Published : 23 Aug 2026, 01:09 PM
চাঁদের দক্ষিণ মেরুর চির-অন্ধকার ও তীব্র শীতল গহ্বরে জমাটবাঁধা পানির সন্ধান চালাতে নিজেদের সবচেয়ে জটিল মহাকাশ অভিযান উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে চীন।
‘চাং’ই-৭’ অভিযানের মূল লক্ষ্য চাঁদের দুর্গম অঞ্চলে পানির উপস্থিতি নিশ্চিত করা, যা ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে চীনা নভোচারী পাঠানো ও স্থায়ী গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার পথ সুগম করবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
চীনা পৌরাণিক চন্দ্রদেবীর নামে এ মনুষ্যহীন অভিযানে সৌরজগতের অন্যতম শীতল স্থানে রোবোটিক ল্যান্ডার, রোভার ও একটি ‘হপিং’ বা লাফিয়ে চলা প্রোব পাঠানো হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে নভোচারী পাঠানো ও ২০৩৫ সালের মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে স্থায়ী এক গবেষণা স্টেশন গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ অভিযান চীনের জন্য বড় মাইলফলক।
কোথায় যাবে চাং’ই-৭?
দক্ষিণাঞ্চলীয় হাইনান দ্বীপের ওয়েনচাং স্পেস লাঞ্চ সাইট থেকে ‘লং মার্চ ৫’ রকেটের সাহায্যে উৎক্ষেপিত হবে চাং’ই-৭ মহাকাশযানটি। এতে ওয়াটার অ্যানালাইজার, বিশেষ ক্যামেরা ও রেডারসহ একাধিক বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম থাকছে।
চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানটি দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের উপযোগী বিভিন্ন স্থান নিরীক্ষা করবে। চাঁদের সম্ভাব্য স্থানের একটি হচ্ছে চির-অন্ধকারাচ্ছন্ন ‘শ্যাকলটন ক্রাটার’-এর প্রান্তদেশ, যার আশপাশের ধারগুলো সবসময়ই সূর্যের আলোতে আলোকিত থাকে।
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযানের নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ না করলেও মহাকাশ গবেষকদের ধারণা, আগামী নভেম্বরের মধ্যে ল্যান্ডারটি চাঁদের মাটিতে নামার চেষ্টা করবে।
অবতরণের পর রোভার ও হপিং প্রোবটি তাদের পর্যবেক্ষণ কাজ শুরু করবে। তবে এ মিশন কতদিন স্থায়ী হবে সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
কেন লক্ষ্য দক্ষিণ মেরু?
চাঁদের দক্ষিণ মেরুর গভীর গহ্বরগুলোতে প্রায় শত কোটি বছর ধরে সূর্যের আলো পৌঁছায়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, স্থায়ীভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন এসব এলাকা বড় ডিপ-ফ্রিজের মতো কাজ করছে, যেখানে সংরক্ষিত রয়েছে প্রাচীন পানি ও বাষ্পীভবনযোগ্য জৈব উপাদান।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র তথ্য অনুসারে, এসব এলাকার তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে ২০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বা মাইনাস ৩৩৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট নেমে যেতে পারে।
ভবিষ্যতের মহাকাশ স্টেশনের জন্য পানির সহজলভ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদের পানি থেকে নভোচারীদের খাবার পানি ও অক্সিজেন তৈরি সম্ভব। পাশাপাশি রকেটের জ্বালানি তৈরি করে পৃথিবী থেকে অতিরিক্ত রসদ পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা কমানো যাবে।
চাঁদের সাধারণ এলাকাগুলোতে এক একটি রাত পৃথিবীর ১৪ দিনের সমান দীর্ঘ হলেও দক্ষিণ মেরুর উঁচু পাহাড় ও গহ্বরের প্রান্তগুলোতে প্রায় সবসময় সূর্যালোক পাওয়া যায়। ফলে সৌরশক্তির নির্ভরযোগ্য উৎস পাওয়ার পাশাপাশি স্থায়ী চন্দ্রঘাঁটি তৈরির জন্য এটাই উপযোগী স্থান।
যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও রাশিয়াও চাঁদের দক্ষিণ মেরুকে মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ভারত ২০২৩ সালে তাদের ‘চন্দ্রযান-৩’ দিয়ে এ অঞ্চলের কাছাকাছি সফলভাবে অবতরণ করে প্রথম ইতিহাস গড়েছিল।
আগামী বছরগুলোতে নাসার ‘ভাইপার’ রোভার, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘প্রোস্পেক্ট' ড্রিলিং প্যাকেজ’ ও জাপান-ভারতের যৌথ ‘লুপেক্স’ রোভারের চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
অন্ধকারে রোবটের নতুন চ্যালেঞ্জ
চাঁদের গহ্বরের খাড়া ও অন্ধকার ঢালে সাধারণ চাকাওয়ালা রোভার চালনা করা কঠিন। এ কারণে চাং’ই-৭ মিশনে যোগ হয়েছে বিশেষ এক ‘হপিং প্রোব’ বা লাফিয়ে চলা রোবট।
পানি অণু বিশ্লেষণ যন্ত্রে সজ্জিত হপিং প্রোবটি ছোট থ্রাস্টার ইঞ্জিন ব্যবহার করে একেবারে গভীর ও অন্ধকার গহ্বরে উড়ে নামবে। ছয়টি বিশেষ যান্ত্রিক পায়ের সাহায্যে অবতরণ করে উপাত্ত সংগ্রহের পর তা আবার সূর্যালোকওয়ালা স্থানে লাফিয়ে ফিরে এসে সৌরশক্তিতে পুনরায় চার্জড হবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া বলেছে, রোবটটি পুরো মিশনে অন্তত তিনবার এভাবে লাফিয়ে এর মূল গবেষণা কাজ করবে।
মহাকাশে নতুন প্রতিযোগিতা
চাং’ই-৭ ও পরবর্তীতে ২০২৯ সালে পরিকল্পিত ‘চাং’ই-৮’ মিশন থেকে সংগৃহীত তথ্য ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে চীনা নভোচারীদের পা রাখার পথ সুগম করবে।
এর বিপরীতে, নাসার ‘আর্টেমিস’ প্রোগ্রামও দ্রুত এগোচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে আবার মানুষ পাঠানো এবং সেখানে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি গড়ে তোলা।
এপ্রিলে নাসার ‘আর্টেমিস টু’ মিশন চারজন নভোচারী নিয়ে ১০ দিনের সফল চন্দ্র পরিক্রমা সম্পন্ন করে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে।
এ অভিযানে মানুষের ইতিহাসে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে বেশি দূরত্বে বা ৪ লাখ ছয় হাজার ৭৭১ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন ওই চার নভোচারী।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন– এ দুই দেশের এ মুখোমুখি অবস্থানে মহাকাশে পানি ও আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা এখন আরও তীব্র হচ্ছে।