১৯৬৬ বিশ্বকাপ: ইংল্যান্ডের ‘প্রথম’

বিশ্বকাপে তৃতীয়বার কোনো স্বাগতিক দেশ জিতল শিরোপা। 

ইকবাল শাহরিয়ারবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 Nov 2022, 01:23 PM
Updated : 11 Nov 2022, 01:23 PM

পশ্চিম জার্মানি ও স্পেনকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপের অষ্টম আসর আয়োজনের সুযোগ পায় ইংল্যান্ড। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে হুট করে দেশটি পড়ে যায় বড় এক ঝামেলায়। খোয়া যায় জুলে রিমের ট্রফি! বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক চার মাস আগে পিকলস নামক এক কুকুর খুঁজে বের করে ট্রফিটি। স্বস্তির শ্বাস ফেলে ফুটবল বিশ্ব।

আগের তিন আসরের মতো একই ফরম্যাটে ১১ থেকে ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ। ১৬ দলের টুর্নামেন্টে স্বাগতিকদের সঙ্গে সরাসরি খেলে শিরোপাধারী ব্রাজিল।  

বাছাই পর্ব পেরিয়ে আসে ইউরোপের নয় দেশ-বুলগেরিয়া, পশ্চিম জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়ন, স্পেন, ইতালি, হাঙ্গেরি, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স ও পর্তুগাল। ব্রাজিলের সঙ্গী হয় লাতিন আমেরিকার তিন দেশ- আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও চিলি। উত্তর আমেরিকা থেকে আসে মেক্সিকো, এশিয়া থেকে উত্তর কোরিয়া।

এই আসর দিয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় পর্তুগাল ও উত্তর কোরিয়ার। বাছাইপর্বে সরাসরি আফ্রিকা মহাদেশ থেকে কোনো দেশের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ না থাকায় বাছাই বয়কট করে ওই অঞ্চলের ১৫ দেশ।

গ্রুপ পর্ব

১৬ দেশকে চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয়। রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে গ্রুপে দলগুলো একে অপরের বিপক্ষে খেলে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল যায় কোয়ার্টার-ফাইনালে।

গ্রুপ ১: ইংল্যান্ড, উরুগুয়ে, ফ্রান্স, মেক্সিকো

গ্রুপ ২: পশ্চিম জার্মানি, আর্জেন্টিনা, স্পেন, সুইজারল্যান্ড

গ্রুপ ৩: ব্রাজিল, পর্তুগাল, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া

গ্রুপ ৪: সোভিয়েত ইউনিয়ন, উত্তর কোরিয়া, ইতালি, চিলি

গ্রুপ ১ থেকে পরের ধাপে যায় ইংল্যান্ড ও উরুগুয়ে। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় ইংল্যান্ড। এক জয় ও দুই ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয় উরুগুয়ে। দুই ড্রয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয় মেক্সিকো, এক ড্রয়ে ১ পয়েন্ট চতুর্থ ফ্রান্স।

গ্রুপ ২ থেকে কোয়ার্টার-ফাইনালে যায় পশ্চিম জার্মানি ও আর্জেন্টিনা। দুই জয় ও এক ড্রয়ে দুটি দলেরই পয়েন্ট ছিল ৫। গোল অনুপাতে এগিয়ে থাকায় গ্রুপ সেরা হয় পশ্চিম জার্মানি, রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা। এক জয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয় স্পেন, তিন হারে শূন্য হাতে ফেরে সুইজারল্যান্ড।

গ্রুপ ৩ থেকে বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে পরের ধাপে যায় পর্তুগাল ও হাঙ্গেরি। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় আগের দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল!

