Published : 24 Apr 2026, 11:35 AM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শর্ট ভিডিওর মোহ মানুষের অজান্তেই একাকীত্ব ও মানসিক উদ্বেগ বাড়িয়ে ধাপে ধাপে তাদের জীবনের সন্তুষ্টি কমিয়ে দিচ্ছে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
গবেষণা বলছে, টিকটকের মতো শর্ট ভিডিও দেখার সঙ্গে মানুষের মানসিক পরিবর্তনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এসবের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষের মধ্যে একাকীত্ব বাড়িয়ে তোলে। আর এ একাকীত্ব থেকে পরবর্তীতে উদ্বেগ তৈরি হয় ও জীবনের প্রতি মানুষের তৃপ্তি কমে যায়।
অনলাইন পোর্টাল সাইপোস্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, শর্ট ভিডিওর ব্যবহার কীভাবে মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলে তা বোঝার জন্য এ গবেষণাটি চালিয়েছেন গবেষক তুগবা তুর্ক কুর্তকা ও মুহাম্মদ কান দোরু।
টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ইউটিউব শর্টসের মতো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের পছন্দের ওপর ভিত্তি করে নিরবচ্ছিন্নভাবে ভিডিও দেখাতে থাকে। এসব প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম এত দ্রুত ও এলোমেলোভাবে ভিডিও সামনে আনে যে, ব্যবহারকারীরা নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ন্ত্রণহীনতা শর্ট ভিডিওর আসক্তিতে পরিণত হয়। ডিজিটাল অভ্যাসের এ ধরনটি এমন এক পর্যায়, যেখানে একজন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছোট ছোট ভিডিও দেখে কাটিয়ে দেন।
‘ট্রাকিয়া ইউনিভার্সিটি’র সহযোগী অধ্যাপক কুর্তকা বলেছেন, “শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলো খুব দ্রুত জনপ্রিয় হলেও বেশিরভাগ গবেষণাই সাধারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে করা হয়েছে। শর্ট ভিডিওর আসক্তি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সুস্থতার ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে সে বিষয়ে তথ্যের বেশ ঘাটতি ছিল।
“আমরা কেবল এর প্রভাব রয়েছে কি না তা-ই নয়, বরং এর পেছনের মানসিক প্রক্রিয়াটিও বুঝতে চেয়েছিলাম, বিশেষ করে একাকীত্ব ও উদ্বেগের ভূমিকা এখানে কতটা দায়ী সেটিই আমরা খুঁজে বের করতে চেয়েছি।”
বিষয়টি আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য গবেষকরা দুটি প্রতিষ্ঠিত মনস্তাত্ত্বিক ধারণাকে ভিত্তি হিসেবে নিয়েছেন। প্রথমটি ‘ডিসপ্লেসমেন্ট হাইপোথিসিস’ বা প্রতিস্থাপন তত্ত্ব।
এ তত্ত্ব অনুসারে, মানুষ অনলাইনে যে সময়টুকু ব্যয় করেন তা সরাসরি তার বাস্তব জীবনের অর্থপূর্ণ কাজ ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশার সময়কে দখল করে নেয়। ফোনের স্ক্রিন যখন একজন মানুষের সময় ও চিন্তাশক্তি কেড়ে নেয় তখন তিনি বাস্তব জগতের আবেগনির্ভর সমর্থন ও সামাজিক সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হন।
দ্বিতীয় ধারণাটি হচ্ছে, ‘সেলফ-ডিটারমিনেশন থিওরি’ বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব। এ তত্ত্ব বলে, একজন মানুষের মানসিকভাবে সুস্থ ও কর্মসক্ষম থাকার জন্য নিজস্ব স্বাধীনতা, দক্ষতা ও সামাজিক যোগাযোগ বা মেলবন্ধনের প্রয়োজন।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, শর্ট ভিডিওর প্রতি আসক্তি মানুষের এসব মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা পূরণে বাধা তৈরি করে। ডিজিটাল অভ্যাসগুলো ঠিক কীভাবে ধাপে ধাপে মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে জীবনের সন্তুষ্টি কমিয়ে দেয় তা যাচাই করতেই এ গবেষণা।
ডিজিটাল অভ্যাস নিয়ে আগে করা অনেক গবেষণাই ছিল ‘ক্রস-সেকশনাল সার্ভে’ বা এককালীন জরিপভিত্তিক, যা কেবল নির্দিষ্ট সময়ের চিত্র তুলে ধরেছে। তবে বর্তমান গবেষণায় গবেষকরা ভিন্ন দুটি সময়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, যাতে মানসিক পরিবর্তনের এ ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
‘হাফ-লংজিটিউডিনাল’ বা আংশিক দীর্ঘমেয়াদী নামের এ বিশেষ পদ্ধতির ফলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হতে পেরেছেন, কোন ধরনের মানসিক অবস্থা আগে তৈরি হয় এবং পরে তা অন্য কোন আবেগের ওপর প্রভাব ফেলে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হওয়া এসব মানসিক পরিবর্তনের ধারা নজরে রাখতে বিজ্ঞানীরা ‘টু-ওয়েভ ডিজাইন’ বা দুই ধাপে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এ পদ্ধতির মাধ্যমে ইউনিভার্সিটির একটি সেমিস্টার বা তিন মাস সময়ের মধ্যে মানসিক অবস্থার বিভিন্ন পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন তারা।
