গভীর সমুদ্রের রহস্য উন্মোচন করবে নতুন এই ড্রোন বহর
ড্রোন বহরটি ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বের সমুদ্র আয়তনের ৯৮ শতাংশেরও বেশি এলাকার গভীরে যেতে পারবে।
পৃথিবীর ৭০ শতাংশেরও বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে মহাসাগর, যার বড় অংশ এখনও মানুষের অজানা ও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ রহস্যময় অংশটুকু সম্পর্কে সঠিক তথ্য না থাকা এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে শিগগিরই ঘাটতি পূরণে এগিয়ে আসছে স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার ড্রোন বা ফ্লোট। ড্রোনের এমন বহর ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক এলাকার ৯৮ শতাংশেরও বেশি কভার করতে প্রস্তুত বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
সমুদ্রের নতুন গভীরে অভিযান
বর্তমানে সমুদ্রের বেশিরভাগ ডেটা আসে ‘আর্গো প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে। ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া এ আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ হাজার ডেটা-সংগ্রহকারী ফ্লোট বা ভাসমান যন্ত্র মোতায়েন হয়েছে।
আর্গো ড্রোনের বেশিরভাগই সমুদ্রের ২ থেকে ৪ কিলোমিটার গভীরে নামে। তবে সমুদ্রের তাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে ১০ শতাংশই ঘটে এ গভীরতার নিচে, যা ডেটা সংগ্রহের ক্ষেত্রে বড় ফারাক তৈরি করেছে।
এ বছর ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় মহাসাগর গবেষণা সংস্থা ‘ইফরেমার’ বলেছে, তাদের তৈরি দুটি ‘ডিপ-৬০০০’ প্রোটোটাইপ এ বছরের ১১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রায় ছয় কিলোমিটার গভীরতায় পাঁচটি সফল ডুব দিয়েছে ও ‘অ্যাবিসাল জোন’ বা গভীর সমুদ্রের অতল তলদেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সংগ্রহ করেছে।
এ সফল মিশনের মাধ্যমে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে ফ্রান্স এমন আর্গো ফ্লোট তৈরি করল, যা এই গভীরতায় পৌঁছাতে পারে।
ইফরেমার বলেছে, ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ৩০টি গভীর সমুদ্রের ফ্লোট আর্গো-পরিচালিত ৪ হাজার ডিভাইসের আন্তর্জাতিক বহরের সঙ্গে যোগ হবে। ফলে গবেষকরা সমুদ্রের ৯৮ শতাংশেরও বেশি এলাকা অন্বেষণ করতে পারবেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র একশটিরও বেশি ও চীন ৩০টিরও বেশি ডিপ-সি বা গভীর সমুদ্রের ড্রোনওয়ালা বহর পরিচালনা করছে।
সমুদ্রের গভীরে ড্রোন অভিযান যেভাবে পরিচালিত হয়
সমুদ্রের প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি এলাকা ‘ডিপ ওশান’ বা গভীর সমুদ্র হিসেবে বিবেচিত, যার গভীরতা ৬৫৬ ফুট বা তার বেশি। অথচ পুরো সমুদ্রের কেবল পাঁচ শতাংশ এলাকা এখনও পর্যন্ত মানুষের দেখার সুযোগ হয়েছে।
গভীর সমুদ্র বা অ্যাবিসাল জোন নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণার অভাবের মূল কারণ হচ্ছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা।
এ গভীরতায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ওপর বিপুল পরিমাণ চাপ পড়ে, যেখানে প্রতি ১০ মিটার গভীরতার জন্য প্রায় এক বায়ুমণ্ডলীয় চাপ প্রয়োজন হয়। যার মানে, ৬ হাজার মিটার গভীরে পানির চাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় ৬০০ গুণ।
‘ইফরেমার’-এর প্রোফাইলার প্রযুক্তি উন্নয়ন বিভাগের প্রধান জেভিয়ের আন্দ্রে বলেছেন, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এমন সিস্টেম ডিজাইন করা, যা গভীর সমুদ্রের তীব্র চাপ সহ্য করতে, সাত বছর ধরে অপারেশনের জন্য শক্তি বা শক্তির দিক থেকে স্বয়ংক্রিয় হতে ও খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।”
প্রচণ্ড এ চাপ ঠেকানোর জন্য ইফরেমার তাদের ‘ডিপ-৬০০০’ প্রোটোটাইপের বডি বা খোলস খাঁটি টাইটানিয়ামের বদলে অন্যান্য কম্পোজিট বা সংকর উপাদান দিয়ে তৈরি করেছে।
৮৮ পাউন্ড ওজনের বিভিন্ন ডিভাইস সাধারণ এক আর্গো ফ্লোটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ভারী, যা তীব্র চাপ আরও ভালোভাবে সহ্য করতে সাহায্য করে।
এ আর্গো ডিভাইসের ফ্লোট মিশন দশ দিনের চক্রে পরিচালিত হয়, যেখানে নৌকা থেকে ফ্লোটটি সাগরে নামিয়ে দেওয়া হয়, এরপর তা নির্দিষ্ট এক ‘ড্রিফট’ বা ভাসমান গভীরতায় নেমে সেখানে নয় দিন অবস্থান করে।
পরবর্তীতে সমুদ্রের আরও গভীরতায় নেমে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় কাটায়। এরপর ফ্লোটটি আবার পানির ওপরে ভেসে ওঠে ও সংগ্রহ করা ডেটা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাঠায়।
ব্যাটারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে, সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছরে প্রায় ১৫০টি সাইকেল সম্পন্ন করে এই ড্রোন বহর।
ড্রোনগুলো কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে?
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানি যেভাবে উষ্ণ হয়ে উঠছে এর আচরণ বিজ্ঞানীরা যেন আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন সেজন্য এসব ড্রোন পানির লবণাক্ততা, তাপমাত্রা, অক্সিজেন ও চাপের মতো বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে।
মৌসুমী বায়ু, সমুদ্রের উষ্ণতা বেড়ে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও সমুদ্রের স্রোত বা জলস্রোতের মতো বড় বড় জলবায়ু সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনার পূর্বাভাস উন্নত করতে আর্গো ডেটা ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বজুড়ে থাকা ৪ হাজার ফ্লোট প্রতি বছর তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার এক লাখের বেশি প্রোফাইল তৈরি করে এবং সব আর্গো ডেটা অনলাইনে সবার জন্য উন্মুক্ত ও বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
ইফরেমারের ভৌত সমুদ্রবিজ্ঞানী ভার্জিনি থিয়েরি বলেছেন, নতুন ‘ডিপ-৬০০০’ ড্রোন বহর ফরাসি সংস্থাকে একেবারে গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত সমুদ্রের উষ্ণতা ট্র্যাক করতে সহায়তা করবে।
“আমরা গভীর সমুদ্রের সমুদ্রস্রোত সম্পর্কেও তথ্য পেতে পারব, যা গভীর সমুদ্রে তাপ ও কার্বনের মতো জলবায়ু সংকেত জমা রাখতে সাহায্য এবং সমুদ্রের বিভিন্ন পূর্বাভাস মডেলকে আরও নিখুঁত করে তুলছে।
“আর্গো সত্যিকার অর্থে অসাধারণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অনন্য উদাহরণ, যার সঙ্গে ৬০টিরও বেশি দেশ যুক্ত রয়েছে।”
