Published : 19 Jul 2026, 05:51 PM
এবারের বিশ্বকাপে অনেক সমর্থকের জন্য হিসাবটা ছিল একদমই সহজ- আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যে দলই খেলুক না কেন, তাদের সমর্থন করা। টুর্নামেন্টজুড়ে কখনও আলজেরিয়া, কখনও কেইপ ভার্ড, পরে মিশর বা সুইজারল্যান্ড, একের পর এক ম্যাচে এই দলগুলি পেয়েছে তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন। এমনকি বিশ্ব ফুটবলে যারা খুব জনপ্রিয় দল নয় এবং নানাা সময়ে সমালোচিত হয়েছে, সেই ইংল্যান্ডও সেমি-ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটি বড় অংশের প্রবল সমর্থন পেয়েছে। যেটির মানে, রোববারের ফাইনালে তাদের গায়ে কিংবা মনে থাকবে স্পেনের লাল জার্সি।
ফুটবল বা যে কোনো খেলাতেই সমর্থন মানেই কেবল প্রিয় দল নয়। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলটির প্রতিপক্ষের প্রতিও লোকের শুভকামনা বা সমর্থন থাকে স্বভাবজাতভাবে। তবে এবারের বিশ্বকাপে বিশ্বজুড়েই, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে ‘অ্যান্টি-আর্জেন্টিনা’ মনোভাব সম্ভবত একটু বেশিই দেখা গেছে অনেকের মধ্যেই।
অথচ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল দলগুলির একটি আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ জিতেছে তারা তিনবার। কোপা আমেরিকায় রেকর্ড ১৬ বারের চ্যাম্পিয়ন। যুগে যুগে অনেক কিংবদন্তি ফুটবলার উপহার দিয়েছে তারা। দিয়েগো মারাদোনা ও লিওনেল মেসি তো ফুটবল ইতিহাসেই সবচেয়ে জনপ্রিয় নামগুলির মধ্যে থাকবেন। দল হিসেবেও তাদের জনপ্রিয়তা আছে ফুটলবিশ্বজুড়ে। তার পরও একটি অংশে কেন এমন প্রবল আর্জেন্টিনা-বিরোধ?
উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে রয়টার্স। যেখানে লুকিয়ে আছে তিক্ত ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বৈষম্য এবং আরও কিছু।
মারাদোনার সৌজন্যেই বিশ্বজুড়ে যেমন জনপ্রিয়তা বেড়েছে আর্জেন্টিনার, তেমনি নানা সময়ে তার বিতর্কিত মন্তব্য ও কাণ্ডে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্থও হয়েছে। লিওনেল মেসির জাদুতে আর্জেন্টনা যেমন সারা বিশ্বে যেমন সমাদৃত হয়েছে ও ভালোবাসা পেয়েছে, তেমনি প্রতিপক্ষের কাছে হয়েছে ইর্ষা ও বিরক্তির কারণ।
মারাদোনার জাদুর রেশ বিশ্বময়
দুর্দান্ত সব ফুটবলারের অবিশ্বাস্য কীর্তিতে আর্জেন্টিনার ফুটবল সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে, জনপ্রিয় হয়েছে। তাদের মধ্যে মারাদোনা সবার উপরে, জন্ম দিয়েছেন রূপকথার গল্প। তার কাঁধে সওয়ার হয়ে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয় করে লাতিন আমেরিকা দেশটি।
দেশটির ফুটবলের গল্পগাঁথায় আজও চিরস্মরণীয় হয়ে আছে ওই আসরের কোয়ার্টার-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। ইংল্যান্ডে তো বটেই, ফুটবলবিশ্বের নানা জায়গাতেই সেটি ‘কুখ্যাত’, কিন্তু আর্জেন্টাইনরা তা লালন করে সাদরে। সেই গোলের চার মিনিট পর ইংল্যান্ডের পাঁচ খেলোয়াড় ও গোলকিপার পিটার শিলটনকে কাটিয়ে করা অবিশ্বাস্য এক গোল করেন তিনি, যেটা পরবর্তীতে ‘গোল অব দা সেঞ্চুরি’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল আজও অনেক ইংলিশ ফুটবল সমর্থকের মনে কাঁটার মতো বিঁধে, আর আর্জেন্টাইনদের কাছে সেটা বড় শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ। আর্জেন্টিনার আত্মসমর্পণের পর ওই দ্বীপের দখলে রাখে বৃটিশরা।
এবার সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়িয়ে, ২-১ গোলে জয়ের পর, ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। তাতে পুরনো ওই বিতর্ক নতুন করে উসকে দেয় তারা। ফিফার আইনে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া নিষিদ্ধ হওয়ায় শাস্তির মুখে পড়তে পারে লিওনেল মেসির দল।