গবেষণার প্রথম ধাপের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং দ্বিতীয় ধাপের ফলো-আপ সম্পন্ন হয় একই বছরের মে মাসে। গবেষণায় মোট ২৩৪ জন অংশ নিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ১৮৩ জন নারী ও ৫১ জন পুরুষ। তাদের গড় বয়স ছিল ২২ বছর এবং অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, তারা গড়ে প্রতিদিন প্রায় আড়াই ঘণ্টা শর্ট ভিডিও দেখে কাটান, যার বেশিরভাগই ইনস্টাগ্রাম রিলস ও টিকটক।
গবেষকরা উভয় সময়েই চারটি নির্দিষ্ট বিষয় পরিমাপের জন্য প্রশ্নাবলী ব্যবহার করেছেন। শর্ট ভিডিওর প্রতি আসক্তি যাচাই করতে তারা অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চেয়েছেন, ভিডিও দেখতে দেখতে তারা সময়ের খেয়াল হারিয়ে ফেলেন কি না বা ব্যবহারের পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন কি না।
এ ছাড়া, একাকীত্ব পরিমাপের জন্য সামাজিক বর্জন ও আবেগীয় বিচ্ছিন্নতার মতো অনুভূতিগুলো নিয়ে তাদের প্রশ্ন করা হয়, অর্থাৎ তারা অন্যদের কাছে কতটা অবহেলিত বোধ করছেন বা মানসিকভাবে কতটা একা এসব বিষয়ও যাচাই করে একাকীত্বের মাত্রা নির্ধারণ করেছেন গবেষকরা।
উদ্বেগের মাত্রা পরিমাপের জন্য নির্দিষ্ট ‘মানসিক চাপ স্কেল’ ব্যবহৃত হয়, যা নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি এবং কোনো সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
এরপর গবেষকরা ‘জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি’ বিষয়টি মূল্যায়ন করেন, যেখানে একজন মানুষের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে তার প্রত্যাশার মিল কতটা। অংশগ্রহণকারীরা তাদের জীবন নিয়ে সামগ্রিক তৃপ্তির বিষয়টি রেটিংয়ের মাধ্যমে জানান।
তিন মাসের ব্যবধানে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা ধারাবাহিক এক মানসিক পরিবর্তনের পথ খুঁজে পেলেন। তারা বলেছেন, গবেষণার শুরুতে যাদের মধ্যে শর্ট ভিডিওর প্রতি আসক্তি বেশি ছিল তিন মাস পর তাদের মধ্যে একাকীত্বের পরিমাণ বেড়েছে। শর্ট ভিডিওর মাধ্যমে পাওয়া দ্রুত ও অগভীর বিনোদন গভীর ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্কের জায়গা দখল করে নিল, যার ফলে মানুষের অনলাইন যোগাযোগ বাড়লেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত জীবনকে অন্তঃসারশূন্য করে তোলে এবং কেবল লোকদেখানো বা ভাসা-ভাসা অনলাইন নেটওয়ার্কের দিকে ঠেলে দেয়।
এই প্রাথমিক বিচ্ছিন্নতা পরবর্তীতে আরও মানসিক সমস্যার জন্ম দেয়। গবেষণার শুরুতে যারা বেশি একাকীত্বে ভুগতেন দ্বিতীয় দফায় তাদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে ব্যক্তি প্রয়োজনীয় সামাজিক সমর্থন থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে তারা নিজেদের সমাজচ্যুত মনে করতে শুরু করেন এবং ছোটখাটো মানসিক চাপেও দ্রুত ভেঙে পড়েন।
গবেষকরা বলছেন, এই বেড়ে যাওয়া উদ্বেগ পরবর্তী সময়ে মানুষের জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ মানুষের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত করে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক কোনো আশা রাখার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এর ফলে ব্যক্তি তার জীবনকে সার্বিকভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হিমশিম খায়।
সহযোগী অধ্যাপক কুর্তকা বলেছেন, “গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল পর্যায়ক্রমিক ধারাটি। একাকীত্ব ও উদ্বেগ এখানে আলাদাভাবে কাজ করেনি, বরং তারা শিকলের মতো যোগ হয়ে শর্ট ভিডিওর ব্যবহারকে মানুষের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছে।
“এসব প্রভাব আলাদাভাবে ছোট মনে হলেও ধীরে ধীরে জমা হয়ে বড় আকার ধারণ করে। ফলে বিষয়টি কেবল স্ক্রিন টাইমের নয়, বরং ওই সময়টুকু কীভাবে আমাদের জীবনের অর্থবহ সামাজিক সম্পর্কগুলোকে বদলে দিচ্ছে সেটাই আসল উদ্বেগের কারণ।”
তবে সব গবেষণার মতো এ গবেষণাতেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেহেতু এসব তথ্য পুরোপুরি অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দেওয়া উত্তরের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে, ফলে এখানে ব্যক্তিগত ভালো-মন্দলাগার প্রভাব থাকতে পারে।