অনেক কথার ভিড়ে রোনালদো বললেন, ‘কোচ কথা রাখেননি’
বিশ্বকাপ শেষে তিনি জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও কেন তা চূড়ান্ত করতে পারেননি, সেটাও জানালেন পর্তুগাল অধিনায়ক।
যেন অনেক দিনের অপেক্ষা শেষে মুখ খুললেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। সফরের মাঝপথে, ম্যাচের আগের দিন জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে গিয়ে যে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেন, সেটার ব্যাখ্যা দিতে এসে যেন নতুন আরেক বিতর্কই সৃষ্টি করলেন তিনি। পর্তুগিজ মহাতারকা বললেন, তাকে দেওয়া কথা রাখেননি কোচ জর্জে জেসুস।
গত বিশ্বকাপে দলের ব্যর্থ অভিযান শেষেই নাকি জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছিলেন রোনালদো, কিন্তু প্রথমে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ও পরে কোচ জেসুসের অনুরোধে খেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর, এবারের নেশন্স লিগের প্রথম ধাপের চারটি ম্যাচ নিয়ে আগেভাগেই কোচের সঙ্গে তার পরিকল্পনা হয়।
“২০২৬ বিশ্বকাপের পর, পর্তুগালের মানুষদের জন্য আমি একটি চিঠি লিখি, যেটা এখনও আমার কাছে আছে, জাতীয় দলকে বিদায় বলার সময় আমি সেই কথাগুলো বলতে চাই।
বিশ্বকাপ শেষে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে ফেরার পরপরই, ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট আমাকে ডাকেন এবং অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বলেন, কারণ হিসেবে জানান, আমাকে এফপিএফের প্রয়োজন।“
রোনালদো আরও বলেন, বর্তমানে যিনি কোচ হিসেবে আছেন তাকে নিয়োগের ব্যাপারে তখন তার পরামর্শও চাওয়া হয়।
“আমি ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টকে জানাই, আমার মতে এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে। এরপর যেদিন বর্তমানকে কোচকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি ঘোষণা হয়, আমি সত্যিই খুব খুশি হয়েছিলাম। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, (এখন পর্যন্ত ম্যাচের) ফলাফল এর প্রমাণ।
কয়েক দিন পর, আমি জাতীয় দলের নতুন কোচের ফোন পাই, তিনি আমাকে বলেন, সশরীরে দেখা করতে চান। আমি রাজি হই এবং আমার ছুটি শেষে আমাদের দেখা করার সময় ঠিক হয়।”
এরপর, নির্ধারিত দিনে তাদের দেখা হয় এবং কোচের সঙ্গে তার বিস্তারিত আলাপ এবং তাকে জানানো কোচের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন রোনালদো।
“সেদিন কোচ আমাকে বলেন, আমার ওপর আস্থা রাখছেন তিনি এবং তার পরিকল্পনার জন্য আমার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। আমার খেলার বিষয়ে তখনই তিনি একটা পরিকল্পনা দেন। তিনি জানান, আমি (নেশন্স লিগে প্রথম ধাপের চারটি ম্যাচের) প্রথম ও শেষ ম্যাচটি খেলব, সবার শারীরিক কন্ডিশনের বিবেচনায় রেখে তিনি প্রতি ম্যাচে তিন-চারটি বদলি আনবেন।
ওই সময়, তিনি পরামর্শ দেন যে আমি জাতীয় দলের সঙ্গে নরওয়ে ও ডেনমার্কে ভ্রমণ করব না। তার প্রস্তাব ছিল, প্রথম ম্যাচ খেলে আমি পর্তুগালেই থাকব এবং পোর্তোয় (শেষ) ম্যাচের আগে আবার দলের সঙ্গে যোগ দেব।”
কোচের এই পরিকল্পনা পছন্দ হয়নি বলে তখনই জানিয়ে দেন রোনালদো, এমনটাই তিনি তার বিবৃতিতে দাবি করেছেন।
“ওই প্রস্তাব আমি তখনই ফিরিয়ে দিই। আমার কাছে সেটা একদমই ঠিক মনে হয়নি। অ্যাওয়ে ম্যাচে না খেলা মানে এটা নয় যে আমি অধিনায়ক থাকব না। বরং আমার পর্তুগালে থেকে যাওয়া ভালো উদাহারণ তৈরি করে না।”
তার যুক্তি শুনে কোচ তখন তা মেনেও নেন বলে জানান রোনালদো। তবে দলের সঙ্গে সফর করলেও, তাকে দুটি ম্যাচ খেলানোর যে প্রস্তাব দেন কোচ, তাতে সম্মতি দেন তিনি।
