Published : 29 Jun 2026, 09:03 AM
ব্রাজিল-জাপান যখন হিউস্টনে মুখোমুখি হবে, তখন ফুটবলপ্রেমীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবেন। গলা ফাটাবেন নিজের দলের পক্ষে। কিন্তু আলেক্স সান্তোস কী করবেন? তার নামটা বলে দিচ্ছে, তিনি ব্রাজিলিয়ান। সত্যিই তাই। কিন্তু তিনি যে গায়ে তুলেছিলেন জাপানের জার্সি! উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় ওঠার লড়াইয়ে দুই দল যখন মাঠে নামবে, জাতীয় সঙ্গীত যখন বেজে উঠবে, অদ্ভূত এক টানাপোড়েনের স্রোত বয়ে চলবে সান্তোসের মনের গহীনে।
১৬ বছর বয়সে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত থেকেই মূলত এই দোলাচলের শুরু। জন্ম, বেড়ে ওঠা ব্রাজিলের পারানার মারিঙ্গাতে। কিন্তু তিনি পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমান জাপানে। সেখানে গিয়ে স্থানীয় স্কুলে পড়ার এবং খেলার সুযোগও পান। দেশটিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যোগ দেন শিমিজু এস-পালস দলে। এক পর্যায়ে জাপানের নাগরিকত্বও নিয়ে ‘জাপানি’ বনে যান সান্তোস। ২০০২ বিশ্বকাপও তিনি এশিয়ার দলটির হয়ে খেলে ফেলেন!
“পড়ার জন্য ১৬ বছর বয়সে জাপানে আসি। অন্য খেলোয়াড়দের চেয়ে আমার চলার পথটা ছিল ভিন্ন। যথা সময়ে স্কুল পর্ব শেষ করলাম। জাপানি ভাষা বলতে এবং জাপানি সংস্কৃতি বুঝতে পারতাম। সিদ্ধান্ত নিলাম নাগরিকত্বের আবেদন করার।”
“এটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছিল এবং দেড় বছর লেগেছিল, ২০০১ সালে নাগরিকত্ব পেলাম। ব্রাজিলের বেলায়ও একইরকম হয়েছিল; ওদেরও কিছু খেলোয়াড় দলের সাথে শেষ দিকে যোগ দিয়েছিল।”
২০০৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অদ্ভূত এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন সান্তোস। একই গ্রুপে ছিল ব্রাজিল ও জাপান। গ্রুপের শেষ ম্যাচে দেখা হয়েছিল দুই দলের। যখন জাতীয় সঙ্গীত বেজে উঠল, তখন কেমন লাগছিল তার? ২০ বছর আগের সেই স্মৃতি নিয়ে ফিফার সাথে আলাপচারিতায় সান্তোস তুলে ধরলেন সেসময়ের অনুভূতি।
“স্কুলে থাকতে আমি জাপানি জাতীয় সঙ্গীত গাইতে এবং এর অর্থকে সম্মান করতে শিখেছিলাম। জাপানের প্রতিনিধিত্ব করার জন্যই দেশটির নাগরিকত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং তাদের জন্য আমরা সবটুকু দিয়ে লড়তে প্রস্তুত ছিলাম।”

“কিন্তু যখন আমি ব্রাজিলের জাতীয় সঙ্গীত শুনলাম, তখন অদ্ভূত এক অনূভূতি হয়েছিল। বিষয়টা এমন, যেন বাবা-মা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং তাদের মধ্যে কাকে বেশি ভালোবাসি, বেছে নিতে হবে। যেটা কখনই সম্ভব নয়।”
ডর্টমুন্ডে নামা সেসময়ের ব্রাজিল দল এককথায় তারকা ঠাসা। রোনালদো, রোনালদিনিয়ো, আদ্রিয়ানো, কাকা-কে ছিল না সেই দলে। ৪-১ গোলে হেরেছিল সান্তোসের জাপান। ছিটকে গিয়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকে। তবে, হারলেও প্রথম গোলটি দিয়েছিল জাপানই। সেই ম্যাচ সান্তোসের স্মৃতিতে আজও অমলিন।
“রোনালিদিনিয়ো, রোনালদোর মতো খেলোয়াড়দের আমি টেলিভিশনে দেখতাম। আমরা আসলেই কতটা ভালো দল, সেটা যাচাইয়ের একটা সুযোগ ছিল সেই ম্যাচ। কেননা, আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম বিশ্বের সেরা দলটির বিপক্ষে।”
“আমরা জানতাম, তাদের একটু নিস্ক্রিয় করতে হলেও আমাদের অবিশ্বাস্য পরিশ্রম করতে হবে। ম্যান টু ম্যান মার্কিংয়ের চেয়ে আমরা জোনাল মার্কিং করেছিলাম। কেননা, আমরা জানতাম, তাদের যে কেউ, একটা মুভেই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে সক্ষম।”
ওই ম্যাচে জাপানের ডাগআউটে ছিলেন আরেক ব্রাজিলিয়ান জিকো, বিশ্ব ফুটবলে যিনি পরিচিত ‘সাদা পেলে’ নামে। এশিয়ার দেশটিতে জিকো ছিলেন অনন্য এক উদাহরণ। ফ্ল্যামেঙ্গোর এই কিংবদন্তিকে জাপানে ফুটবলের জনপ্রিয়তা তৈরির নেপথ্যের কারিগর বিবেচনা করা হয়। জিকোর ছোঁয়ায় জাপানের ফুটবলের কৌশল বদলে যাওয়ার গল্পটাও শোনালেন সান্তোস।
“জিকো আমাদের ফুটবলে স্রেফ রক্ষণাত্মক খেলার বাইরে, সৃষ্টিশীলতা নিয়ে এসেছিলেন। আমরা জয়ের চেষ্টা করতাম, প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইতাম। আক্রমণাত্মক খেয়ে এবং যেকোনো উপায়ে জিততে চাইতাম আমরা।”
“এখনকার দিনে, জাপানকে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দৃঢ়তার সাথে রক্ষণ সামলাতে দেখছেন। গতি ও মুভমেন্ট প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে, আক্রমণে সত্যিকারের হুমকি তৈরি করা-জিকোর জামানা থেকে এই ঘরানার ফুটবলই খেলছে জাপান।”
লম্বা বিরতির পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফের মুখোমুখি দুই দল। এবারের মঞ্চ অবশ্য সেরা বত্রিশে। সান্তোসের মনে হচ্ছে, দুই দলই সাবধানী ফুটবল খেলতে পারে।
“দুই দলকে চেনার সুবাদে আমার মনে হচ্ছে, জাপান দ্রুত গতির এবং পাল্টা আক্রমণনির্ভর ফুটবল খেলতে চাইবে, আর ব্রাজিল চাইবে প্রতিপক্ষের কৌশলকে ভেস্তে দিতে। আমি মনে করি না, জাপানের বিপক্ষে অনেক উপরে উঠে চাপ দিবে ব্রাজিল। জাপানও তেড়েফুঁড়ে আক্রমণে যাবে না। কেননা, তারাও জানে, ভিনিসিউস, হায়ান এবং সামর্থ্যবান অন্যরাও আছে ব্রাজিল দলে, যারা খুবই দ্রুত গতির পাল্টা আক্রমণে পারদর্শী।”
সোমবার সান্তোস সমর্থন করবেন কোন দলকে? ৪৮ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার এই প্রশ্নের উত্তরও দিলেন অন্যরকম আবেগ নিয়ে।
“নিশ্চিতভাবেই আমি জাপানকে সমর্থন করব, কিন্তু যদি ব্রাজিল জিতে, তাহলেও খারাপ লাগবে না।”