উইমেন’স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ
Published : 02 Jun 2026, 07:45 PM
ভোরে এলো দুঃসংবাদ। শিউলি আজিমের মা পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল সবকিছু। সকাল সাতটার অনুশীলনে নামতে যেখানো তোড়জোড় শুরুর কথা ছিল, সেখানে চারদিকে কান্নার রোল। শোকস্তব্ধ শিউলি-মারিয়াদের মানসিক অবস্থা অনুভব করে অনুশীলনে গেল না দল। কিন্তু, শোক নিয়ে পড়ে থাকার সময়ও নেই। নেপালের বিপক্ষে উইমেন’স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমি-ফাইনালের মহারণ যে পরের দিন।
কোচ, কর্মকর্তাদের সকাল কেটেছে প্রিয়জন হারানো শিউলি-মারিয়াদের সান্ত্বনা দিতে; বিষণ্ণ দলকে মানসিকভাবে শক্ত করতে। টিম মিটিংয়ে, খাবার টেবিলে সবখানেই নেপাল ম্যাচের জন্য মেয়েদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে ব্যস্ত ছিলেন পিটার জেমস বাটলার ও তার সহকারীরা।
সময় গড়ানোর সাথে সাথে একটু একটু করে আবেগ সামলে নিয়েছেন শিউলি; বাকিরাও। বিকালে তাই সমুদ্র সৈকতে সবাই এলেন একটু সতেজ বাতাসের খোঁজে। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর বিষণ্ণতা নিয়ে শিউলি এলেন সৈকতে, কখনও সতীর্থদের সাথে, কখনও একাকী পায়চারী করলেন। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে সবাই ফিরলেন হোটেলে।
সহকারী কোচ আবুল হোসেন জানালেন, ভিডিও সেশন হবে বিকালে। সেখানে নেপালের শক্তি, দুর্বলতা তুলে ধরা হবে দলের সামনে। এই সেশনের ছক নিয়েই ভারতের গোয়ার জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে বুধবার খেলতে নামবে দল। বাংলাদেশ সময় সাড়ে ৪টায় শুরু হবে ম্যাচটি।
সাফের গত সাত আসরের পাঁচটি শিরোপা ভারতের। দুটি বাংলাদেশের। সর্বোচ্চ ছয়বার ফাইনাল খেলেও এই স্বাদ পায়নি নেপাল। গত দুই আসরে কাঠমাণ্ডুতে ঘরের মাঠে ফাইনালে তাদের স্বপ্ন ভেঙেছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে যথাক্রমে ৩-১ ও ২-১ গোলে হেরে। দুই দল এবার মুখোমুখি ভিন্ন আঙিনায়। তবে লক্ষ্য সাফল্যের চূড়ায় পা রাখা।
নেপাল যেখানে অধরা শিরোপার খোঁজে, বাংলাদেশ এসেছে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। গ্রুপ পর্বে দুই ম্যাচ জিতে হিমালয় কন্যারা আছে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। সেখানে, মালদ্বীপের বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয়ের পর ভারতের কাছে ৩-০ গোলের হেরে অস্বস্তিতে বাংলাদেশ।
এর সাথে যোগ হয়েছে শিউলির মায়ের মৃত্যুর শোক। তবে, সব বাস্তবতা মেনে নিয়ে আরব সাগরের পাড়ে হাঁটাহাঁটি করল মেয়েরা। বুধবার তাদের ছুটতে হবে স্বপ্ন পূরণের তাড়না নিয়ে। পেশাদারদের যে আবেগের স্রোতে ভেসে গেলে চলে না। সেমি-ফাইনাল সামনে রেখে দলকে এই বার্তাই দিয়েছেন বাংলাদেশ কোচ পিটার জেমস বাটলার। সকালের সেশন বাতিল হওয়ায় তেমন কোনো ক্ষতি দেখছেন না তিনি।
“আমি মনে করি এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিউলির পরিবারের প্রতি আমাদের সমবেদনা জানানো এবং তাদের জন্য প্রার্থনা করা। জানেন তো, যখন আপনি কোনো টুর্নামেন্টের এমন পর্যায়ে যখন থাকবেন, তখন মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত অনুশীলনেরও একটা ঝুঁকি থাকে। তাই আমার মনে হয় না, শিউলির মায়ের মৃত্যুর কোনো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মানসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দলের বেশ অভিজ্ঞ একজন সদস্য এবং সবার কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ও প্রিয়।”
