Published : 23 Jun 2026, 09:16 AM
ম্যাচ শেষে গ্যালারির দিকে মুখ করে বক্সের ভেতর বসে গেলেন নরওয়ে দলের কোচিং স্টাফসহ সবাই। সামনে গোলপোস্টের কাছে মার্টিন ওডেগোর। নরওয়ে অধিনায়কের সামনে রাখা একটি ড্রাম। সেই ড্রামে তিনি ঝংকার তুললেন। ছন্দের তালে নৌকা চালানোর মতো করে অঙ্গভঙ্গি করলেন সামনে বসে থাকা দলের সবাই। ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রো’ (বৈদ্যুতিক নৌকা বাইচ) উদযাপনে তারা স্মরণীয় করে রাখলেন মুহূর্তটি।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে এসে প্রথম দুই ম্যাচেই নিশ্চিত হয়ে গেল নকআউট পর্ব। উদযাপনটা এরকম বিশেষ কিছুই তো হওয়ার কথা!
বিশ্বকাপের ‘আই’ গ্রুপের ম্যাচে সেনেগালকে ৩-২ গোলে হারিয়ে নকআউট পর্বে পৌঁছে গেল নরওয়ে।
লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপের জোড়া গোলের দিনে তাদের পথ অনুসরণ করলেন সময়ের আরেক তারকা আর্লিং হলান্ডও। প্রথম বিশ্বকাপে এসে দুই ম্যাচে চার গোল হয়ে গেল তার।
সেনেগালের দুটি গোলই করেন ক্রিস্টাল প্যালেসের ফরোয়ার্ড ইসমাইলা সার।
নরওয়ের সমর্থনে এই ম্যাচের গ্যালারি পরিণত হয়েছিল লাল সমুদ্রে। নরওয়ের এই সমর্থকেরা বিশ্বকাপের শুরু থেকেই তাদের গণ ‘নৌকা বাইচের’ দিয়ে নিউ ইয়র্কবাসীদের বিনোদন দিয়ে আসছেন। ভিসা নিষেধাজ্ঞার কারণে বেশিরভাগ সেনেগালিজ দর্শক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি। গ্যালারিতে তাদের সমর্থকের সংখ্যাও অনেক কম ছিল।
বিকেলে প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রঝড়ের কারণে ঘরে থাকার সতর্কতা জারি করা হয়েছিল এবং যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছিল। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে আসা বেশিরভাগ সমর্থকই খোলা স্টেডিয়ামে পঞ্চো পরেছিলেন, যদিও খেলা শুরু হওয়ার পর বৃষ্টির তীব্রতা কমে আসে। শুরু হয় ফুটবলের রোমাঞ্চ।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে এই দুই দলকে ‘ডাক হর্স’ বলেছিলেন অনেকেই। যেমনটি আশা ছিল এই লড়াই ঘিরে, তেমন উত্তেজনাই ছিল ম্যাচজুড়ে।
বিশ্বকাপে আফ্রিকার সেরা আশা হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত সেনেগাল দারুণভাবে শুরু করে ম্যাচ। তবে নিউ জার্সির ভেজা সন্ধ্যায় তাদের রক্ষণভাগ শেষ পর্যন্ত নরওয়ের আক্রমণ, বিশেষ করে হলান্ডকে আটকাতে ব্যর্থ হয়।

ম্যাচের গতিপ্রকৃতি ছিল ফ্রান্সের বিপক্ষে সেনেগালের প্রথম ম্যাচের মতোই। আফ্রিকান দলটি প্রথম আধ ঘণ্টা ধরে দারুণভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিপক্ষকে হতাশ করে এবং হলান্ডকে বল থেকে দূরে রাখে।
