Published : 11 Jun 2025, 04:34 PM
বাস্তব জগতের মতোই মেটাভার্সেও নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভার্চুয়াল এই নতুন জগতে নারীদের প্রতি যৌন সহিংসতা এতটাই সাধারণ যে, ব্যবহারকারীদের অনেকেই একে ‘নিয়মিত ঘটনা’ হিসেবেই বিবেচনা করেন।
এমনই চিত্র উঠে এসেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
ব্রিটিশ লেখিকা ও গবেষক লরা বেটস জানাচ্ছেন, মেটাভার্সে প্রবেশ করার মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই তিনি দেখেছেন, একজন নারী ব্যবহারকারীর অ্যাভাটার যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। ওই নারী বলেন, ‘সে এসে আমার পেছনে হাত দিয়েছে।’ আশপাশে থাকা আরও কয়েকজন নারী বলেন, ‘এটাতো নিত্যদিনের ঘটনা।’
মেটার নির্মিত এই ভার্চুয়াল জগতে থ্রিডি অডিও, হ্যাপটিক ফিডব্যাক এবং মোশন ট্র্যাকিংয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতাকে বাস্তবের মতো করে তোলে। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা যখন হয়রানির হয়, তখন তা আরও ভয়াবহভাবে প্রভাব ফেলে মানসিকভাবে।
লরা বেটস মেটাভার্সে থাকা অবস্থায় একটি বোর্ডে লেখেন, “আপনি কি মেটাভার্সে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন?” তাৎক্ষণিকভাবে “হ্যাঁ, অনেকবার”, “সবাই তো হয়রানির শিকার হয় এখানে”, বলেন একাধিক নারী।
শিশুদের দিকেও যাচ্ছে অত্যাচারের হাত
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মেটাভার্সে উদ্বেগজনকভাবে অল্পবয়সী কিশোরীদের অ্যাভাটারকে লক্ষ্য করে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে নিয়মিত যৌন টিটকারি ও অশোভন আচরণের শিকার হতে দেখা গেছে। এক ভার্চুয়াল ক্লাবে এমন শিশুরা মঞ্চে গান করছিল, যাদের কণ্ঠ শুনে লেখিকার ধারণা, তারা নয় বা দশ বছর বয়সী। অথচ তাদের দিকে মন্তব্য ছুড়ছিলেন স্পষ্টতই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা।
২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন প্রকাশনা টেকক্রাঞ্চ এর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মেটার ভার্চুয়াল জগতে মানুষজনকে সুরক্ষা দিতে যেসব মডারেটর রয়েছেন, তারা হয়রানির ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন না। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “গত রাতে একজন আমাকে গোপনাঙ্গ স্পর্শ করেছে। আর আশপাশে থাকা অন্যান্যরা তাতে উৎসাহ দিয়েছে।”
এর জবাবে মেটার এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, ব্যবহারকারী যদি সেইফটি টুল ব্যবহার করতেন, তাহলে হয়তো এমনটা হতো না। ভুক্তভোগীর দায়েই পুরো ঘটনার দায়ভার চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতাই মেটার সমস্যার গভীরতা প্রকাশ করে।
যুক্তরাজ্যের পুলিশ ২০২৪ সালে ১৬ বছরের কম বয়সী এক কিশোরীর ভার্চুয়াল দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা তদন্তে উঠে এসেছে, মেয়েটির ওপর ওই ঘটনার মানসিক প্রভাব বাস্তব ধর্ষণের ট্রমার মতোই ছিল।
কাউন্টারিং ডিজিটাল হেইট (সিসিডিএইচ) এর গবেষণায় দেখা গেছে, মেটাভার্সে গড়ে প্রতি সাত মিনিটে একজন ব্যবহারকারী কোনো না কোনো ভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। সাড়ে ১১ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে ১০০টি সম্ভাব্য নিয়মভঙ্গের ঘটনা শনাক্ত হলেও, মেটা কোনো প্রতিবেদনেই সাড়া দেয়নি।
এনএসপিসিসি এর মতে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অনলাইন গ্রুমিংয়ের ৪৭ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে মেটার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম যেমন ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপে।
লরা বেটস প্রশ্ন রাখেন যদি আজকের ভার্চুয়াল জগতে মেয়েরা নিরাপদ না হন, তাহলে ভবিষ্যতের অফিস, ক্লাসরুম কিংবা স্বাস্থ্যসেবার ভার্চুয়াল সংস্করণেও তারা কি একইরকম হয়রানির শিকার হবেন? তাহলে তো মেটাভার্সের সঙ্গে সঙ্গে জেন্ডার বৈষম্যও ডিজিটালি স্থায়ী রূপ পাচ্ছে।
এদিকে এ বিষয়ে মেটার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও জবাব মেলেনি।