Published : 25 Feb 2026, 02:17 PM
সুইডেনের বরফে ঢাকা প্রত্যন্ত উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে পর্তুগালের উপকূল, পুরো ইউরোপজুড়ে এখন মহাকাশ জয়ের নতুন লড়াই শুরু হয়েছে। একসময় মহাকাশ গবেষণা কেবল সরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখন সেখানে নাম লিখিয়েছে বড় বড় বাণিজ্যিক কোম্পানি।
বিবিসি লিখেছে, সুমেরু বৃত্তের নিকটবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা নতুন নতুন স্পেসপোর্ট বা মহাকাশ বন্দর এ প্রতিযোগিতায় যোগ করছে নতুন মাত্রা। একদিকে ইলন মাস্কের স্টারলিংক, অন্যদিকে অ্যামাজনের মতো জায়ান্টদের টক্কর, সব মিলিয়ে এখন রকেট উৎক্ষেপণের নতুন এক ‘রণক্ষেত্রে’ পরিণত হয়েছে উত্তরের আকাশ।
সুইডিশ ল্যাপল্যান্ডের বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়াটি সুমেরু বৃত্ত থেকেও প্রায় ২০০ কিলোমিটার ভেতরে। সেখানেই লাউডস্পিকারে তিন, দুই, এক কাউন্টডাউন শোনা যাচ্ছে।
সেই লঞ্চার থেকে একটি রকেট প্রচণ্ড বেগে আকাশের দিকে ছুটে গেল। আর সেই আলোতে নিচের অন্ধকার উপত্যকাটি মুহূর্তের জন্য ঝলমল করে উঠে। কয়েক সেকেন্ড পরেই দ্বিতীয় রকেট ইঞ্জিন বিকট শব্দে গর্জে উঠল।
কিরুনা শহরের কাছে অবস্থিত ‘এসরেঞ্জ স্পেস সেন্টার’টি পরিচালনা করে সুইডিশ স্পেস কর্পোরেশন। ১৯৬০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত এখান থেকে ৬০০টিরও বেশি রকেট উৎক্ষেপণ হয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই ছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা মহাকাশ অভিযানের পরীক্ষামূলক ফ্লাইটের জন্য ব্যবহৃত ‘সাব অরবিটাল’ রকেট।
জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টারের বিজ্ঞানীদের তৈরি রকেটটি ১৪ মিনিট উড্ডয়ন করেছিল, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ছাড়িয়ে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছে যায়। এ অভিযানের ব্যবস্থাপক টমাস ভোইটম্যানের চেহারায় সন্তুষ্টির ছাপ। বললেন, “উৎক্ষেপণ সফল হয়েছে, আমরা সত্যিই স্বস্তিতে আছি।”
এ রকেটের লক্ষ্য কয়েক মিনিটের জন্য মূল্যবান ‘মাইক্রো গ্র্যাভিটি’ বা ওজনহীনতা তৈরি করা। রকেটটি এমন কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বহন করছিল, যা গবেষকদের জৈবিক কোষ, বিভিন্ন পদার্থ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণায় সাহায্য করবে।
তবে, ইউরোপজুড়ে কক্ষপথে রকেট পাঠানোর যে প্রতিযোগিতা চলছে তাতে এখন শক্তিশালী এক নাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘এসরেঞ্জ স্পেস সেন্টার’।
সুইডিশ স্পেস কর্পোরেশনের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মাতিয়াস এব্রামসন বলেছেন, “আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এখান থেকে আমাদের প্রথম স্যাটেলাইট মহাকাশে যাবে।”
এখানকার নতুন লঞ্চপ্যাডটি ২০২৩ সালের শুরুতে উদ্বোধন হয়েছিল। তবে কিছু কারণে এর কাজে দেরি হয়েছে। বর্তমানে নর্থ সুইডেন থেকে কক্ষপথে স্যাটেলাইট পাঠানোর জন্য দুটি কোম্পানি তাদের রকেট প্রস্তুত করছে। একটি দক্ষিণ কোরিয়ার ‘পেরিজি’ এবং আরেকটি আমেরিকার কোম্পানি ‘ফায়ারফ্লাই’। গত বছর চাঁদে অবতরণ করেছে মার্কিন কোম্পানিটি।
‘এসরেঞ্জ স্পেস সেন্টার’-এর অরবিটাল লঞ্চ ও রকেট টেস্ট বিভাগের ক্যাটারিনা লাহিটি বলেছেন, “আমরা এখন ফায়ারফ্লাইয়ের আলফা রকেটের জন্য বিশেষ কিছু অবকাঠামো তৈরি করছি।” যার মধ্যে রকেটে জ্বালানি ভরা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিভিন্ন উন্নত ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
লাহিটি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সুইডেনের মধ্যে এক প্রযুক্তি সুরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে, যা এ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটিতে বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানির উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তি পাঠানোর পথ খুলে দিয়েছে। বিষয়টিকে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন তিনি।
