Published : 30 Jun 2026, 07:11 PM
১৯৩০ থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপ। মাঝে পেরিয়ে গেছে ৯৬টি বছর। কিন্তু বিশ্বকাপের আঙিনায় কখনও দেখা হয়নি ফ্রান্স ও সুইডেনের! প্রায় এক শতাব্দীর অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে এবার; উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের ম্যাচ দিয়ে।
১৯৫৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে দেখা হতে পারত দুই দলের। দুটি দলই উঠেছিল সেমি-ফাইনালে। সেসময়ের পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিল সুইডেন। কিন্তু জুস্ত ফঁতেন-রেমঁ কোপাদের ফ্রান্স পারেনি সেমি-ফাইনালের বৈতরণী পার হতে।
ওই ম্যাচে ফরাসিদের প্রতিপক্ষ ছিল ব্রাজিল। প্রতিপক্ষ দলের আক্রমণভাগে ছিলেন পরে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা পেলে। হ্যাটট্রিকের ঝড় তুললেন পেলে, তাতে ৫-২ ব্যবধানের হারে ফ্রান্সের ফাইনালে ওঠার প্রদীপটি গেল নিভে। পরে ব্রাজিল শিরোপাও জিতেছিল সুইডেনকে একই ব্যবধানে হারিয়ে।
স্টকহোমে ২৯ জুনের ওই ফাইনালে দেখা না হওয়ায় ফ্রান্স-সুইডেন ম্যাচের অপেক্ষা বাড়ে আরও ৬৮ বছর। ৩০ জুন ২০২৬- মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় হবে, সে অপেক্ষার শেষ।
অথচ, বিশ্বকাপের শুরু, অর্থাৎ সেই ১৯৩০ সাল থেকে বৈশ্বিক ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরের অবিচ্ছেদ্য অংশ দুই দল। এ পর্যন্ত ফ্রান্স ম্যাচ খেলেছে ৭৬টি, সুইডেন ৫৪টি।
দুই দলই ‘সোনালি প্রজন্ম’ উপহার দিয়েছে, তারা বিশ্বকাপের মঞ্চে ছাপ রেখে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু কখনই তাদের মুখোমুখি হওয়ার পথটা কখনও মেলেনি এক বিন্দুতে। মেলার সম্ভাবনা যে একেবারেই জাগেনি, তা নয়। কিন্তু কোনো না কোনভাবে মুখোমুখি এড়িয়ে যেতে পেরেছে তারা; যেন ইদুর-বেড়াল খেলায় মত্ত ছিল তারা।
১৯৫৮ বিশ্বকাপের আগে, ১৯৫০ সালে, দুই দলের মুখোমুখি হতেই পারত। কেননা, সেবার ছিল না নকআউট পর্ব। গ্রুপ পর্ব শেষে চার দল নিয়ে হয়েছিল ফাইনাল রাউন্ড। সবাইকে সবার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু, শেষ মুহূর্তে ব্রাজিলের ওই আসরে অংশ নেওয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল ফ্রান্স।
১৯৯৪ বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলে সুইডেন। সেবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে বুলগেরিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়েছিল তারা। এই আসরের বাছাইয়ে ফ্রান্সকে বিদায় করে দিয়েছিল বুলগেরিয়া। প্যারিসে ২-১ গোলে বুলগেরিয়ার কাছে হেরে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে ছিটকে গিয়েছিল ফরাসিরা।
