Published : 03 Apr 2026, 12:08 PM
২০২৯ সালের মধ্যে এমন শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার আসতে পারে, যা বর্তমানের ব্যাংক বা সরকারি ডিভাইসের পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সহজেই ভেঙে ফেলবে বলে সতর্ক করেছে গুগল।
মার্কিন সার্চ জায়ান্টটি বলেছে, ২০২৯ সালের মধ্যে এমন সব ‘কোয়ান্টাম কম্পিউটার হ্যাকার’ তৈরি হতে পারে যারা বর্তমানের বেশিরভাগ এনক্রিপশন বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে পারবে। ফলে বিভিন্ন দেশের ব্যাংক, সরকার ও প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের এখনই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
এক ব্লগ পোস্টে গুগল বলেছে, এ দশক শেষ হওয়ার আগেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য ‘বিরাট হুমকি’ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যান্য কোম্পানিকেও তাদের মতো সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে গুগল।
অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন কোম্পানিটি বলেছে, “আপনার তথ্য গোপন ও সুরক্ষিত রাখার জন্য বর্তমানে যে এনক্রিপশন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বড় মাপের কোয়ান্টাম কম্পিউটার তা সহজেই ভেঙে ফেলতে পারবে।”
বর্তমানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রাথমিক স্তরের এক প্রযুক্তি, যা দ্রুত ও জটিল কাজ করতে পারে। এর যেমন ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে তেমনই একে সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে এখনও কিছু বড় বাধাও রয়েছে।
গুগল, মাইক্রোসফট এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি বর্তমানে এমন সব সিস্টেম তৈরিতে ব্যস্ত, যা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সূত্র ব্যবহার করে জটিল গাণিতিক হিসাব সমাধান করতে পারবে।
তবে এসব সিস্টেম তৈরি করা বর্তমানে বেশ কঠিন। যেমন, কোয়ান্টাম সিস্টেমকে ঠাণ্ডা রাখার জন্য অনেক পরিমাণে হিলিয়াম প্রয়োজন, যা তাপমাত্রা প্রায় পরম শূন্য বা অ্যাবসলিউট জিরোর কাছাকাছি নামিয়ে আনে। আবার অনেক ক্ষেত্রে লেজার রশ্মি সঠিকভাবে সাজাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যায়।
বর্তমানে যেসব সিস্টেম সচল আছে, সেগুলো আকারে অনেক ছোট। ফলে বিজ্ঞানী মহলে এগুলো নিয়ে যত উৎসাহ রয়েছে সেই পর্যায়ের বড় কোনো কাজের সক্ষমতা এগুলো এখনও পেতে পারেনি।
শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরিতে লাখ লাখ ‘স্টেবল কিউবিট’ বা কোয়ান্টাম বিট প্রয়োজন। তবে কোয়ান্টাম সিস্টেম খুবই নাজুক প্রকৃতির হওয়ায় এসব কিউবিটকে স্থিতিশীল রাখা হচ্ছে প্রযুক্তিগত এক বড় চ্যালেঞ্জ।
গুগল বলেছে, “অনলাইন নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সিগনেচারের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘অথেনটিকেশন সার্ভিস’। আমরা আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এসব পরিষেবাকে সবার আগে পোস্ট কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফিতে বা ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম আক্রমণ প্রতিরোধী ব্যবস্থায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারিং দলগুলোকেও একই পথ অনুসরণের পরামর্শ দিচ্ছি।”
কেমব্রিজভিত্তিক কোয়ান্টাম স্টার্টআপ ‘রিভারলেন’-এর সাবেক প্রধান পণ্য কর্মকর্তা লিওনি মুয়েক বলেছেন, গুগলের এ সতর্কবার্তার মানে এই নয় যে ২০২৯ সালের মধ্যেই এনক্রিপশন ভাঙার মতো কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিশ্চিতভাবে তৈরি হয়ে যাবে।
আসলে, এনক্রিপশন ভাঙতে পারে এমন শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির সম্ভাব্য সময়সীমা হিসেবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের কথা বলে থাকেন।
তবে মুয়েক বলেছেন, এ ঝুঁকি এখন এতটাই কাছাকাছি যে বিভিন্ন দেশের সরকার এরইমধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছে। কারণ আজকের এনক্রিপশন পদ্ধতিতে সুরক্ষিত বিভিন্ন তথ্য ভবিষ্যতে প্রযুক্তি উন্নত হলে ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
“আমরা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ হুমকি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে দেখছি।”
গত বছর যুক্তরাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বা এনসিএসসি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ২০৩৫ সালের মধ্যে কোয়ান্টাম হ্যাকারদের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিতে বলেছিল।
তবে গুগলের দেওয়া সময়সীমা অনুসারে, প্রযুক্তি খাতের ইঞ্জিনিয়ারিং দলগুলোকে এখনই সংবেদনশীল তথ্য রক্ষায় উন্নত এনক্রিপশন সিস্টেমে চলে আসা উচিত।
কারণ বর্তমানে ‘এখনই জমা করো, পরে ডিক্রিপ্ট করো’ নামের এক ধরনের সাইবার আক্রমণ শুরু হয়েছে। যার মানে, হ্যাকাররা এখন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করে জমিয়ে রাখছে, যাতে ভবিষ্যতে শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হলে তারা সেগুলো সহজেই আনলক বা ডিক্রিপ্ট করতে পারে।
মুয়েক বলেন, “১৯২০ সালের জাতীয় নিরাপত্তা নথি আজ হয়ত খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে ১০ বছর আগের নথিপত্র এখনও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও সেগুলো ভবিষ্যতে ভুল হাতে পড়া উচিত নয়।
“ফলে আজকের গোপন নথিগুলোকে এমনভাবে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন, যেন ১০ বছর পরের কোনো কোয়ান্টাম কম্পিউটারও সেগুলো খুলতে না পারে।”