মেসির পায়ে নাচে বিশ্বকাপ
সেমি-ফাইনালের মহারণে মুগ্ধতা ছড়ানো ফুটবল উপহার দিলেন এই জাদুকর।
বল পায়ে তিনি থমকে দাঁড়ান, তার পায়ের ছন্দে তাল মেলাতে যেন চুপ হয়ে যায় গ্যালারি। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার অপেক্ষার ক্ষণ গুণতে ব্যস্ত, আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাকিরা ইতি-উতি চোখ বুলিয়ে দেখে নেন কোথাও ফাঁক-ফোকর আছে কিনা। জাদুকরী বাঁ পায়ে বলে আলতো আচঁড় দিতে দিতে ছক কষে নেন লিওনেল মেসি। চকিত চমকে জায়গা বের করে নিয়ে, পাহারাদারদের চোখে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেরিয়ে যান। গ্যালারি মুখর হয় ‘মেসি, মেসি’ গ্লোগানে। একবার নয়, ক্রোয়েশিয়াকে ধ্বসিয়ে দেওয়া ম্যাচে যা দেখা গেল অসংখ্যবার।
লুসাইল স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের মধুর প্রতিশোধ নিয়ে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। চার বছর আগে রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়াটদের কাছে এই স্কোরলাইনেই হেরেছিল আলবিসেলেস্তারা।
এখন আপেক্ষা মধুরেণ সমাপেয়’র। তাহলেই কেবল ১৯৮৬ সালের পর আরেকটি বিশ্বকাপের উৎসবের রঙে রঙিন হতে পারে আর্জেন্টিনা। ফুটবলের মহাতারকা মেসির আজন্ম হাহাকারও ঘোঁচে। এক কোপা আমেরিকার শিরোপা দিয়ে যে আকাশি নীল-সাদাদের নয়নের মণি হওয়া যায় না!
ক্রোয়াশিয়া ম্যাচে অবশ্য শুরুর দিকে সাবধানী ছিল আর্জেন্টিনা, প্রতিপক্ষের কড়া পাহারার বাতাবরণে কিছুটা বন্দিও ছিলেন মেসি। ১৯তম মিনিটে যখন মাঝমাঠে ঊরুতে হাত দিয়ে চেপে ধরলেন, তখন দুঃশ্চিন্তার মেঘের উঁকি। আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের মুখ চাওয়া-চাওয়ি। দুঃসংবাদ নয়তো? তবে মিনিট তিনেক পরেই মেসি ঝলক।
মাঝমাঠের একটু উপর থেকে বল পায়ে চুপচাপ যেন দাঁড়িয়ে থাকলেন। এরপর এক ছুটে একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বক্সের দিকে ছুটলেন, যদিও শেষ পাসটা ঠিকঠাক বাড়াতে পারলেন না, কিন্তু স্বস্তি ফিরে এলো আলবিসেলেস্তা সমর্থকদের চোখে-মুখে। দলের প্রাণভোমরার বাঁ পা জাদুর কাঠি, সেটা আছে ঠিকঠাক।
২৫তম মিনিটে বুলেট গতির স্পট কিকে যখন দলকে এগিয়ে নিলেন মেসি, ‘ভামোস আর্জেন্টিনা’ কোরাসে কেঁপে ওঠে গ্যালারির চারধার, নেচে ওঠে আর্জেন্টিনার ডাগআউট। শুরু মলিনতা কাটিয়ে তেড়েফুঁড়ে জেগে ওঠে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
এই গোলেই মেসি রেকর্ডের পাতায় পাতায় আচঁড় কাটেন। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা গাব্রিয়েল বাতিস্তুতাকে (১০টি) পেছনে ফেলেন। আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যাকে ‘সেঞ্চুরি’ পূরণের আরও কাছে নিয়ে যান (৯৬টি)। দাবি তুলে রাখেন এবারের আসরের গোল্ডেন বুটের। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের মতো তার গোলও এখন ৫টি।
