Published : 28 May 2026, 04:08 PM
হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সোনার উজ্জ্বল ও স্থায়ী আভায় মুগ্ধ। প্রাচীনকাল থেকেই গয়না, মুদ্রা ও নানা শিল্পকর্মে সোনার ব্যবহার হয়ে আসছে, যা আজও সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক।
সোনার সবচেয়ে বড় জাদু এর উজ্জ্বলতা কখনো মলিন হয় না। বাতাসের সংস্পর্শে এলে রুপা যেখানে ধীরে ধীরে কালো হয়ে যায়, সোনা সেখানে শত শত বছর ধরে একই রকম চকচকে থাকে।
সম্প্রতি ‘টুলেন ইউনিভার্সিটি’র গবেষকরা সোনার এই চিরসবুজ থাকার পেছনে এক চমৎকার রহস্য উন্মোচন করেছেন, যা বিজ্ঞানীদের আগের ধারণার চেয়েও বেশ জটিল।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’-এ।
গবেষণা বলছে, সোনার উপরিভাগ নিজে থেকেই এক অদ্ভুত উপায়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখে, যেখানে সোনা এর বিভিন্ন পরমাণুকে এমনভাবে সাজিয়ে নেয়, যাতে অক্সিজেন এর সঙ্গে কোনো বিক্রিয়া করতে না পারে। আত্মরক্ষার এ কৌশলের কারণেই সোনা কখনো নিজের ক্ষয় বা ঔজ্জ্বল্য হারায় না।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের অনুমান ছিল, সোনা চকচকে থাকে কারণ তা অক্সিজেনের সঙ্গে সহজে বিক্রিয়া করে না। কিন্তু কেন বিক্রিয়া করে না, সে রহস্যই খুলল সম্প্রতি।
সাধারণত অক্সিজেনই বেশিরভাগ ধাতুর ঔজ্জ্বল্য নষ্ট করা বা মরিচা পড়ার জন্য দায়ী, যাকে ইংরেজিতে বলে অক্সিডেশন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোহায় মরিচা পড়ে, রুপা কালো হয়ে যায় ও তামাটে রঙে সবুজাভ স্তর জমে। তবে সোনা যেন প্রকৃতির এই নিয়মের একেবারে বাইরে, সবসময়ই নিখুঁত।
নতুন গবেষণা বলছে, সোনা কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রতি উদাসীন বা ‘অলস’ বলেই এমনটা ঘটে না, বরং সোনার কিছু উপরিভাগ অক্সিজেনের আক্রমণ ঠেকাতে নিজেদের গঠনকে সক্রিয়ভাবে পুনর্গঠিত করে নেয়।
গবেষক দলটি উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশনের সাহায্যে দুই ধরনের সাধারণ সোনার উপরিভাগের ওপর অক্সিজেনের অণু কীভাবে কাজ করে তা পরীক্ষা করেছেন।
তারা বলছেন, সোনার উপরিভাগের বিভিন্ন পরমাণু নিজেদের এমন এক বিশেষ বিন্যাসে বদলে নিতে পারে, যা ভেঙে অক্সিজেনের পক্ষে ধাতুর সঙ্গে বিক্রিয়া করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
পরমাণুর এ বিশেষ বিন্যাস বা ওলটপালট না হলে অক্সিজেন খুব সহজেই সোনার সঙ্গে বিক্রিয়া করতে পারত। তবে একবার উপরিভাগের বিভিন্ন পরমাণু এ সুরক্ষাকবচ তৈরি করে ফেললে অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করার সুযোগ এক ধাক্কায় শত কোটি থেকে লাখ কোটি ভাগের একভাগে নেমে আসে।
সহজ কথায়, সোনার উপরিভাগ নিজের আশপাশে পরমাণুর এমন এক অদৃশ্য ঢাল তৈরি করে, যা একে যুগ যুগ ধরে চকচকে আর দাগহীন রাখে।
বিজ্ঞানীদের এ গবেষণা সোনা দিয়ে তৈরি ‘ক্যাটালিস্ট’ বা অনুঘটক উন্নত করতেও সাহায্য করবে। অনুঘটক হচ্ছে এমন উপাদান, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতিতে প্রভাব ফেলে। শিল্পকারখানায় এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও রাসায়নিক পণ্য তৈরির মতো কিছু কাজে সোনা এরইমধ্যে অনুঘটক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে, যে গুণের কারণে সোনা সবসময় চকচকে থাকে, অর্থাৎ অক্সিজেনের বাধা দেওয়ার সক্ষমতা ঠিক সেই গুণের কারণেই অনুঘটক হিসেবে এর কার্যকারিতা কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ে।
গবেষকরা বলছেন, সোনার উপরিভাগের এ সুরক্ষামূলক বিন্যাস যদি কোনোভাবে থামানো বা উল্টে দেওয়া যায় তবে রাসায়নিক বিক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে সোনাকে আরও বেশি কার্যকর করে তোলা সম্ভব, যা প্লাস্টিক তৈরি, যানবাহনের নির্গত ধোঁয়া পরিষ্কার ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-রাসায়নিক উৎপাদনের প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করতে পারে।
সাধারণত বিজ্ঞানীরা সোনার অনুঘটকের কার্যকারিতা বাড়াতে সোনার সঙ্গে অন্য ধাতু মেশাতেন বা সোনার অতি ক্ষুদ্র কণা ব্যবহার করতেন।
তবে নতুন এ গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, এর আরেকটি সমাধানও আছে, তা হচ্ছে, সরাসরি সোনার উপরিভাগের পরমাণুর আকৃতি ও বিন্যাস বদলে দেওয়া।
এ গবেষণাটি কেবল সোনার সবচেয়ে বিখ্যাত গুণের রহস্যই উন্মোচন করেনি, বরং ভবিষ্যতে আরও পরিবেশবান্ধব এবং কার্যকর শিল্প-প্রযুক্তি গড়ে তোলার পথও দেখাতে পারে।