Published : 03 Aug 2023, 11:47 AM
ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, হালকা নাস্তা সেরে তৈরি হয়ে থাকা। কোচদের ডাক পড়লেই কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী স্টেডিয়ামের টার্ফে প্রস্তুতিতে নেমে পড়া। এরপর দুপুরে জিমনেশিয়ামে ঘাম ঝরানো, বিকালে ফের অনুশীলন। রৌদ-ঝড়-বৃষ্টি যা-ই হোক, চিশতি-চন্দনদের এই রুটিনের হেরফের নয়। যদিও পল থমাস স্মলি এখন আর নেই, কিন্তু বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের তত্ত্বাবধানে চলা এলিট একাডেমির কাজ থেমে নেই। কোচদের দাবি, আগের মতোই চলছে এর কার্যক্রম।
বলতে গেলে এই এলিট একাডেমি স্মলির পরিকল্পনার ফসল। উঠতি খেলোয়াড়দের তৃণমূল পর্যায় থেকে তুলে আনা, যত্নে-পরিচর্যায়-শাসনে গড়ে তোলা, জাতীয় দলের জন্য পাইপলাইনে খেলোয়াড়ের সরবরাহ পর্যন্ত রাখা-এমন অনেক স্বপ্ন নিয়ে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে পথচলা শুরু এলিট একাডেমির।
বাফুফের টেকনিক্যাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক ডিরেক্টর হিসেবে থাকা স্মলি এতদিন বাকিদের নিয়ে একাডেমির কাজ চালিয়ে নিয়েছেন। গত মাসের মাঝামাঝি বাফুফের সঙ্গে তার সম্পর্কে পড়েছে ছেদ। স্মলির অবর্তমানে একাডেমি কেমন চলছে, কী অবস্থায় আছে, তার খোঁজ নিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। প্রথম পর্বে থাকছে কোচদের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া, তাদের ভাবনাসহ আরও অনেক কিছু।
বর্তমানে ৫৬ জন উঠতি খেলোয়াড় আছে কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে চলা এই একাডেমিতে। আবাসিক এই একাডেমি চলছে ছয় কোচের তত্ত্বাবধানে -রাশেদ আহমেদ পাপ্পু, কাজী আলতাফ হোসেন, আবুল হোসেন, মেহেদী হাসান সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু ও শাহ আলম টুটুল।
আছেন একজন ফিজিও। কিন্তু খেলোয়াড়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনার ও মনোবিদ কোনোটাই নেই। বিস্ময়করভাবে, মনোবিদের কাজ করছেন স্থানীয় কোচেরাই!
আবাসন ব্যবস্থা অনেকটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর মতো। রুমের আকৃতির ওপর নির্ভর করে এক রুমে তিনটি বা চারটি করে বিছানা। সেখানেই রাত্রি যাপন। দিনভর সময় কাটে কখনও টার্ফে, কখনও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ভবনের সামনে থাকা জিমনেশিয়ামে।
এই সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে নিয়ে উঠতিদের প্রশিক্ষণ স্মলির রেখে যাওয়া ‘রেসিপি’ অনুযায়ীই চলছে বলে জানালেন একাডেমির প্রধান কোচের দায়িত্বে থাকা পাপ্পু।
“এটা ঠিক যে পল থাকলে একাডেমিটা আগের মতোই গোছানোভাবে চলত। তবে আমরা চেষ্টা করছি আগের মতো করে চালাতে। প্রতিটি বিষয় আগের মতো রাখার চেষ্টা করছি। ট্রেনিং, টাইমিং, ডেভেলপমেন্ট প্রক্রিয়া, সব আগের মতোই চলছে। একজন দিয়ে কিন্তু প্রতিষ্ঠান চলে না, একা কেউ কিছু করতে পারে না। এখানেও সব সেক্টরের লোক আছে কাজগুলো এগিয়ে নেওয়ার জন্য। বর্তমানে ৬ জন কোচ আছি, একজন ফিজিও আছেন। অনূর্ধ্ব-১৬ ও ১৯ টিমটাও বর্তমানে এখানে আছে। সবাই মিলেই এটা মেইনটেইন করছি।”

“এখানে যে কোচগুলো নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা জানে বলেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পল এতদিন কাজ করেছিলেন, তিনি কিন্তু এই স্টাফই রেখেছেন। এই কোচেরা সাবেক খেলোয়াড়, কেউ কেউ জাতীয় দলেও খেলেছে, কোচিং কোর্স করে এসেছে, প্রতিটি মুহূর্তে আমরা পড়ি, নিজেদের মধ্যে আমরা চ্যালেঞ্জে যাই, ফলে সেখানেও জানা-শোনার বিষয়ে শেয়ারিং হয়। এভাবে নিজেদের উন্নতির মধ্যে থাকছি আমরাও।”
কমলাপুরে গিয়ে দেখা গেল টার্ফ জুড়ে নানা ভাগে ভাগ হয়ে খেলোয়াড়দের নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কোচেরা। কেউ শুটিং নিয়ে ব্যস্ত, কেউ কাজ করছেন ডিফেন্ডারদের নিয়ে। গোলরক্ষকদের অনুশীলনও চলছে একই সঙ্গে। এই উঠতিদের নিয়ে প্রতিদিনের কাজের ধরন ব্যাখ্যা করলেন পাপ্পু।
“এখানে ডিফেন্স নিয়ে কাজ করার জন্য মিন্টু, আবুল আছে। ধরুন, তাদেরকে দুইটা গ্রুপ দেওয়া হলো, দেখা যাচ্ছে, একটু পর অদল-বদল করে দেওয়া হয়, যাতে করে দুই গ্রুপই দুই কোচের কাছ থেকে শিখতে পারে। বিগত দিনে হওয়া ম্যাচগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। সবকিছু নোট ডাউন করা হয়। ছেলেরা এক-একটা করে ভুল করবে, সমাধান হবে-এই হচ্ছে আমাদের কাজ। গোলরক্ষক থেকে শুরু করে ফরোয়ার্ড পর্যন্ত প্রতিটি বিভাগে প্রতিটি কোচই কাজ করছেন।”
“গ্রুপ ডিসকাশনও হচ্ছে। সম্মিলিতভাবে হচ্ছে সেগুলো। এরপর ছেলেদের কাছ থেকেও ফিডব্যাক নেওয়া হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, এক-দুজন বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে বুঝছে, তখন আমরা তার সঙ্গে আরও দু-তিনজন সতীর্থকে বসিয়ে দিয়ে বলছি, যেটা তুমি বুঝেছ, সেটা সতীর্থদের বুঝিয়ে দাও। এখানে ছেলেরাও ডায়েরি মেইনটেইন করে।”
আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিজেদের শরীরটাকে দেখভাল করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, ইনজুরির বিষয়ে সচেতন থাকা। এই বিষয়গুলো একজন উঠতি ফুটবলারের জন্য গড়ে দেবে সামনের পথচলার ভিত। কোচ আবুল জানালেন, পুষ্টিবিদের দেওয়া খাদ্যতালিকা অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে খাবার।
“ধরা যাক, ক্যাম্পে একটা ছেলে এসেছে, সে বলছে শাক-সবজি খায় না, এটা খায় না, ওটা খায় না। আমরা ওদেরকে বলি, ‘কেন খাও না? নিজের শরীরের জন্য এটা তোমাদেরকে খেতে হবে, রেস্ট টাইম মানতে হবে।’ পুষ্টিবিদের রেসিপি অনুসরণ করি আমরা।”
“সকালে ডিম, ব্রেড, জেলি, ফল, এক গ্লাস দুধের সঙ্গে ভাত ও সবজিও থাকে, যে যেটা খেতে চায়। দুপুরে মাছ বা মাংস (গরু কিংবা মুরগি) ও ভাত। বিকালের স্ন্যাকসে পাস্তা বা নুডুলস, ফল, রাতে মাছ বা মাংস, সবজি। ফল, দুধ, চা সবসময়ই থাকে।”
চোট এড়ানোর পথটা দেখিয়ে দেওয়ার কাজটি করেন ফিজিও কে এম সাকিব। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের চোট লুকানোর অভিযোগ অনেক পুরনো। তবে ফিজিও জানালেন, এই ছেলেরা সারাক্ষণ চোখের সামনে থাকায় তাদের পক্ষে চোট আড়াল করা সম্ভব নয় মোটেও।
“এখানে ছেলেরা কঠোর পরিশ্রম করে। তাদের যথেষ্ট শক্তি ক্ষয় হয়। ট্রেনিংয়ের পর নিয়মিত রিকভারি সেশন হয়। প্রস্তুতির সময় যে চোট পায়, সেগুলো নিয়মিত অ্যাসেসমেন্ট করি। যদি রিহ্যাবের প্রয়োজন হয়, জিমে রিহ্যাব করা হয়। যদি ইনজুরি আরও গুরুতর হয়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নেই। ওদের জন্য ডায়েট চার্ট করা আছে, সেগুলো নিয়মিত মেইনটেইন করা হয়। পাশাপাশি ইনজুরি প্রতিরোধক যে ব্যায়ামগুলো আছে, সেগুলোও নিয়মিত করানো হয়।”