পাঁচ মিনিট পর ব্যবধান দ্বিগুণ করা গোলটি হুলিয়ান আলভারেসের বলতে গেলে একক প্রচেষ্টার ফল। যদিও এই আক্রমণের সুর কিছুটা বেঁধে দিয়েছিলেন মেসি। অধিনায়কের পাস ধরে ক্রোয়াটদের গোলমুখে মাঝমাঠের আগ থেকে ছুটেছিলেন আলভারেস। এই তরুণ ফরোয়ার্ডের দ্বিতীয় গোলের কৃতিত্ব পুরোটাই মেসির।
৫৮তম মিনিটে অবশ্য ব্যবধান বাড়ানোর দারুণ সুযোগ হাতছাড়া করেন মেসি। ছয় গজ বক্সের বাঁ দিক থেকে শট নিতে গিয়ে কিছুটা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তাতে তান কাটেনি আর্জেন্টিনার ছন্দে। তাই ৬৯তম মিনিটে আবারও মেসিতে মোহাচ্ছন্ন সবাই।
ডান দিক থেকে বল পায়ে এগিয়ে গেলেন, পুরোটা সময় নাছোড়বান্দার মতো লেগে রইলেন ইয়োস্কো গাভারদিওল। বক্সে ঢোকার মুখে মেসি থামলেন, করণীয় ঠিক করলেন, ঘুরলেন, এক ঝটকায় একটু এগিয়ে বাইলাইন থেকে কাট ব্যাক করলেন ছয় গজ বক্সে। প্লেসিং শটে বাকিটুকু সারলেন আলভারেস। ম্যাচ আর্জেন্টিনার মুঠোয়।
এই অ্যাসিস্টে মেসির হয়ে যায় আরেকটি রেকর্ড। খেলাধুলার পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা অপটা ১৯৬৬ বিশ্বকাপ থেকে রেকর্ড রাখার পর থেকে বিশ্ব মঞ্চে সবচেয়ে বেশি ৮ গোলে সহায়তার রেকর্ড এতদিন ছিল কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনার। আর্জেন্টিনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ককে ছুঁয়ে ফেললেন মেসি। ফাইনালে এ পাতায়ও পূর্বসূরিকে ছাপিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে তার সামনে।
স্কোরলাইন ৩-০ হয়ে যাওয়ার পর ঘড়ির ডানায় চেপে সময় যত গড়িয়েছে, ক্রোয়েশিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোর আশা ফিকে হয়েছে তত। কাজের কাজ করে ফেলায় মেসিও আর মরিয়া হয়ে ওঠেননি ব্যবধান বাড়াতে। হয়ত ফাইনালের জন্য বাকি প্রাণশক্তি সঞ্চয় করে রেখে তিনি ক্ষণ গুণেছেন শেষের বাঁশির।
সেটা যখন বাজল, অমনি লুসাইলের সবুজে শুরু আর্জেন্টিনার আনন্দ নৃত্য। চিৎকার, কোলাহল, হর্ষোল্লাসে মুখরিত চারপাশ। আকাশি নীল-সাদা জার্সির রঙ পাওয়া গ্যালারিতে মাতোয়ারা বাঁধনহারা উচ্ছ্বাসে। কখনও প্রজাপতির মতো শূন্যে লাফিয়ে, কখনও মুষ্টিবদ্ধ হাত বারবার ঝাঁকিয়ে সমর্থকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেলেন মেসি, যেমনটা হতে চেয়েছেন সবসময়।
যদিও মেসির শুরুটা ছিল সৌদি আরবের কাছে ধাক্কা খেয়ে। কিন্তু এরপর ম্যাচ যত গড়িয়েছে, তিনি শতদলে ফুটেছেন। মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস বাধা পেরুনোর পর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মহারণেও মুগ্ধতা ছড়ালেন মেসি। সত্যিই তার বাঁ পায়ে নাচছে এবারের বিশ্বকাপ।