এমনটা হয়েছে সুইডেনের বেলায়ও। যেমন ১৯৯৮, ২০০৬, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলে ফ্রান্স, এর মধ্যে দুই আসরে, ২০০৬ ও ২০১৮ সালে খেলেছিল সুইডেন, বাকি দুই আসরে তারা বাছাই পেরুতে পারেনি। ২০০৬ ও ২০১৮ সালেও তারা ড্রয়ে পড়েছিল অন্য গ্রুপে, ফলে দেখা আর হয়নি।
তাই বলে, বিষয়টা এমন নয় যে, দুই দল পরস্পরের কাছে একেবারে অপরিচিত। বিশ্বকাপে দেখা না হলেও অন্য প্রতিযোগিতায় মুখোমুখি হয়েছে তারা। ১৯৯২ সালের ইউরোর গ্রুপ পর্বের দেখায় দুই দলের ম্যাচটি ১-১ ড্র হয়েছিল, ম্যাচটি হয়েছিল সুইডেনে।
এর ২০ বছর পর, ২০১২ সালে, গ্রুপ পর্বের দেখায় ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল সুইডেন। ওই ম্যাচে দৃষ্টিনন্দন ভলিতে গোল করেছিলেন জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ। সবচেয়ে নিকট অতীতে দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল, ২০১৮ বিশ্বকাপের বাছাইয়ে। ঘরের মাঠে দুই দলই জিতেছিল ২-১ গোলে।
এবার অবশ্য নিউ ইয়র্কে মুখোমুখি হতে যাওয়া দুই দল একটু ভিন্ন মেরুতেই। নকআউট পর্বে ফ্রান্স উঠে এসেছে দাপটের সাথে। গ্রুপের তিন ম্যাচের সবগুলো জিতেছে দিদিয়ে দেশোঁর দল। প্রতিপক্ষের জালে ১০ গোল দিয়েছে তারা। অন্যদিকে, তৃতীয় সেরা আট দলের একটি হয়ে, কষ্টে এই মঞ্চে এসেছে সুইডিশরা।
চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আসা গ্রাহাম পটারের দলের সামনে এখন করছে অপেক্ষা বিশাল চ্যালেঞ্জ। সাবেক সুইডিশ তারকা ইব্রাহিমোভিচও রাখঢাক না রেখে বলেছেন, এই ফ্রান্সকে হারানো কঠিন।
“এমন কোনো দল দেখছি না, যারা ফ্রান্সকে হারাতে পারে। প্রতিপক্ষের সামনে তখনই সুযোগ আসে, যখন কোনো দল ঢিল দেয়, খেলার গতি কমিয়ে দেয়। কেবল তখনই আমি প্রতিপক্ষকে ম্যাচ ফিরতে দেখেছি। ফ্রান্স আসলে অন্য স্তরের ফুটবল খেলে।”
নিজেদের দিক থেকে অবশ্য সতর্ক ফ্রান্সও। এরই মধ্যে দলটির কোচ দেশোঁ শিষ্যদের বলে রেখেছেন, অন্তত একজনের সহায়তায় সুইডিশরা তাদের বিপদে ফেলতেই পারে। সেই লোকটা সেবাস্তিয়ান লারসন, এখন যিনি পটারের কোচিং স্টাফের একজন। ২০১২ সালের ইউরোতে এই লারসনের গোলে ফ্রান্সকে হারিয়েছিল সুইডিশরা। যেটি ছিল দুই দলের বড় কোনো আসরে সবশেষ সাক্ষাৎ। লারসনও বর্তমান সুইডেন দল নিয়ে আশাবাদী।
“যদি, আপনারা ইতিহাস দেখেন, অতীতে আমরা আরও শক্তিশালী দলকে হারিয়েছি। যদিও এবারের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স, কিন্তু বিশ্বাস রাখার কারণ আছে। আশা করি, আমাদের ছেলেরাও একইভাবে অনুভব করবে।”
প্রায় এক শতাব্দীর পর অপেক্ষা শেষের পথে। শেষ পর্যন্ত মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স ও সুইডেন। কাগজে-কলমে কে ইদুর, কে বেড়াল, তা পরিষ্কার। কিন্তু কয়েক দশক ধরে, বিশ্বকাপ দেখাচ্ছে এবং শেখাচ্ছে, ফুটবল খুব কম সময়ই চেনা চিত্রনাট্য মেনে চলে।