এরইমধ্যে ইউরোপের প্রথম পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট ‘থেমিস’-এর ভূমিতে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এখন ‘এসরেঞ্জ স্পেস সেন্টার’-এ চলছে। সেই সঙ্গে জার্মান স্টার্টআপ ‘ইসার অ্যারোস্পেস’-এর ইঞ্জিনের পরীক্ষাও এখানে করা হচ্ছে।
ইন্টারনেট সংযোগ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ম্যাপিং বা মানচিত্র তৈরির ক্রমাগত চাহিদার কারণে পৃথিবীর কক্ষপথে স্যাটেলাইটের সংখ্যা এখন আকাশচুম্বী।
বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০৩০-এর দশকের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ৫ লাখে পৌঁছাতে পারে।
বেশ কিছু বিশাল অ্যান্টেনার সামনে দাঁড়িয়ে এব্রামসন বলেছেন, “বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার স্যাটেলাইট কক্ষপথে ঘুরছে। পরিকল্পনা রয়েছে কেবল কয়েক বছরের মধ্যে এই সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ হাজারে নিয়ে যাওয়া।”
আর এই বিশাল চাহিদাই বাণিজ্যিক বিভিন্ন কোম্পানিকে এমন এক খাতে টেনে আনছে, যা একসময় কেবল সরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
এ বিষয়টিই পর্তুগালের অ্যাজোরস থেকে শুরু করে নরওয়ের সুদূর উত্তর পর্যন্ত ইউরোপজুড়ে বেশ কিছু ‘স্পেসপোর্ট’ বা মহাকাশ বন্দর তৈরির প্রকল্পকে ত্বরান্বিত করেছে।
লাহিটি বলেছেন, “এ বাজার বিশাল এবং সবার জন্যই এখানে সুযোগ রয়েছে।”
‘এসরেঞ্জ স্পেস সেন্টার’-এর ৬০ বছরের রকেট উৎক্ষেপণের অভিজ্ঞতা এবং মেরু কক্ষপথে স্যাটেলাইট পাঠানোর জন্য অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থিতিশীল আবহাওয়া তাদের এই ব্যবসায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখবে।
অন্যান্য জায়গার মধ্যে ‘আটলান্টিক স্পেসপোর্ট কনসোর্টিয়াম’ বা এসিএস পর্তুগালের সান্তা মারিয়া দ্বীপে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, স্টার্টআপ কোম্পানি ‘ইউরোস্পেসপোর্ট’ ডেনমার্কের উপকূল থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে উত্তর সাগরে নোঙর করা এক জাহাজ থেকে রকেট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে।
স্কটল্যান্ডের শেটল্যান্ড দ্বীপে অবস্থিত ‘সাকসাভোর্ড’ হচ্ছে যুক্তরাজ্যের প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত ভার্টিক্যাল বা খাড়াভাবে রকেট উৎক্ষেপণের কেন্দ্র। জার্মানির রকেট কারখানা ‘অগসবার্গ’ ও ‘হাইইমপালস’-এর মতো বেশ কিছু কোম্পানির সঙ্গে তারা কাজ করছে।
তবে, কিছু প্রতিযোগীর আকাশচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষা এরইমধ্যে বাস্তবতার কঠোর আঘাতে মাটিতে আছড়ে পড়েছে বা ব্যর্থ হয়েছে।
স্যার রিচার্ড ব্র্যানসনের ‘ভার্জিন অরবিট’ দক্ষিণ ইংল্যান্ডের কর্নওয়াল থেকে ২০২৩ সালের এক ব্যর্থ অভিযানের পর বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, স্কটিশ রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অরবেক্স’, যারা সাকসাভোর্ড থেকে স্বল্পমূল্যের রকেট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেছিল তারা গত সপ্তাহে বলেছে, দেউলিয়া হওয়ার পথে ও প্রশাসক নিয়োগ করছে কোম্পানিটি।
‘ইউরোপিয়ান স্পেস পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক হারমান লুডভিগ মোয়েলার বলেছেন, “বিভিন্ন মহাকাশ বন্দর অনেকটা সমুদ্রবন্দরের মতোই হবে। যানচলাচলের বিশাল চাপের কথা মাথায় রেখে যেমন একাধিক বন্দরের প্রয়োজন হবে তেমনই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবেও এগুলোর গুরুত্ব রয়েছে।
“এখানে কেউ জিতবে আবার কেউ হারবে। এ কেবল রকেট প্রযুক্তির বিষয় নয়, বরং বিষয়টি আসলে বাজারের লড়াই। এমন দুই বা তিনটি স্পেসপোর্ট সফল হবে।”
