Published : 17 Jun 2026, 10:42 AM
বর্তমানের প্রযুক্তিবিশ্ব যখন ব্যবহারকারীদের স্ক্রিনে আটকে রেখে এনগেজমেন্ট বাড়াতে উন্মুখ, তখন অ্যাপল হাঁটছে ভিন্ন পথে। এআই চ্যাটবটের আসক্তি ও বাণিজ্যিক চাটুকারিতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অ্যাপলের ভাবনা, প্রযুক্তির কাজ মানুষের জীবনকে শাসন করা নয়, বরং আড়ালে থেকে জীবনকে সহজ করা।
এআই চ্যাটবটের কাজ আসলে কী? এআই কী তৈরি করে? বিনোদন নয়, শিল্পকলা নয়, পারস্পরিক বন্ধন নয়, উৎপাদনশীলতাও নয়। এসব বিভ্রান্তিকর চ্যাটবট মানুষের জীবনে ভুল তথ্যের যে বন্যা বইয়ে দিচ্ছে তা থেকে অন্তত এটুকু নিশ্চিত, এআই বিশ্ব সম্পর্কে মানুষের মনে গভীর কোনো বোধ তৈরি করে না।
তাহলে আসল উত্তরটা কী? আসল উত্তর হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরশীলতা বা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম কোম্পানির ভাষায় যাকে ইতিবাচকভাবে বলে ‘এনগেজমেন্ট’।
অ্যাপল পণ্য, পরিষেবা ও তাদের ইকোসিস্টেম সম্পর্কিত সংবাদমাধ্যম ম্যাকওয়ার্ল্ড প্রতিবেদনে লিখেছে, এআইয়ের নকশাই এমনভাবে করা হয়েছে, যেন এর ব্যবহার মানুষকে আরও বেশি এআই ব্যবহারে প্ররোচিত করে, আর বাকি যা কিছু ঘটে তা নিতান্তই আনুষঙ্গিক।
সাধারণভাবে চ্যাটবটগুলোর চরিত্র এমনই। তবে কিছু কোম্পানি নিজেদের এর ব্যতিক্রম বলে দাবি করে। যেমন অ্যাপলের শীর্ষ কর্তারা গেল সপ্তাহে ‘মোস্টলি হিউম্যান’ নামের এক প্রযুক্তিবিষয়ক পডকাস্টে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, যেখানে তারা নিজেদের নতুন উন্মোচিত ‘সিরি এআই’-এর সঙ্গে অন্যান্য এআই সেবার ব্যবহারকারীকে ধরে রাখার এ বুভুক্ষু কৌশলের বৈসাদৃশ্য তুলে ধরেছেন।
অ্যাপলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ক্রেইগ ফেডেরিঘি বলেছেন, “বর্তমানে বাজারে থাকা প্রচলিত বিভিন্ন চ্যাটবটের বেশিরভাগই এনগেজমেন্ট ও চাটুকারিতার ওপর নির্ভরশীল। তারা আপনাকে নিজেদের দিকে টেনে নিতে চায়। তারা হয়ত আপনাকে আপনার নিজের সম্পর্কে নানা তথ্য প্রকাশ করতে উৎসাহিত করবে ও পরবর্তীতে সেটিকে ভিত্তি করে আপনার সঙ্গে আত্মিক এক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইবে।”
অ্যাপলের পক্ষ থেকে ক্রেইগ বলছেন, “আমরা বিষয়টিকে সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি।”
গোটা এআই ইন্ডাস্ট্রির এ সর্বজনীন কৌশলের বিরুদ্ধে এমন সাহসী প্রত্যাখ্যান কিন্তু এআইয়ের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর করা কোনো সাধারণ প্রশ্নের জবাবে আসেনি। এমনটা এসেছে সাক্ষাৎকার নেওয়া লরি সেগালের এক প্রশ্নের জবাবে, যেখানে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, “সিরি এআইকে কি প্রেমের সঙ্গী বা রোমান্টিক পার্টনার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব?”