“তবে, প্রস্তুতির দিক থেকে দেখলে, আমি মনে করি, আমাদের হাতে থাকা সুবিধাগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে; যেমন, ভিডিও অ্যানালাইসিস বা এখানকার চারপাশের পরিবেশ, যা বেশ সতেজ। আমরা আজ বিকেলে হাঁটতেও বেরিয়েছিলাম। আজ আমরা ফুটবলে একটা কিক দেইনি ঠিকই, তবে আমার মনে হয় না, এটা আমাদের জন্য কোনো অসুবিধা তৈরি করবে। এই বিরতিটা সবাইকে কিছুটা সময় দিয়েছে ঘটে যাওয়া বিষয়টি নিয়ে ভাবার এবং উপলব্ধি করার যে, জীবন কখনো কখনো কতটা ছোট এবং নিষ্ঠুর হতে পারে।”
প্রিয়জন হারানোর শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে, ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে দল নেপালের বিপক্ষে খেলতে নামবে বলেও বিশ্বাস বাটলারের।
“আমি মেয়েদের ঠিক এটাই বলছিলাম যে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেদের প্রস্তুত করা এবং ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। মূল চ্যালেঞ্জটা হলো দুঃখ, মর্মান্তিক ঘটনা এবং বিশেষ করে আমরা যে পরিস্থিতিতে আছি, সেই শোককে ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরিত করা। কাজটা মোটেও সহজ নয়। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই মেয়েরা মাঠে গিয়ে দারুণ পারফরম্যান্স দেখানোর সক্ষমতা রাখে।”
“এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কাঙ্ক্ষিত ফলাফল, অর্থাৎ জয় তুলে আনা। আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব না, আমরা জয়ের জন্যই ঝাঁপাব। আমরা কোনো চেষ্টার ত্রুটি রাখব না এবং একটি ইতিবাচক ও আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়েই মাঠে নামব।”
ভারত ম্যাচের পর এক দিনের রিকভারি, এরপর আজকের অনুশীলনও হয়নি। ফলে, নেপাল ম্যাচের একাদশ সম্পর্কে ধারনা পাওয়া কঠিন। অবশ্য ভারতের বিপক্ষে হারের পর বাটলার তীর্যক সমালোচনায় বিঁধেছিলেন দলকে। মাঝমাঠে মনিকা-মারিয়ার জুটি না জমায় আক্রমণভাগে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর বলের জোগান গিয়েছিল কমে। দুই উইং ধরে ঋতুপর্ণা চাকমা ও শামসুন্নাহার জুনিয়রও পারেননি আক্রমণের ঝড় তুলতে। সেমি-ফাইনালে পা হড়কানোর সুযোগ নেই বলেই কোচ মারিয়া-ঋতুপর্ণাদের কাছে চাইলেন আগ্রাসী ফুটবল।
“আমরা আগেও নেপালের বিপক্ষে খেলেছি। অনূর্ধ্ব-২০ দলেও তাদের বিপক্ষে খেলা হয়েছে। আমি তাদের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে চিনি। তারা কীভাবে খেলে তা আমি দেখেছি, আমরা আমাদের হোমওয়ার্কও সেরে রেখেছি। তবে সত্যি বলতে, আমি নেপালকে নিয়ে চিন্তিত নই। আমার মনে হয়, বিষয়টা হচ্ছে, আমাদের নিজেদের খেলার মান বাড়াতে হবে। মাঠে পারফর্ম করতে হবে।”
“আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের অবশ্যই ইতিবাচক থাকতে হবে এবং এমন একটি ছকে এগিয়ে যেতে হবে যেন, আমরা মাঠে গিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারি। যদি বা কিন্তু-ভেবে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের অনেক বেশি গতিশীল ও মনোযোগী হতে হবে এবং একটি আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামতে হবে।”