মোয়েলার বলেছেন, এ বছরের মধ্যেই ইউরোপ মহাদেশ থেকে একটি সফল অরবিটাল উৎক্ষেপণ দেখার আশা করছেন তিনি।
বর্তমানে এই প্রতিযোগিতায় সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে সুমেরু বৃত্তের ৩০০ কিলোমিটার উত্তরে এক প্রত্যন্ত দ্বীপে অবস্থিত নরওয়ের ‘আনডোয়া স্পেসপোর্ট’।
গত বছর সেখান থেকে তাদের ২৮ মিটার লম্বা ‘স্পেকট্রাম’ রকেটটি উৎক্ষেপণ করেছিল জার্মান কোম্পানি ‘ইসার অ্যারোস্পেস’। তবে উৎক্ষেপণের কেবল ৩০ সেকেন্ড পরেই তা নাটকীয়ভাবে নরওয়েজিয়ান সাগরে আছড়ে পড়ে।
মিউনিখভিত্তিক এ কোম্পানিটি এখন এ বছরের মার্চে আবারও চেষ্টার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ উৎক্ষেপণ সফল হলে তা ইউরোপের বাণিজ্যিক মহাকাশ অভিযানের জন্য বড় পদক্ষেপ হবে।
বিশ্বের পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ইউরোপীয় নেতাদের মহাকাশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এখন অনেক বেশি জরুরি ভিত্তিতে এই খাতে নিজেদের স্বনির্ভরতা বা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে তারা।
‘এসরেঞ্জ স্পেস সেন্টার’-এর এব্রামসন বলেছেন, ইউরোপের নিজস্ব উপকূলে কক্ষপথে রকেট পাঠানোর সক্ষমতা থাকাটা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে “ইউরোপের নিজস্ব শক্তিতে এগুলো করার সক্ষমতা থাকা আমাদের প্রয়োজন।”
লাহিটি আরও বলেছেন, বিষয়টি “কোনো সংকট বা হুমকির মুখে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা মোতায়েন বা পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে, যা ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকেও আরও শক্তিশালী করে তুলবে।”
নিষেধাজ্ঞা ও ইউক্রেইন আক্রমণের কারণে গত এক দশক ধরে কাজাখস্তানে অবস্থিত রাশিয়ার ‘বাইকোনুর কসমোড্রোম’ ব্যবহার করছে না ইউরোপীয় বিভিন্ন মিশন।
ফ্রেঞ্চ গায়ানার কৌরোতে অবস্থিত ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি বা ইএসএ-এর কেন্দ্রটি বছরে প্রায় এক ডজন রকেট উৎক্ষেপণ সামলাতে পারে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও নির্ভরশীল ইএসএ, যাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র রয়েছে। যেমন নাসার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে শুরু করে ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্সের স্টারবেইস।
দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বিষুবরেখার কাছে কৌরোর অবস্থান রকেট উৎক্ষেপণের জন্য বেশ কিছু বাড়তি সুবিধা দেয়। তবে ইউরোপে তৈরি বিভিন্ন রকেটকে সেখানে পাঠাতে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় এবং সেখানে গিয়ে আবার সেগুলো জোড়া দিতে হয়, যা যাতায়াত ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।
এ মাসের শুরুতে সেখান থেকেই উৎক্ষেপিত হয়েছে ইউরোপের এযাবতকালের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট ‘আরিয়ান ৬’, যা অ্যামাজনের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ‘লিও’-এর জন্য বেশ কিছু স্যাটেলাইট বহন করছিল। মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন ইকমার্স জায়ান্টটি।
২০২৫ সালে গোটা বিশ্বে সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া ৩১৯টি অরবিটাল উৎক্ষেপণের মধ্যে ইউরোপের কৌরো থেকে হয়েছে কেবল ৭টি। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৮৯টি ও চীন থেকে উৎক্ষেপিত হয়েছে ৯০টি।
মোয়েলার বলেছেন, ইউরোপের কাছে প্রয়োজনীয় ‘কৌশল’ এবং ‘প্রকৌশলগত দক্ষতা’ উভয়ই আছে। তবে মহাকাশ খাতে বিনিয়োগ আগের চেয়ে অনেক বাড়লেও তা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ের তুলনায় খুবই সামান্য। ফলে ইউরোপ এখনও অন্যদের ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।