Published : 18 Apr 2026, 01:41 PM
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডলফ হিটলার আমেরিকায় বোমা ফেলার স্বপ্ন দেখলেও তৎকালীন প্রযুক্তিতে তা করা ছিল একেবারেই অসম্ভব। বর্তমানে মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরার সুবিধার কারণে আন্তঃমহাদেশীয় বিভিন্ন ফ্লাইট সহজ হয়েছে।
আধুনিক যুদ্ধবিমানের লড়াইয়ে জ্বালানি রিফুয়েলিং সাধারণ বিষয় হলেও রাশিয়ার ফাইটার জেট এসইউ-৩৪ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। কোনো বিরতি ছাড়াই মস্কো থেকে সরাসরি ওয়াশিংটন ডি.সি. পর্যন্ত পাড়ি দেওয়ার বিস্ময়কর সক্ষমতা রয়েছে এ শক্তিশালী জেটের।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট স্ল্যাশগিয়ার প্রতিবেদনে লিখেছে, মার্কিন বিমানবাহিনীর বেশিরভাগ প্লেন এভাবে কাজ করলেও রাশিয়ান ফেডারেশনের ‘এসইউ-৩৪’ জেটটি একদমই আলাদা।
কারণ, ফুলব্যাক কোনো বিরতি বা জ্বালানি রিফুয়েলিং ছাড়াই মস্কো থেকে ওয়াশিংটন ডি.সি. পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে এই জেট। কোনো জেটের ৪ হাজার ৮৬৭ মাইলের এই বিশাল দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার সক্ষমতা সত্যিই রোমাঞ্চকর।
রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধে ব্যবহৃত রাশিয়ার এ ‘এসইউ-৩৪’ জেটটি কেন এত দূরে উড়তে পারে এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে।
প্রথমত, প্লেনটি আকারে বড়, যার দৈর্ঘ্য ৭৬.৫ ফুট ও ডানার বিস্তার ৪৮ ফুট। সাধারণ অভিযানে জেটটিকে এত দূর যেতে হয় না। তবে প্রয়োজনে প্লেনটি নিজের ‘হার্ড পয়েন্টে’ বা যেখানে সাধারণত অস্ত্র রাখা হয় সেখানে তিনটি ‘পিটিবি-৩০০০’ বাহ্যিক জ্বালানি ট্যাংক যোগ করতে পারে, যা এর পাল্লা বা রেঞ্জ অনেক বাড়িয়ে দেয়।
এসব ট্যাংকের প্রতিটিতে ৭৯৩ গ্যালন জ্বালানি ধরে, যা বোমারু প্লেনটির ভেতরের জ্বালানি সক্ষমতার সঙ্গে বাড়তি হিসেবে যোগ হয়।
জ্বালানির এই বড় সক্ষমতার কারণে ‘এসইউ-৩৪’ বিরতিহীনভাবে ২ হাজার ৪৮৫ মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে। তবে যখন এতে বাইরের বিভিন্ন বাড়তি জ্বালানি ট্যাংক যোগ ও এর সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করা হয় তখন এর পাল্লা বা রেঞ্জ ৪ হাজার ৯৭১ মাইল ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এ সক্ষমতা প্লেনটিকে ওয়াশিংটন ডি.সি.তে আঘাত হানার সুযোগ করে দিলেও জ্বালানি না ভরে তা আর নিজ দেশে ফিরে আসতে পারবে না। রাশিয়া সম্ভবত কখনোই নিজেদের ‘এসইউ-৩৪’ বহরকে এভাবে ব্যবহার করবে না।
তবে, এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে এমন বিভিন্ন ফাইটার জেটের মধ্যে ‘এসইউ-৩৪’ অন্যতম শক্তিশালী এক প্লেন।
বর্তমানে বিশ্বের দীর্ঘতম পাল্লার ফাইটার জেট
বাড়তি ড্রপ ট্যাংক ব্যবহারের মাধ্যমে ‘এসইউ-৩৪’ বর্তমানে বিশ্বের দীর্ঘতম পাল্লার ফাইটার জেটে পরিণত হয়েছে এবং এর ধারেকাছেও কেউ নেই।
তুলনামূলকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘ পাল্লার ফাইটার জেট ‘এফ-৩৫সি লাইটনিং টু’, যার নিজস্ব জ্বালানি ধারণসক্ষমতা ৩ হাজার ২ গ্যালন, যেটি বিরতিহীনভাবে ১ হাজার ৩৮১ মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে।
বর্তমানে ‘এফ-৩৫’-এ কোনো ড্রপ ট্যাংক নেই। তবে ‘ব্লক ৪’ আপগ্রেডের অংশ হিসেবে এর নকশা করা হচ্ছে, যা ২০৩১ সালের আগে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অবশ্য, আকাশে জ্বালানি ভরার মাধ্যমে ‘এফ-৩৫’-এর পাল্লা অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
এরপরও রাশিয়ার ‘এসইউ-৩৪’-এর তুলনায় বিষয়টি বেশ ম্লান। এ ছাড়া, ‘এসইউ-৩৪’-এ খুব শিগগিরই ‘এএল-৫২এফ’ ইঞ্জিন যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট ‘এসইউ-৫৭’-এর জন্য তৈরি হয়েছে।
নানা ধরনের আধুনিকায়নের কারণে ‘এসইউ-৩৪’ বর্তমানে ৪.৫ প্রজন্ম বা কখনও কখনও ৪++ প্রজন্মেরও ফাইটার জেট হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে যদি আরও বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী ইঞ্জিনের ব্যবহার হয় তবে এ প্লেনের পাল্লা বা রেঞ্জ আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা একে সত্যিকার অর্থেই এক আন্তঃমহাদেশীয় কৌশলগত জেটে পরিণত করবে।
১৯৯০ সালে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার অস্ত্রভাণ্ডারে যোগ হয় ‘এসইউ-৩৪’ এবং এর কর্মসক্ষমতা এরইমধ্যে প্রমাণিত। রাশিয়ার কাছে বর্তমানে ঠিক কতগুলো এ জেট রয়েছে তা নিশ্চিত না হলেও, ধারণা করা হয় সংখ্যাটি ১২৩টির কাছাকাছি হবে।
ইউক্রেইন যুদ্ধে বেশ কয়েকটি প্লেন ধ্বংস হলেও এর উৎপাদন এখনও অব্যাহত আছে। ফলে এ সংখ্যাটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে।
তবে, রাশিয়া তাদের কৌশলগত পরিকল্পনায় ‘এসইউ-৩৪’কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা ঠিক পরিষ্কার নয়। দেশটি নিকট ভবিষ্যতে তাদের এ আন্তঃমহাদেশীয় ফাইটার জেটের উৎপাদন সম্ভবত চালিয়ে যাবে।