চ্যাম্পিয়ন্স লিগ
Published : 10 Apr 2026, 03:10 PM
বিশ্বকাপের মঞ্চে কলম্বিয়া কখনোই কোনো বড় নাম ছিল না, নয় তারা এবারও। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাটিতে তাদের সর্বোচ্চ সাফল্যও আহামরি কিছু নয়। তবে, এবার তাদের উইংয়ে আছেন এমন একজন, যার সামর্থ্য আছে যেকোনো ম্যাচে ব্যবধান গড়ে দেওয়ার- তিনি হলেন লুইস দিয়াস।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন কলম্বিয়ার ফরোয়ার্ড লুইস দিয়াস।
দলগত পারফরম্যান্সে এবং বিশেষ করে এই বায়ার্ন মিউনিখ তারকার দারুণ স্কোরিং সামর্থ্যে ভর করে আসছে বিশ্বকাপে নিজেদের পুরনো পারফরম্যান্সকে ছাপিয়ে নতুন ছাপ রাখার স্বপ্ন দেখছে লাতিন আমেরিকার দলটি।
ফুটবল অঙ্গনে দিয়াসের পথচলা ও অর্জন
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ক্যারিয়ারে যে গতি আর ছন্দে এগিয়েছেন, যে ক্লাবেই গেছেন সেখানেই সাফল্য পেয়েছেন এবং অনেক অনেক ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মধ্য দিয়ে নিজেকে সুপারস্টারদের কাতারে তুলে এনেছেন দিয়াস।
কলম্বিয়ার শহর বাররাঙ্কাসের ছোট্ট ছেলেটির পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু স্বদেশের ক্লাব বাররাঙ্কিইয়ায়, এটারই মূল ক্লাব আতলেতিকো জুনিয়রে প্রথম শিরোপার স্বাদ পান তিনি। সেখানে দুই বছরের অধ্যায়ে বেশ কয়েকবার ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন দিয়াস।
সেই যে শুরু, এরপর তিনি যেখানেই গেছেন, শিরোপা জিতেছেন সবখানে; পর্তুগালের পোর্তোয়, ইংল্যান্ডের লিভারপুলে এবং এখন জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখে।

দুর্দান্ত ড্রিবলিং আর গতিতে প্রতিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড়কে পরাস্ত করার সৌন্দর্য্য দিয়ে অল্প বয়সেই সবার নজর কাড়েন দিয়াস। আতলেতিকো জুনিয়রে একবার করে কোপা কলম্বিয়া ও কলম্বিয়ান সুপার লিগ এবং দুইবার শীর্ষ পর্যায়ের লিগ শিরোপা জয় করেন তিনি।
এরপরই ইউরোপে পাড়ি জমান দিয়াস, যোগ দেন পোর্তোয়। ক্লাবটির জার্সিতে ১২৫ ম্যাচ খেলে ৪১টি গোল করেন তিনি এবং জয় করেন দুবার শীর্ষ লিগসহ মোট চারটি শিরোপা। ওই উজ্জ্বল পারফরম্যান্সের পরই, তাকে সাড়ে চার কোটি ট্রান্সফার ফি দিয়ে দলে টানে লিভারপুল।
প্রিমিয়ার লিগের দলটিতে শুরুটা যদিও তার আশানুরূপ হয়নি। ২০২২-২৩ মৌসুমে দীর্ঘদিন হাঁটুর চোটে বাইরে থাকতে হয় তাকে। সেই ধাক্কা সামলে সময়ের সঙ্গে নিজেকে মেলে ধরেন তিনি; দলটিতে নানা সময়ে মোহামেদ সালাহ, সাদিও মানে, কোডি হাকপো ও দিয়োগো জটাদের সঙ্গে জুটি বেঁধে ছড়িয়েছেন আলো।
লিভারপুলে তার সেরাটা দেখা যায় ২০২৪-২৫ মৌসুমে। প্রিমিয়ার লিগে আগের চারবারের চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটির আধিপত্য ভেঙে ট্রফি উঁচিয়ে ধরে অ্যানফিল্ডের দলটি এবং তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন দিয়াস। ওই মৌসুমে সব মিলিয়ে তিনি ১৭টি গোল ও আটটি অ্যাসিস্ট করেন।
ওই সাফল্য উপভোগের দুই মাসের মধ্যে বায়ার্ন মিউনিখের ডাকে সাড়া দিয়ে জার্মানিতে পাড়ি জমান দিয়াস এবং সেখানে পরের মাসেই পেয়ে যান আরেকটি শিরোপার স্বাদ, জার্মান সুপার কাপ।
মিউনিখের ক্লাবটিতে গিয়ে যেন নিজের স্কোরিং সামর্থ্যের গভীরতা খুঁজে পেয়েছেন দিয়াস। সতীর্থদের গোলেও নিয়মিত অবদান রাখছেন তিনি।
বায়ার্নের জার্সিতে এখন পর্যন্ত সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪০ ম্যাচে ২৩টি গোল ও ১৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন ২৮ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। তার দল বুন্ডেসলিগা জয়ের খুব কাছাকাছি আছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও শিরোপার পথে ছুটছে দলটি।
ক্লাবের মতো জাতীয় দলে কোনো ট্রফি জিততে না পারলেও, তার ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ঝলক দেখা গেছে কয়েকবার। ২০২১ কোপা আমেরিকায় চার গোল করে লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন দিয়াস। প্রতিযোগিতাটির ২০২৪ আসরেও দলকে ফাইনালে তুলতে রাখেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা, করেন দুটি গোল।
আর এবারের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মোট সাতটি গোল করেছেন দিয়াস; জালের দেখা পেয়েছেন পেরু, চিলি, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে।
সতীর্থ ও কোচদের কথায় লুইস দিয়াস
“অগোছালো সৃষ্টিশীলতাই তার বৈশিষ্ট্য। প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে বা তার আশেপাশে গিয়ে সে খুব বেশি চিন্তা করে না; নিজের সহজাত ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার চেষ্টা করে। (আক্রমণে) যখন একজন ছুটে আসে, তখন তাকে ট্যাকল করার চেষ্টাটা কেমন হয়, আমি জানি; ঠিক যখন আপনার মনে হবে যে এটাই সঠিক সময় এগিয়ে যাওয়ার এবং বল কেড়ে নেওয়ার, ঠিক তখন তারা বলে অতিরিক্ত একটা ছোঁয়া দেয় অথবা অন্যদিকে ঘুরে যায়। আর লুচো (দিয়াস) ঠিক এটাই করে।”
“আপনার মনে হতে পারে, আক্রমণ হয়তো শেষ; কিন্তু তখন হঠাৎ করেই আপনি নিজেকে এমন এক পরিস্থিতিতে পাবেন যখন দেখবেন সে গোলমুখে ছুটে যাচ্ছে অথবা তাকে ফাউল করে আটকাতে হচ্ছে। অবশ্যই লুচো খুবই চালাক, তবে সে ওইরকম অপ্রথাগত ফুটবল খেলতেই পছন্দ করে, আর এটাই তাকে ভয়ঙ্কর করে তোলে।”
- ভেসোঁ কম্পানি
“খেলার সময় তার মুখে একটা হাসি লেগে থাকে- সে এমনই। মাঠে থাকতে পারলেই সে খুশি। ফুটবল কিংবা জীবনের যেকোনো পেশায় এই আনন্দ আপনি হারাতে চাইবেন না। লুইস বিশ্বের যেকোনো জায়গায় খেলতে পারে…ইতোমধ্যে সে এর প্রমাণ দিয়েছে। সে জাতীয় দলে আছে এবং সেখানেও সে নিজেকে প্রমাণ করেছে। সে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমরা সবাই জানি ফুটবল কেমন, কিন্তু সে বিশ্বের সবখানে খেলতে পারে।”

- কার্লোস ভালদেরামা
“তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেশ ভালো, সে একদম মাটির মানুষ। আশা করি, সে কিছু মেজর শিরোপা জিততে পারবে। (তাকে দলে পেয়ে) আমি উচ্ছ্বসিত এবং আশা করি, লুচো দিয়াসের মতো আরও খেলোয়াড় দেখতে পাব।”
- হামেস রদ্রিগেস
“আমি সত্যিই তাকে পছন্দ করি। তার মুভমেন্ট দারুণ এবং সে মাঠে সর্বোচ্চটা দেয়। সে একজন গোলস্কোরার ও সুযোগ তৈরি করে। সে আধুনিক ফুটবলের আদর্শ উদাহরণ। স্বীকার করতেই হবে, তাকে আমি খুব পছন্দ করি।”
- আর্সেন ভেঙ্গার (২০২২ সালে এই মন্তব্য করেন)
পরিসংখ্যানের আলোয় লুইস দিয়াস
• ২০২১ কোপা আমেরিকায় লিওলেন মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন লুইস দিয়াস। ওই আসরে কলম্বিয়ান তারকা চারটি গোল করেন; গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে ও সেমি-ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটি করে এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে দুটি গোল করেন তিনি।
• এবারের লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বলিভিয়ার মিগেল তেরসেরোসের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাতটি গোল করেন দিয়াস। তার ওপরে কেবল মহাতারকা মেসি।
• জাতীয় দলের হয়ে ৭১ ম্যাচে ২১ গোল করে কলম্বিয়ার ইতিহাসের চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতা দিয়াস। ১০৫ ম্যাচে ৩৬ গোল করে এই তালিকার শীর্ষে রাদামেল ফালকাও, ১২৩ ম্যাচে ৩১ গোল করে দুইয়ে হামেস রদ্রিগেস ও ৬৮ ম্যাচে ২৫ গোল করে তৃতীয় স্থানে আর্নোল্দো ইগুয়ারান।
২০২৬ বিশ্বকাপে দিয়াস ও কলম্বিয়ার প্রত্যাশা
বাছাইপর্ব উতরাতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি কলম্বিয়া। ফলে স্বপ্নের এই মঞ্চে পা পড়েনি দিয়াসের। এবার তার সেই অপূর্ণতা দূর হতে যাচ্ছে।
শক্তির বিচারে ফেভারিটদের কাতারে নয় কলম্বিয়া। তবে ফেভারিটদের নাড়িয়ে দেওয়ার এবং টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দেওয়ার সক্ষমতা যে দলটির ভালোমতোই আছে, সেটা তারা ভালোমতোই জানে। আর সেই লক্ষ্যে ছুটে যাওয়ায় তাদের মূল লক্ষ্য এবং সেই অভিযানে দিয়াস হতে পারেন সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার সর্বোচ্চ সাফল্য ২০১৪ আসরে কোয়ার্টার-ফাইনাল খেলা। আবার তেমন কিছু করে দেখাতে কিংবা নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে আগামী ১৭ জুন উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু করবে কলম্বিয়া। ‘কে’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ পর্তুগাল ও ডিআর কঙ্গো।