে পারে, যার প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটবে সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলে। এ অঞ্চলই শিশুদের অপুষ্টির মূল শিকার।

মোট ৩৫ জন বিশেষজ্ঞ নিয়ে কমিশনটি গঠিত হয়েছিল এবং তাদের এই অনুসন্ধানী ফলাফল রোববার জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট’-এ উপস্থাপিত হবে।

চিহ্নিত ১৭টি হুমকি পুনর্মূল্যায়ন, নতুন তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে ও উদীয়মান কোনো বিপদ পর্যালোচনা করতে তাদের এ মূল্যায়ন প্রতি বছর আপডেট করা হবে।

প্রতিবেদনের লেখকরা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বিনিয়োগ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে ঝুঁকিসমূহ মহামারিতে রূপ নেওয়ার আগেই তা ঠেকানোর জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছেন।

অধ্যাপক মারে বলেছেন, “আমরা তিন বছর আগে যখন প্রক্রিয়াটি শুরু করেছিলাম তখন ভেবেছিলাম প্রধান বড় হুমকি কেবল তিনটি; যুদ্ধ, জলবায়ু ও মহামারি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে হুমকির সংখ্যা এর চেয়ে বেশি, যা নিয়ে আমাদের চিন্তা করা প্রয়োজন।

“বহুমুখী এসব হুমকি আগাম অনুধাবন, প্রতিরোধ ও ঠেকানোর প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বিভিন্ন সরকারের উচিত সুনির্দিষ্ট অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করা।”