সেই অনুযায়ী গত মাসের শেষ সপ্তাহে প্রথম ম্যাচে ওয়েলসের বিপক্ষে শুরুর একাদশে মাঠে নামেন রোনালদো। ওই ম্যাচে একাধিক সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট হলেও, পর্তুগাল ১-০ গোলে জয় পায় এবং সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। দ্বিতীয় ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে বেঞ্চে থেকে শুরু করেন রোনালদো, এবং তাতে যে তার কোনো আপত্তি ছিল না, সেটা তার স্বাভাবিক আচরণেও স্পষ্ট ছিল। কিন্তু এরপরই যত সমস্যার শুরু।
ওই ম্যাচেই দ্বিতীয়ার্ধে দেখা যায় গা গরম করছেন রোনালদো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জেতা ম্যাচটিতে আর তাকে মাঠেই নামাননি কোচ, যা ভালো লাগেনি পর্তুগিজ অধিনায়কের। এবং সেই থেকেই কোচের সঙ্গে তার সম্পর্কে ফাটল ধরে বলে নানা গুঞ্জন ছড়াতে থাকে।
নরওয়ের বিপক্ষে ওই ম্যাচে তার খেলার কথাই ছিল না বলে বিবৃতিতে লিখেছেন রোনালদো। কিন্তু কোচের পরিবর্তিত সিদ্ধান্তেই পরে তার খেলার বিষয়টি সামনে আসে।
“নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের দিন মধ্যাহ্নভোজনের সময় জাতীয় দলের একজন সহকারী কোচ টেবিলের কাছে আসেন, সবাই যেখানে খাচ্ছিল, এবং আমাকে বলেন কোচ আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি জানতে চান, ৩০ মিনিট খেলার মতো আমি ফিট কিনা। সবসময়ের মতো আমি সতীর্থদের সঙ্গে ঠিকঠাকভাবেই রিকভারি করছিলাম, যদিও ভাবিনি সেদিন খেলব আমি। তবে কোনো সমস্যা ছিল না।
যেহেতু এরপর কেবল চতুর্থ ম্যাচেই আমার খেলার কথা ছিল, তাই আমার শারীরিক রিকভারির ইস্যু কিছুটা ছিল, ওই অবস্থাতেই আমাকে অনুরোধটা করা হয়, তবে আমি অবশ্যই হ্যাঁ বলেছিলাম। এরপর তিনি আমাকে ৩০ মিনিট খেলার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বলেন।”
কিন্তু পরে কোনোকিছুই পরিকল্পনা মতো হয়নি, সেটা কোচের হোক বা রোনালদোর। সেই ক্ষোভই প্রকাশ পেয়েছে তার লেখায়।
“এরপর যা হলো, তা তো ইতিহাস। বিরতির পর আমি ওয়ার্ম-আপ করলাম, মিনিটের পর মিনিট কেটে যেতে দেখলাম এবং তারা আমাকে ডাকল না।
কোচ তার কথা রাখেননি।”
ওই ম্যাচের পরের কিছু ঘটনা নিয়েও রোনালদোর সমালোচনা হয়, যা তিনি নিজেই মানছেন ‘ভুল করেছেন তিনি।’ যেমন ম্যাচ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে সমর্থকদের অভিবাদনের জবাব দিতে যাননি তিনি। এজন্য সব ভক্ত-সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন পাঁচবারের বর্ষসেরা ফুটবলার।
নরওয়ে ম্যাচের পর সংবাদমাধ্যমে নানারকম খবর আসতে থাকে- তিনি নাকি অনুশীলন করতে রাজি হননি, আগের দুই দিনও অনুশীলন করেননি। যদিও ডেনমার্কের বিপক্ষে পরের ম্যাচের আগের দিনের সংবাদ সম্মেলনে এসে কোচ জর্জে জেসুস বলেন, এসব খবর সত্যি নয়।
যেসব গুঞ্জন-গুজব ছড়ায় ওই সময়, সেসবের ইতি টানার বিষয়ে কোচের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হয় বলে জানিয়েছেন রোনালদো। কিন্তু তার দাবি, আলোচনা যেমন হয়েছিল, তেমনটা বাস্তবে করেননি কোচ।
“৪৮ ঘণ্টা পর, আমাদের মধ্যে একটা আলোচনা হয়, আমি, কোচ ও সিমাও কৌতিনিয়ো (আল নাস্রের ক্রীড়া পরিচালক), তিনি সেখানে ছিলেন ছিলেন কারণ অগাস্টে তিনিই আমাদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রেখেছিলেন।
“খুবই খোলামেলা ও সব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আমরা একমত হই যে, পুরো ঘটনাটি ভালোভাবে মেটাতে একটাই উপায় আছে: সিমাও কৌতিনিয়োর উপস্থিতিতে কোচ আমাকে এখানে যা বললেন, তা প্রেস কনফারেন্সে বলবেন।
“সমঝোতা হয়েছিল ঠিক এমন: কোচ এই বিষয় নিয়ে প্রেস কনফারেন্স শুরু করবেন, সমস্যার সমাধানে সত্যটা জানাবেন।”
কোচকে তার ভুল স্বীকার করতে বলেছিলেন রোনালদো, তার দাবি কোচ তাতে রাজিও হন; কিন্তু সেটা বাস্তবে দেখা যায়নি।
পরে ডেনমার্ক ম্যাচের আগের দিন জেসুসের সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পরই ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলে ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান রোনালদো।