ফেডেরিঘি বলেছেন, “আমরা বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছি। আমরা সিরিকে যেভাবে তৈরি করেছি তাতে সিরি আসলে বলতে চায়, ‘শুনুন, আমি কিন্তু এ কাজের জন্য এখানে আসিনি। আমি আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি। পৃথিবী সম্পর্কে জানতে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।’ তবে আপনি যদি সিরিকে আপনার প্রেমের সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার চেষ্টা করেন সিরি তাতে মোটেও রাজি নয়।”
ফলে সিরির সঙ্গে রোমান্সের অধ্যায় এখানেই শেষ।
তবে আলোচনা কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি। ভার্চুয়াল জগতের এ ঘনিষ্ঠতা নিয়ে অ্যাপলের দৃষ্টিভঙ্গি প্রযুক্তির প্রকৃত চরিত্র ও দর্শনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
সেগালের ভাষায়, যেসব জিনিস ‘সেক্সি’ বা আকর্ষণীয় নয় সেগুলোর উপযোগিতা ও যেগুলো আকর্ষণীয় সেগুলোর বিপদের ওপর বিষয়টি দাঁড়িয়ে আছে।
ফেডেরিঘি এক সতর্ক করে বলেছেন, “আমি মনে করি না, এ আকর্ষণীয় অংশটি আপনার কম্পিউটারের ভেতরে থাকা উচিত। এমনটা আপনার বাস্তব জীবনেই থাকা উচিত।”
প্রযুক্তি, বিশেষ করে এআই মানুষের অস্তিত্বের বড় অংশ দখল করে নেওয়ার এবং তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। এআই হয়ত সবসময় ব্যবহারকারীকে ধরে রাখার পেছনে ছোটে। এ দৌড়ে এআই একা নয়। মানুষের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্মার্টফোনগুলোও এগিয়ে।
সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন অ্যালগরিদম তো মানুষের ক্ষোভ ও ভুল তথ্যকে ‘এনগেজমেন্ট’-এ রূপান্তরের জন্য প্রতিনিয়ত আরও উন্নত ও জটিল পদ্ধতি তৈরি করে চলেছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের মুনাফা এনে দিচ্ছে। অনেক অভিভাবক ও কিছু আইনপ্রণেতা এসব অগ্রগতিকে উদ্বেগজনক বলেছেন, বিশেষ করে শিশুদের ওপর এর প্রভাবের কারণে।
তবে প্রযুক্তি খাতের এসব প্রযুক্তি জায়ান্টের কাছে এত বিপুল অর্থ ও লবিয়িস্ট রয়েছে যে, তারা যে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে সহজেই ঠেকাতে পারে।
এক্ষেত্রে অ্যাপল যেন নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে রেখেছে। তাদের এ চটকদার কথা বিশ্বাস না করলেও কোম্পানিটি দাবি করেছে, ব্যবহারকারীকে স্ক্রিনে আটকে রাখতে চায় না তারা। প্রকৃতপক্ষে, তারাই হয়ত প্রথম প্রযুক্তি কোম্পানি যারা নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহারে গ্রাহকদের সক্রিয়ভাবে নিরুৎসাহিত করেছে।
ফিরে যাওয়া যাক ২০১৮ সালে। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সময়ের ডব্লিউডব্লিউডিসি ইভেন্টে অ্যাপল তাদের ‘আইওএস ১২’ উন্মোচন করেছিল। এতে ‘স্ক্রিন টাইম’ নামের নতুন ফিচার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহারের সময়সীমা ট্র্যাক করত এবং ব্যবহারকারীকে অ্যাপ ব্যবহার ও কেনাকাটার ওপর সময়সীমা নির্ধারণের সুবিধা দিত।
ওই সময় অ্যাপল প্রধান টিম কুক অকপটে স্বীকার করেছিলেন, “আমি নিজেই ফিচারটি ব্যবহার করছি, আর সত্যি বলতে, আমি ভাবতাম এ বিষয়ে আমার বেশ ভালো আত্মনিয়ন্ত্রণ আছে। তবে আমি ভুল ছিলাম। আমি যতটুকু ভাবতাম, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ফোন স্ক্রিনে কাটাচ্ছিলাম।”
ফিচারটির মূল উদ্দেশ্যই ছিল অ্যাপল গ্রাহকদের আইফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় কমিয়ে আনতে উৎসাহিত করা।
তবে আইফোনের ‘ফোকাস মোড’গুলোর উদ্দেশ্যও ব্যবহারকারীকে আটকে রাখার এ কৌশলের সম্পূর্ণ বিরোধী। এগুলো নোটিফিকেশন ফিল্টার করতে ও মনোযোগের বিচ্যুতি কমাতে তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটি চায় ব্যবহারকারী নিজের জীবনের এমন কিছু দিকে মনোযোগ দিন, যা স্ক্রিনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
যেমন ব্যায়াম, ঘুম বা কারো ব্যক্তিগত জীবন। এসব মোড যদি ঠিকঠাক কাজ করে তবে তা তার ডিভাইসের পেছনে ব্যয় করা সময়কে কমিয়ে দেয় বা নিশ্চিত করে, আপনি যেন আরও সচেতন ও সীমিত উপায়ে নির্দিষ্ট কাজের উদ্দেশ্যে ফোনটি ব্যবহার করছেন। একজন প্রযুক্তি বিলিয়নেয়ারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এমনটা আসলে ব্যবসার সব নিয়ম ভেঙে ফেলার শামিল।
তবে অ্যাপল এ ঝুঁকি পেরিয়ে যেতে পারে। কারণ তাদের ব্যবসায়িক মডেল ব্যবহারকারীদের বিজ্ঞাপন দেখানো বা তাদের ডেটা হাতিয়ে নেওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। তারা জানে, গ্রাহকদের ডিজিটাল নরকে আটকে রাখার চেয়ে তাদের সুস্থ ও সুখী জীবনযাপনে সাহায্য করার মতো ফিচার তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের চাবিকাঠি। প্রযুক্তির কাজ মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করা, জীবনকে শাসন করা নয়।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে অ্যাপলের ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড মার্কেটিং’ বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট গ্রেগ জসউইয়াক বলেছেন, “আমরা তো সেটাই পছন্দ করি, প্রযুক্তি যেন আড়ালে চলে যায়, তাই নয়? ওই সময় আপনি কেবল আপনার কাজ বা প্রয়োজনীয় কনটেন্টের ওপর মনোযোগ দিতে পারবেন।”
এখানে প্রযুক্তি মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হচ্ছে প্রযুক্তি কী এবং কীভাবে তা ব্যবহারকারীর সেরা সেবা নিশ্চিত করতে পারে। ব্যবহারকারীদের জীবনকে আরও সুন্দর করার সেরা উপায় হতে পারে প্রযুক্তি, যা নিজেই যেন মানুষের জীবনের লক্ষ্য বা গন্তব্য না হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি কেবল একটি মাধ্যম বা হাতিয়ার, যার একমাত্র সার্থকতা মানুষের বাস্তব জীবনকে সহজ ও সুন্দর করায়।