Published : 08 Sep 2026, 01:16 PM
নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে পৃথিবীর নিকটবর্তী ছায়াপথের এক রহস্যময় নিহারিকা, যার কেন্দ্রে রয়েছে বিশাল আকারের গহ্বর।
মহাকাশ গবেষকদের দীর্ঘদিনের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিল্কি ওয়ে ছায়াপথের নিকটবর্তী প্রতিবেশী ‘লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউড’ বা এলএমসি, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট স্পেস ডটকম।
সম্প্রতি নতুন এক পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির সুবাদে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এ এলএমসি ছায়াপথের এক নীহারিকার নিখুঁত ও চমৎকার ছবি ধারণ করেছে।
এ ছবির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হল ওই নীহারিকাটির ঠিক কেন্দ্রস্থলে রয়েছে এক বিশাল শূন্যতা বা গহ্বর, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘সুপারবাবল’।
হাবল টেলিস্কোপের তোলা এ ছবিতে দৃশ্যমান নীহারিকাটি এলএমসি’র ভেতরে অবস্থিত ‘এলএইচএ ১২০-এন৪৪’, যা সংক্ষেপে ‘এন৪৪’ নামে পরিচিত।
দক্ষিণ গোলার্ধের ডুরাডো তারামণ্ডলে অবস্থিত এ নীহারিকাটি অন্যান্য নীহারিকার মতোই এমন এক অঞ্চল রয়েছে, যেখানে দ্রুতগতিতে নতুন নতুন তারা জন্ম নিচ্ছে।
তবে এ নীহারিকার ধূলিময় ও পেঁচানো উপাদানের ঠিক মাঝখানে যে প্রকাণ্ড গহ্বরটি দেখা যাচ্ছে তা সত্যিই নজরে আসার মতো। এটাকেই বলা হচ্ছে ‘সুপারবাবল’ এবং এর বিশালতা কল্পনাতীত।
নাসার তথ্য অনুসারে, গহ্বরটি প্রায় ২১০ বাই ১৪০ আলোকবর্ষ চওড়া। মানুষের কল্পনার বাইরে এর আকার। কারণ সূর্য থেকে প্লুটোর দূরত্ব এক আলোকবর্ষেরও কম।
আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে এক আলোকবর্ষ বলা হয়, যা ৯৭ হাজার কোটি কিলোমিটারের সমান। মোটা দাগে প্রায় এক লাখ কোটি কিলোমিটার।
কেন তৈরি হয়েছে এই সুপারবাবল?
মহাকাশের এ বিশাল সুপারবাবল বা শূন্যতা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও কিছুটা রহস্যময়। তবে এর তৈরির পেছনে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ বুদ্বুদের কেন্দ্রে থাকা বড় আকৃতির তারাগুলো অতীতে কোনো এক সময় শক্তিশালী ‘সুপারনোভা বিস্ফোরণের’ মুখে পড়েছিল বা সেগুলো থেকে তীব্র নাক্ষত্রিক বাতাস নির্গত হয়েছিল। এ জোরালো বাতাস বা বিস্ফোরণ নীহারিকার ভেতরের গ্যাসগুলোকে আশপাশ থেকে দূরে সরিয়ে খালি একটি জায়গা তৈরি করেছে।
নাসার ভাষায়, এর ফলে চারদিকে গ্যাসীয় খোলসে ঘেরা বিশাল এক ‘ভয়েড’ বা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। দৃশ্যমান ছবিটিকে ব্যাখ্যার জন্য তত্ত্বটি বেশ গ্রহণযোগ্য হলেও এ মহাজাগতিক ঘটনার নিখুঁত ইতিহাস উন্মোচনে ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত গবেষণা চালাতে হবে।
এ সুপারবাবলের আশপাশ ঘিরে থাকা গ্যাসীয় খোলসটিতে তারা তৈরির প্রক্রিয়া এখনও থেমে নেই। জলরঙের ক্যানভাসে ছড়ানো এ মহাজাগতিক দৃশ্যের মধ্যে ছোট্ট আলোর বিন্দুর মতো জ্বলজ্বল করছে সেই নতুন জন্ম নেওয়া তারাগুলো।
এ ছবির আরেকটি দারুণ দিক হচ্ছে ‘এন৪৪’ নীহারিকাটি একটি ‘ইমিশন নেবুলা’ বা নিঃসরণ নীহারিকা হিসেবে পরিচিত, যার মানে ছবিতে দৃশ্যমান বিভিন্ন গ্যাস আশপাশের তারাগুলোর প্রভাবে শক্তি পেয়েছে, যা এ মহাজাগতিক চিত্রের উজ্জ্বলতা বহুগুণ বাড়িয়েছে।
এ প্রক্রিয়াটি ঘটে আয়নায়নের মাধ্যমে। সহজ করে বললে, শক্তির এ প্রক্রিয়ায় আয়নিত গ্যাস তৈরি হয়, যা একসময় ঠান্ডা হতে শুরু করে। ঠান্ডা হওয়ার এই পর্যায়ে গ্যাসগুলো উচ্চ শক্তির অবস্থা থেকে নিম্ন শক্তির অবস্থায় নেমে আসে। ফলে কিছু শক্তি বিকিরণ করে। শক্তির এ হ্রাসের কারণেই নীহারিকাটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ও চোখে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে।
বিজ্ঞানীদের হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এন৪৪ নিয়ে গবেষণার অন্যতম কারণ হল নীহারিকাটি তারার জন্ম ও বিবর্তন অধ্যয়নের জন্য অনুকূল পরিবেশ দেয়।
এ ক্লাস্টারের ভেতরে ও আশপাশে প্রায় পাঁচ লাখ তারা পর্যবেক্ষণ করেছে হাবল, যার মধ্যে ৩০ হাজার তারা রয়েছে এদের জীবনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে।
এন৪৪ দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হয়ে রয়েছে। যেমন, অতীতেও একাধিকবার খবরের শিরোনাম হয়েছে এ নীহারিকা, বিশেষ করে এটা ২০১২ ও ২০২১ সালে হাবল টেলিস্কোপের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবারও ধরা পড়েছিল।
এ ছাড়া, নাসার ‘চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি’র সাহায্যে করা পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ২০১১ সালে গবেষণা প্রকাশ পেয়েছিল, যেখানে নীহারিকা ও এর গহ্বর গঠনে ভূমিকা রাখা সুপারনোভা শকের ঢেউ ও অন্যান্য ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়।