Published : 28 Jul 2026, 10:59 AM
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বকাপকে ঘিরে সমালোচনার ঝড় থামেনি। সেই সমালোচকদের দিকেই এবার পাল্টা তোপ দাগলেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ফিফা সভাপতির দাবি, ‘বিশ্বের সেরা আয়োজন’ উপহার দেওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা ও মিথ্যা গুজব’ ছড়ানো হচ্ছে।
ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ১৫টি স্লাইডের মাধ্যমে এই বার্তা প্রকাশ করা হয়, যা ফিফার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও পোস্ট করা হয় এবং ফিফার কমিউনিকেশন দলের মাধ্যমে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে বিতরণ করা হয়।
ইনফান্তিনোর বার্তায় বলা হয়, “আমরা কোনো সহিংসতা বা অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হইনি, শতভাগ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পেয়েছি, ছিল শুধু আনন্দ আর সুখ!”
গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য ঘুষ’ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন মার্কিন প্রতিনিধি জেমি রাসকিন (ডি-মেরিল্যান্ড)। এর পরদিন ফিফা সভাপতির এই জবাব এলো।
বিশ্বকাপে এবার কয়েকটি দল দল এবং সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার নিয়ে একাধিক সমস্যা ছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে বহু সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না পারলেও চারটি দেশ—ইরান, হাইতি, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্ট—তাদের ম্যাচগুলো খেলেছে।
ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি তার ফেডারেশনের সদস্যদের ভিসা ও চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বকাপকে একটি ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
দা অ্যাথলেটিকের তথ্যমতে, নকআউট পর্বে একুয়েডরের বিপক্ষে মেক্সিকোর জয়ের পর মেক্সিকো সিটিতে উদযাপনের সময় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া চারজনের ঘটনাটিও ইনফান্তিনোর বার্তায় উপেক্ষা করা হয়েছে।
এবার বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকে কোনো সংবাদ সম্মেলন করেননি ইনফান্তিনো। তার এবারের বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারাইন বালোগনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের তুমুল আলোচিত বিতর্কটিকেও অবজ্ঞার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই নিষেধাজ্ঞাটি স্থগিত করে এবং পরে ট্রাম্প বলেন যে, তিনি ব্যাপারটি পর্যালোচনার জন্য ইনফান্তিনোকে ফোন করেছিলেন, যা ইনফান্তিনো অস্বীকার করেন।
“সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কয়েকটি সিদ্ধান্তে আপনাদের অসন্তোষ বোধগম্য, কিন্তু অনুগ্রহ করে সর্বজনীন নথিপত্র দেখুন: এই ধরনের সিদ্ধান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লীগে খুবই সাধারণ ঘটনা। প্রকৃতপক্ষে, রেফারিদের ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্ত বা ‘অদ্ভুত’ শাস্তিমূলক রায়, যেমন—সম্ভাব্য ভুল লাল বা হলুদ কার্ড দেখানো, অথবা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের নিষিদ্ধ না করার পরবর্তী সিদ্ধান্ত—বিশ্বের কয়েকটি বড় লীগে নিত্যনৈমিত্তিক এবং ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।”
২০২৬ বিশ্বকাপের আগে, টুর্নামেন্ট চলাকালীন এবং তারপর থেকে উদ্ভূত অন্যান্য সমস্যার পাশাপাশি, নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি, টেক্সাস এবং ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলরা টুর্নামেন্টের টিকিটের মূল্য নিয়ে ফিফার বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন।
রাসকিন হাউস জুডিশিয়ারি কমিটির সামনে ইনফান্তিনোর উপস্থিতি চাইছেন, যদিও হাউসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যালঘু শক্তি হওয়ায় তার সমন জারির ক্ষমতা নেই।
রাসকিন অনুরোধ করেছেন যে, ইনফান্তিনো যেন কংগ্রেসের কাছে ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তার প্রশাসনের সদস্য, বা তাদের পরিবারের সদস্য, অথবা তাদের সঙ্গে যুক্ত কোনো সংস্থা, যেমন দা ট্রাম্প অর্গানাইজেশনকে দেওয়া যেকোনো মূল্যবান জিনিসের (যার মধ্যে অর্থ হস্তান্তর, উপহার, পুরস্কার, সম্মাননা বা জনসমক্ষে উপস্থিতি অন্তর্ভুক্ত) একটি তালিকা’ প্রকাশ করেন।
টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি পর্বজুড়ে ট্রাম্প এবং ইনফান্তিনোর মধ্যে চোখে পড়ার মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় ছিল এবং গত বছর এই ফুটবল সংস্থাটি ট্রাম্পকে প্রথম ফিফা শান্তি পুরস্কার প্রদান করে। সেই পুরস্কারটিকে ‘হাস্যকর ধরনের ভুয়া’ বলে অভিহিত করেছেন রাসকিন।
এছাড়াও ইনফান্তিনোকে রাসকিন যা যা লিখেছেন, সেখানে ফুটে উঠেছে আরও অভিযোগ।
“আপনি ট্রাম্প টাওয়ারের ১৭ তলায় একটি অফিস স্পেস ভাড়া নিয়েছেন — এমন একটি জায়গা, যেটির বার্ষিক ভাড়া হতে পারে ৬ লাখ ডলার — যদিও এটি শুধুমাত্র বিশ্বকাপের ৩৯ দিনের সময়কালে ব্যবহৃত হবে। এর মানে দাঁড়ায়, দিনে ১৫ হাজার ডলারেরও বেশি। এই পদক্ষেপগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনকে ফিফার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করার জন্য পরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে।
ফিফা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাজানো সাম্প্রতিক এই লেনদেনটি কোনো ক্ষতিহীন অপরাধ নয়। এটি আমেরিকানদের ক্ষতি করে। ট্রাম্প প্রশাসনে ফিফার নতুন পাওয়া বিশেষ সুবিধাকে এই ইঙ্গিত হিসেবে নিয়েছে যে, তারা তাদের গ্রাহকদের ঠকাতে পারে, বিশেষ করে বিশ্বকাপের জন্য অবৈধভাবে অতিরিক্ত মূল্য আদায় এবং প্রতারণামূলক বিক্রয় কৌশল ব্যবহার করে।”
রাসকিনের চিঠির জবাবে দা অ্যাথলেটিক-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গেল সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন ট্রাম্পের।
“তুচ্ছ জেমি রাসকিন কেবল একজন বোকার চোখেই বুদ্ধিমান ব্যক্তি। আমেরিকান জনগণ এবং বিশ্বের জন্য যে ঐতিহাসিক কীর্তি স্থাপন করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ইতিহাসের অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট তা করতে পারতেন না।
তার সাহসী দূরদৃষ্টি এবং দৃঢ় নেতৃত্বের কল্যাণে, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শত শত কোটি ডলার রাজস্ব আয় করেছে, আয়োজক শহরগুলোতে ব্যাপক অর্থনৈতিক উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ভক্ত ও ক্রীড়াবিদের জন্য একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত ও নির্বিঘ্ন অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করেছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে সফল ক্রীড়া আয়োজনগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হবে।”