“অকারণ স্লাইড দেওয়া, ডাইভ দেওয়া-এই বিষয়গুলোও আমরা পর্যবেক্ষণ করি। কখনও কখনও কারো মুভমেন্ট দেখে যদি মনে হয়, এই মুভমেন্টে তার লিগামেন্টে সমস্যা হতে পারে, ফ্র্যাকচার হতে পারে, সেটাও তাদেরকে সবসময় বলি। এখানে আসলে ইনজুরি লুকানোর কোনো সুযোগ নেই, যেহেতু সারাক্ষণই ওরা আমাদের সামনে থাকে, ওদের মুভমেন্ট দেখলেই আমরা ধরে ফেলি। এরপর বুঝিয়ে বলি, এগুলো তাদের ক্যারিয়ারের জন্য ক্ষতিকর।”
খেলোয়াড়দের জন্য আরও ক্ষতিকর বিষয় পাতানো ম্যাচ। ম্যাচ গড়াপেটার বিষবাষ্প দেশের ফুটবলে রয়ে গেছে এখনও। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগ এবং চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে পাতানো ম্যাচের অভিযোগ ওঠে প্রায়। আবুল জানালেন, এ নিয়ে সবসময় তরুণদের সতর্ক করেন তারা।

“এই কমলাপুর স্টেডিয়ামে অনেক খেলা হয়। আন্তর্জাতিক, ঘরোয়া অনেক ম্যাচ এখানে হয়, ছেলেরা প্রতিটি ম্যাচ দেখে। ম্যাচগুলো দেখে তারাই বুঝতে পারে, ম্যাচের মধ্যে কী হচ্ছে না হচ্ছে। তারাই আমাদেরকে বলে, ‘আজ মনে হয় ওরা…।’ ছেলেদের আমরা বলি, ‘যে যেমন কাজই করুক না কেন, সে হয়তো অন্য কাউকে বলে দেয়, এই খেলোয়াড়কে দিয়ে কাজ করিয়েছি। তখন কিন্তু তোমাদের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।’ এগুলো নিয়ে আমরা ছেলেদের বিভিন্নভাবে বোঝাই। তারা যথেষ্ট বুদ্ধিমান, সচেতন।”
এছাড়া ছোটখাট আরও অনেক বিষয় রয়েছে। সুশৃঙ্খল মানুষ হয়ে ওঠা, খেলাধুলার পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া, মাঠে-মাঠের বাইরের আচরণ কেমন হবে, তা শেখানোসহ আরও অনেক কিছু। চলার পথে উত্থান-পতনের সময়ে নিজেকে ধরে রাখার শিক্ষাটাও শেখানোর কথা জানালেন আরেক কোচ এবং এলিট ক্যাম্পের কমান্ডারের দায়িত্বে থাকা আলতাফ।
“মূলত এরা যেখান থেকে উঠে আসে, এদের একাডেমিক দিক বলুন, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড বলুন, সাধারণত খুব দরিদ্র পরিবার থেকে আসে। স্বচ্ছল পরিবার থেকে খুব কম ছেলেপেলেই আসে। ওদেরকে সবকিছুর আদ্যোপান্ত বোঝাতে হয় আমাদের। শৃঙ্খলা, নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া, অনুশীলনের পর করণীয়, ডাইনিংয়ে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, পর্যাপ্ত ঘুম কতটা জরুরি, নিজের বিছানা গুছিয়ে রাখা-এমন অনেক বিষয় আমাদের দেখতে হয়। কীভাবে আচার-আচরণ করতে হবে, কেননা এখানে বিভিন্ন রকম পরিবার থেকে আসে, তাদের জীবনের উত্থান-পতন আছে, অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সমস্যাও হয়, সেক্ষেত্রে তাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করার চেষ্টা করি।”
“ছেলেদের বোঝাতে চেষ্টা করি, এটা এলিট একাডেমি। যারা অসাধারণ, তাদেরই এখানে ট্রেনিং দেওয়া হয়, ওদের আমরা বোঝাই যে, ‘সাধারণ মানের হলো তো তোমরা এখানে আসতে পারতে না। তোমাদের মধ্যে অসাধারণ কিছু আছে বলেই এখানে আনা হয়েছে, সেহেতু তোমরা ওভাবেই চলবে।’ লেখাপড়ার দিকে অধিকাংশ খুবই পিছিয়ে, কিন্তু আমরা ওদের বলি, যখন তোমারা বিদেশি কোচের সঙ্গে কাজ করবে, তাদের ভাষা না বুঝলে সমস্যা, আসলে জীবনে চলার জন্য যা যা প্রয়োজন, চেষ্টা করি সবকিছু শেখানোর।”