তিন জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় পর্তুগাল। দুই জয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে শেষ আটে তাদের সঙ্গী হয় হাঙ্গেরি। এক জয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়ে হতাশার আসর শেষ করে ব্রাজিল। তিন ম্যাচেই হেরে শূন্য হাতে বিদায় নেয় বুলগেরিয়া।

গ্রুপ ৪ থেকে কোয়ার্টার-ফাইনালে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আসরের চমক উত্তর কোরিয়া। তিন জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয় উত্তর কোরিয়া। এক জয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়ে আগেভাগেই আসর শেষ করে ইতালি। ড্র থেকে ১ পয়েন্ট পায় চিলি।

কোয়ার্টার-ফাইনাল

শেষ আটের লাইনআপ ছিল এমন: আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড, পর্তুগাল- উত্তর কোরিয়া, পশ্চিম জার্মানি-উরুগুয়ে ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-হাঙ্গেরি।

জিওফ হার্স্টের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে বিদায় করে সেমি-ফাইনালে যায় ইংল্যান্ড। উরুগুয়েকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তাদের সঙ্গী হয় পশ্চিম জার্মানি।

হাঙ্গেরিকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। নাটকীয়তায় ভরা ম্যাচে রোমাঞ্চকর জয়ে তাদের সঙ্গী হয় পর্তুগাল।

২৫ মিনিটে মধ্যে ৩ গোলে করে ম্যাচে চালকের আসনে বসেছিল উত্তর কোরিয়া। মনে হচ্ছিল শেষ চারে যাবে তারাই। এরপর ইউজেবিওর জাদুকরী নৈপুণ্যে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় পর্তুগাল। ৫-৩ গোলের জয়ে তারকা স্ট্রাইকার করেন চার গোল, দুটি পেনাল্টি থেকে। অন্য গোলটি করেন জোসে অগাস্তো।

সেমি-ফাইনাল

২৫ জুলাই লিভারপুলে সেমি-ফাইনালে মুখোমুখি হয় পশ্চিম জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। ২-১ গোলের জয়ে ফাইনালে পৌঁছায় পশ্চিম জার্মানি। হেলমুট হলার ও ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার করেন একটি করে গোল।

পরদিন ববি চার্লটনের জোড়া গোলে একই ব্যবধানে পর্তুগালকে বিদায় করে প্রথমবারের মতো ফাইনালে যায় ইংল্যান্ড। ৮২তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে ব্যবধান কমিয়ে আশা জাগান ইউজেবিও। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারেনি আসরে সর্বোচ্চ গোল করা পর্তুগাল।

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২-১ গোলে হারায় পর্তুগাল।

ফাইনাল

৩০ জুলাই, ১৯৬৬। প্রায় ৯৭ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে গমগম করছে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম। ফাইনালে মুখোমুখি স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানি।

ম্যাচের শুরুতেই হলারের গোলে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। একটু পরেই সমতা ফেরান হার্স্ট। প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ সমতায়। দ্বিতীয়ার্ধে মার্টিন পিটার্সের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। ৮৯তম মিনিটে গোল শোধ করে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান উলফগাঙ ওয়েবার।

সেখানে আর পেরে ওঠেনি পশ্চিম জার্মানি। ১০১তম মিনিটে দলকে এগিয়ে নেন হার্স্ট, ১২০তম মিনিটে হ্যাটট্রিক পূরণ করেন তিনি।

৪-২ গোলে জিতে বিশ্বকাপে নিজেদের একমাত্র শিরোপা জেতে ইংল্যান্ড। হার্স্ট ছাড়া এখনও পর্যন্ত ফাইনালে হ্যাটট্রিক করতে পারেননি আর কোনো খেলোয়াড়।

এক নজরে অষ্টম বিশ্বকাপ

·                    স্বাগতিকঃ ইংল্যান্ড

·                    চ্যাম্পিয়নঃ ইংল্যান্ড

·                    রানার্স আপঃ পশ্চিম জার্মানি

·                    মোট ম্যাচঃ ৩২

·                    মোট গোলঃ ৮৯

·                    গোল গড়ঃ ২.৭৮

·                    সর্বোচ্চ গোলদাতাঃ  ইউজেবিও [পর্তুগাল- ৯ গোল]

·                    সেরা খেলোয়াড়ঃ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার (পশ্চিম জার্মানি)  [আন অফিসিয়াল]

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক