উত্তাপের সুপার ক্লাসিকোয় ব্রাজিলকে হারাল আর্জেন্টিনা

টানা তৃতীয় হারের তেতো স্বাদ পাওয়া ফের্নান্দো জিনিসের দল নেমে গেল ষষ্ঠ স্থানে।

স্পোর্টস ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Nov 2023, 03:01 AM
Updated : 22 Nov 2023, 03:01 AM

ম্যাচ শুরুর আগেই স্ট্যান্ডে তুমুল মারামারি। গ্যালারি ঠাণ্ডা হলে প্রায় আধ ঘণ্টা পর মাঠে গড়াল লড়াই। প্রথম অর্ধে দুই ফুটবল পরাশক্তির লড়াই যদিও হলো সাদামাটা। বিরতির পর জমল দ্বৈরথ। আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিলেন নিকোলাস ওতামেন্দি। লাল কার্ড পেলেন ব্রাজিলের ওয়েলিংতন। ঘটনাবহুল ম্যাচে একমাত্র গোলটি আগলে রেখে মারাকানায় আবারও জয়ের উৎসবে মাতল আর্জেন্টিনা।

রিও দে জেনেইরোর ঐতিহ্যবাহী মারাকানা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল সাড়ে ছয়টায় শুরু হওয়ার কথা ছিল সুপার ক্লাসিকোর। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় নির্ধারিত সময়ে তা হয়নি। পরে ম্যাচটি ১-০ গোলে জিতল আর্জেন্টিনা।

২০২৬ বিশ্বকাপের লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইয়ে টানা চার জয়ের পর সবশেষ ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলকে হারিয়ে জয়ে ফেরা লিওনেল স্কালোনির দল ছয় ম্যাচে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষ স্থান মজবুত করল।

ব্রাজিলের দুঃসময় বাড়ল আরও। টানা তৃতীয় হারের তেতো স্বাদ পাওয়া ফের্নান্দো জিনিসের দল ৭ পয়েন্ট নিয়ে নেমে গেল ষষ্ঠ স্থানে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাছাইয়ের পথচলা রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে গেল।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ে নিজেদের মাঠে এই প্রথম হারল ব্রাজিল। শেষ হলো নিজ আঙিনায় টানা ৬৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার যাত্রা। ২০০১ সালের পর বাছাইয়ে প্রথমবারের মতো টানা তিন ম্যাচও হারল তারা। সব মিলিয়ে এবারের বাছাইয়ে জিনিসের দল জয়হীন থাকল টানা চার ম্যাচ।

ম্যাচ শুরু হতে তখন কিছুক্ষণ বাকি ছিল, চলছিল ব্রাজিলের জাতীয় সঙ্গীত। ঠিক ওই সময় স্ট্যান্ডে দুই দলের সমর্থকরা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশ দ্রুত ছুটে গেলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিল না। পুলিশের সঙ্গেও লেগে যায় দর্শকদের। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটির সূত্রপাত কী থেকে, তা অবশ্য পরিষ্কার নয়। তবে পরিস্থিতি চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষা করে সতীর্থদের নিয়ে মাঠ ছাড়েন লিওনেল মেসি। সেসময় ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা অবশ্য ছিলেন মাঠেই। রেফারিদেরও অপেক্ষা করতে দেখা যায়। গ্যালারি ঠাণ্ডা হলে প্রায় আধ ঘণ্টা পর দল নিয়ে মাঠে ফিরেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। শুরু হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের হাইভোল্টেজ ম্যাচটি।

নেইমার, ভিনিসিউস জুনিয়র, কাসেমিরো, এদেরসন, দানিলো, রিশার্লিসন এবং এদের মিলিতাও- নিয়মিত একাদশের এই সাত জনকে চোটের কারণে না পাওয়ায় ব্রাজিলের শক্তি কমে। কিন্তু দমে যায়নি তারা। শুরু থেকে তারা চ্যালেঞ্জ জানাতে থাকে আর্জেন্টিনাকে; যদিও শক্তি নির্ভর খেলছিল ফের্নান্দো জিনিসের দল। প্রথমার্ধে তাই ২২টি ফাউলের মধ্যে ১৬টিই ব্রাজিলের করা।