মারাদোনার গল্প অবশ্য সেখানেই শেষ নয়। বড় এক বিতর্কের জন্ম তিনি দেন ১৯৯৪ বিশ্বকাপে। ওই আসরের ঝেই ডোপ পরীক্ষায় পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন আর্জেন্টিনার মহানায়ক। তাতে একজন ফুটবল জাদুকর হিসেবে তার মহিমা না কমলেও, ফুটবলের আঙিনায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।
দলের সেরা তারকাকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় থেমে যায় আর্জেন্টিনার যাত্রা। ওই আসরে তাদের থেকে বিশ্বকাপ ‘চুরি’ করা হয়েছে, এখনও সেটা বিশ্বাস করে দেশটির মানুষ।
আর্জেন্টিনার লকার রুমের এবারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে চাউর হয়েছে। সেখানে শোনা যাচ্ছে একটি নতুন গান; গানের কথায় দেওয়া হয়েছে ওই ‘চুরি’ করে নেওয়ার প্রতিশোধের বার্তা।
মেসির প্রভাব
লিওনেল মেসির হাত ধরে নতুন এক নেতৃত্ব পেয়েছে আর্জেন্টিনা। পায়ের জাদুতে তিনি হয়েছেন দেশের ফুটবলের ব্যতিক্রমী এক আইকন; একদিকে মারাদোনার ঠিক যেন উল্টো রূপ, আরেক ক্ষেত্রে পূর্বসূরির মতোই ফুটবলের আরেক জাদুকর।
জনসম্মুখে মেসি একদমই চুপচাপ; কিন্তু বল পায়ে তিনি দারুণ বিকশিত, মুহূর্তেই প্রতিপক্ষকে পারেন দুমড়ে-মুচড়ে দিতে। এই গুণেই মেসি হয়ে উঠেছেন সারা বিশ্বের জনপ্রিয় ফুটবল তারকা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শাসন করছেন ফুটবল বিশ্বকে, বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ৩৯ বছর বয়সেও তিনি দলের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারী ফুটবলার। ২০২৬ বিশ্বকাপের পুরো টুর্নামেন্টেও কি নয়?
ক্যারিয়ারে দীর্ঘ যাত্রায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এক্ষেত্রে যোগ করেছে নতুন এক অধ্যায়; সারা বিশ্বের ফুটবল সমর্থকদের যেন ভাগ করেছে দুই ভাগে।
ক্যারিয়ারে লম্বা একটা সময় অবশ্য মেসিকে দেশের মানুষদের থেকেই শুনতে হয়েছে তীব্র সমালোচনা। কারণ? বছরের পর বছর ধরে, ধারাবাহিকভাবে চমকপ্রদ পারফরম্যান্সে তিনি বার্সেলোনাকে সাফল্যের শীর্ষে তুললেও, জাতীয় দলে যে সেটা বয়ে নিতে পারতেন না।
২০১৪ বিশ্বকাপে আপন মহিমায় বিকশিত হয়ে দলকে ফাইনালে অবশ্য তুলেছিলেন মেসি; কিন্তু শিরোপা লড়াইয়ে শেষ মুহূর্তের গোলে হেরে যান জার্মানির বিপক্ষে। তাইতো, টুর্নামেন্ট সেরা ফুটবলারের পুরস্কার পেলেও মারাকানায় সেদিন এক হতাশ, ভেঙে পড়া মেসির দেখা মিলেছিল। পরের দুই বছর টানা কোপা আমেরিকার ফাইনালে টানা ব্যর্থতায় কষ্টে ও হতাশায় জাতীয় দলকে বিদায় বলে দেন তিনি।
তবে অল্প সময়েই সিদ্ধান্ত বদলে ফিরে আসেন তিনি এবং শুরু হয় তার সফল এক যাত্রা। ২০২১ সালে দেশকে কোপা আমেরিকা জেতানোর পরের বছর কাতারে, অসাধারণ পারফরম্যান্স আর নেতৃত্বে ৩৬ বছর পর দেশকে আবার এনে দেন বিশ্ব জয়ের স্বাদ। ২০২৪ সালে তারা কোপা আমেরিকা জিতে নেয় আবার। এবার তাদের সামনে বিশ্ব সেরার মুকুট ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ।
মেসির উপস্থিতিই যেন চুম্বকের মতো ফুটবলপ্রেমীদের আর্জেন্টিনার দিকে টানে, যা দেখা যায় আর্জেন্টিনা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশ থেকে শুরু করে আরও অনেক দেশে। মেসি ও আর্জেন্টিনার সাফল্যে এখানে লাখ লাখ ভক্তকে হাসতে আবার ব্যর্থতায় কাঁদতে দেখা যায়।
অন্যপাশে আবার দেখা মেলে এর ভিন্ন রূপ। অনেকে এই মেসি-কেন্দ্রিক গল্পে বিরক্ত এবং তাদের মতে, মেসির এত এত প্রশংসা অত্যন্ত বাড়াবাড়ি।

প্রতিবেশিদের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা
লাতিন আমেরিকায় আর্জেন্টিনার ভাবমুর্তি বেশ জটিল। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিকভাবে অন্যদের চেয়ে নিজেদেরকে আলাদা মনে করে আসছে, যা মূলত শক্তিশালী ইউরোপিয়ান সংস্কৃতির প্রভাবে এবং এমন এক ফুটবল সংস্কৃতির দ্বারা গড়ে উঠেছে, যেখানে কোনো জয়কে জাতীয় শ্রেষ্টত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়।
তাদের এভাবে নিজেদের পিঠ চাপড়ানো অনেক সময় প্রশংসিত হলেও, ওই অঞ্চলের অনেক দেশের কাছে এটা কেবলই আর্জেন্টাইনদের দাম্ভিকতা।
অনেক দেশের সমর্থকরা বিভিন্ন টুর্নামেন্টে জাতীয়তাকে মেলে ধরতে পতাকা নাড়িয়ে এবং নানা ধরনের স্লোগান দিয়ে থাকে। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল পাগল সমর্থকরা প্রায় সময়ই বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। তারা যেভাবে জাতীয়তাবোধ ফুটিয়ে তোলেন, তাতে ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভীষণ খারাপ দিকটি উন্মোচিত হয়ে পড়ে।
সেই জাতীয়তাবাদ আরও কদর্য দিকে মোড় নেয় কখনও কখনও। চলতি মাসের শুরুতে আর্জেন্টিনার একজন টিভি ভাষ্যকার মেক্সিকানদের ‘ঘৃণ্য’ বলে অভিহিত করেন এবং “শুধু ফুটবলেই নয়, সব কিছুতেই” তারা তা আর্জেন্টাইনদের ঈর্ষা করেন বলে অভিযোগ তোলেন। ওই ধারাভাষ্যকারের মন্তব্যকে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাম বলেছিলেন, “অত্যন্ত গর্হিত।”
আবার স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থক ফ্রান্স দলের আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের উপহাস করে আক্রমণাত্মক গান গায় এবং স্লোগান দেয়। ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের পর টিম বাসে এমন এক গান গাওয়ার কারণে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা পরে ক্ষমা চেয়েছিলেন।
আরও অনেক ঘটনায় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের বিরুদ্ধে নানা জায়গায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করার এবং বর্ণবাদ উসকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়গুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে অথবা অন্য দলের সমর্থকরাও অভিযোগ করেন।
দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা
যুগের পর যুগ ধরে ব্রাজিলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে সফল এই দুই জাতির মধ্যে ফুটবলের লড়াই আরও জমিয়ে তুলেছে। ব্রাজিলের মাঠে ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে স্বাগতিকরা বাজেভাবে হেরে ছিটকে পড়লে এবং নিজেরা ফাইনালে ওঠার পর, আর্জেন্টাইন সমর্থকরা চিৎকার করছিল এটা বলে যে, “ব্রাজিল, বলো কেমন লাগছে…”
২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকায় চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে হারের পর দেশটির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্কে উত্তেজনা বেড়ে যায়। এছাড়া বিশ্বকাপে বারবার দেখা হওয়ায় এবং পারফরম্যান্স নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কেও দুই দেশের ফুটবল সম্পর্কে তিক্ততা বাড়ে।
আর্জেন্টিনার খেলার ধরণ একই সঙ্গে সুন্দর এক ফুটবল শৈলী এবং ধুর্ততার শামিল- ফলে তাদের খেলা অনেক সময় দৃষ্টিনন্দন হলেও অনেকের মতে তা ফেয়ার প্লে-এ আদর্শের বিপরীত।
এবারের বিশ্বকাপের রেফারির অনেক সিদ্ধান্তও আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিপক্ষ দলের ফুটবলার ও কোচিং স্টাফরা। সামাজিক মাধ্যমেও অনেকে তা তুলে ধরেছেন এবং বাস্তবতা যেমনই হোক, ‘কর্তৃপক্ষের সহায়তা পাচ্ছে আর্জেন্টিনা’. এরকম ধারণা প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।
সব মিলিয়েই এবারের বিশ্বকাপে অনেক দর্শকের কাছে সমর্থনের ব্যাপারটিই এমন হয়ে উঠেছে যে, ‘আর্জেন্টিনা বাদে যে কোনো দল।’