তবে বিরতির কাছাকাছি সময়ে সেনেগালের রক্ষণভাগ ভেঙে পড়ে। ৪৩তম মিনিটে নরওয়ের প্রথম গোলটি করেন মার্কাস পেদেরসেন, যিনি চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া ইউলিয়ান রেয়ারসনের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন। সেনেগালের অধিনায়ক কালিদু কুলিবালি বল ক্লিয়ার করতে ভুল করেন এবং বক্সের ঠিক সামনে থেকে বল তুলে দেন পেদেরসেনের পায়ে। তিনি ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং ছুটে আসা কুলিবালিকে এড়িয়ে গোলে শট নেন। গোলরক্ষক এদুয়াঁ মঁদি আটকাতে পারেননি সেই শট।
এর আগে দুই দফায় দলকে বিপদমুক্ত করেন মঁদি। কর্নার থেকে রেয়ারসনের হেড আটকে দেন তিনি দারুণ রিফ্রেক্সে, পরেরবার বক্সের ভেতর বুক দিয়ে বল নামিয়ে ওডেগোরের বাঁ পায়ের ঠেকিয়ে দেন তিনি পা দিয়ে।
ওই গোলের পর দুই দফায় গোলের কাছাকাছি যান হলান্ড। একবার বক্সের ভেতর গোলকিপার মঁদিকে কাটিয়ে বাঁ পাশে দুরূহ কোণ থেকে নেওয়া তার শট ফিরে আসে পোস্টে লেগে। এরপর তার হেড কোনোরকমে গোললাইনে আটকান মঁদি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আর হলান্ডকে আটকে রাখা যায়নি। নরওয়ে দ্বিতীয় গোলটি পেয়ে যায়। বক্সের একটু বাইরে থেকে দুই ডিফেন্ডারের ভেতর দিয়ে চমৎকারভাবে বল বাড়িয়ে দেন ওডেগোর, বাঁ পায়ের জোরাল শটে বল জড়িয়ে দেন হলান্ড।
এর মিনিট পাঁচেক পর একটি গোল ফিরিয়ে দেয় সেনেগাল। রক্ষণভাগের অসংখ্য ভুল সত্ত্বেও, পাল্টা আক্রমণে সেনেগালকে মাঝে মাঝে বিপজ্জনক মনে হচ্ছিল। তেমনই এক আক্রমণ থেকে বক্সের ভেতর বল পেয়ে লেগে থাকা ডিফেন্ডারকে কোনোরকমে ছিটকে আগুয়ান গোলকিপারের ওপর দিয়ে বল জালে জড়ান সার।
তবে এরপর পাঁচ মিনিট পর আবার ব্যবধান দুই গোলে নিয়ে যান হলান্ড। বদলি নামা লেও অস্তিগোর বক্সে ঢুকে দারুণভাবে একজনকে কাটিয়ে দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে আলতো করে বুদ্ধিদীপ্ত চিপ করেন মাঝখানে। সেখানে অপেক্ষায় থাকা হলান্ড সরাসরি ভলি করেন। ক্রসবারে লেগে বল ঢুকে জায় জালে।
৯০ মিনিট শেষে যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে একটি গোল শোধ করে সেনেগাল। নরওয়ের রক্ষণ বল ক্লিয়ার কর পারেনি ঠিকঠাক, কাছ থেকে বল জালে জড়িয়ে ম্যাচে উত্তেজনা ফেরান সার। তবে বাকি সময়টুকুতে আর বিপদে পড়েনি নরওয়ে।
এই গ্রুপ থেকে সেনেগাল ও ইরাককে হারিয়ে নকআউট নিশ্চিত করেছে ফ্রান্সও। এবারের আসরে প্রথম একটি গ্রুপ থেকে দুটি দল পরের পর্ব নিশ্চিত করে ফেলল।
সেনেগালের আশা শেষ হয়ে যায়নি। সেরা তৃতীয় স্থানাধিকারী দলগুলোর একটি হিসেবে পরের পর্বে যেতে পারে তারা। নরওয়ে ও ফ্রান্সের লড়াইয়ে নির্ধারিত হবে গ্রুপের শীর্ষস্থান।