এ অর্ধে দুই পক্ষের খেলায় ছিল না চেনা ধার। বলের নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা, তবে তিনটি প্রচেষ্টার কোনোটাই লক্ষ্যে রাখতে পারেনি তারা। ব্রাজিলের চার শটের একটি ছিল লক্ষ্যে।

৩৩তম মিনিটে বিপদ হতে পারত আর্জেন্টিনার। বক্সের ঠিক সামনে ব্রাজিলের এক খেলোয়াড় বল পাওয়ার আগেই দ্রুত ছুটে এসে হেডে ক্লিয়ার করেন এমিলিয়ানো মার্তিনেস। চার মিনিট পর রাফিনিয়ার ফ্রি কিক যায় ক্রসবারের উপর দিয়ে।

৪৩তম মিনিটে কর্নারের পর বক্সের ঠিক বাইরে বল পেয়ে গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির বুলেট গতির ভলি এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে কর্নার হয়ে যায়। বিরতির আগে বলার মতো একমাত্র আক্রমণ ছিল এটিই!

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ দিতে থাকে ব্রাজিল। গাব্রিয়েল জেসুস, রাফিনিয়ারা দুই উইং ধরে বক্সে ঢোকার চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু আকুনা, মোলিনাদের দৃঢ়তায় সুবিধা করতে পারছিলেন না তারা। পোস্টের নিচে মার্তিনেসেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছিল না তেমন কঠিন পরীক্ষার।

৫৪তম মিনিটে সতীর্থের লং পাস পেয়েছিলেন রাফিনিয়া; গায়ের সঙ্গে সেঁটে থাকা আকুনাকে পেছনে ফেলে শটও নিয়েছিলেন কাছের পোস্টে। পথ আগলে দাঁড়ান মার্তিনেস। গোলের অপেক্ষা বাড়ে বাছাইয়ে গত তিন ম্যাচ জয়হীন থাকা ব্রাজিলের।

তিন মিনিট পর দারুণ সেভে আর্জেন্টিনার ত্রাতা মার্তিনেস। দুই ডিফেন্ডারের ফাঁক গলে বল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া জেসুস ঠিকঠাক শট নিতে পারেননি, বল চলে যায় ফাঁকায় থাকা মার্তিনেল্লির পায়ে। তার শট ঝাঁপিয়ে আটকান গোলরক্ষক।

৬৩তম মিনিটে মারাকানার গ্যালারি স্তব্ধ করে দিয়ে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। জিওভান্নি লো সেলসোর কর্নারে অনেকটা লাফিয়ে করা হেডে জাল খুঁজে নেন ওতামেন্দি। একটু পরই আকুনাকে তুলে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে নামান আর্জেন্টিনা কোচ।

৭৭তম মিনিটে দুটি পরিবর্তন আনেন স্কালোনি। মেসিকে তুলে আনহেল দি মারিয়াকে নামান। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে মারাকানায় এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের একমাত্র গোলেই জিতেছিল আলবিসেলেস্তারা। হুলিয়ান আলভারেসের বদলি নামেন লাউতারো মার্তিনেস।

৮১তম মিনিটে আরেক ধাক্কায় ব্রাজিল কোণঠাসা হয়ে পড়ে আরও। রদ্রিগো দে পলের সঙ্গে বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লড়াই চলছিল ওয়েলিংতনের। সেই লড়াইয়ে জিততে না পেরে প্রতিপক্ষকে ধাক্কা মেরে লাল কার্ড দেখেন তিনি। ব্রাজিল পরিণত হয় দশ জনের দলে। সেলেসাও সমর্থকদের অনেককে মাঠ ছাড়তে দেখা যায় তখন।

এরপরও যারা গ্যালারিতে ছিলেন আশা নিয়ে। তাদের সে আশাও শেষ হয়ে যায় দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে দগলাস লুইসের নিচু শট প্রথম দফায় আটকানোয় পর দ্বিতীয় চেষ্টায় মার্তিনেস গ্লাভসে জমালে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে নিজেদের মাঠে প্রথম হারের বিষাদ সঙ্গী হয় ব্রাজিলের।

বলিভিয়াকে ৩-০ গোলে হারানো উরুগুয়ে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে আছে দ্বিতীয় স্থানে। আর প্যারাগুয়ের মাঠে ১-০ গোলে জয়ী কলম্বিয়া ১২ পয়েন্ট নিয়ে আছে তিন নম্বরে।