শাহরিয়ার কবির: রাজনৈতিক পরিচয়ের ফৌজদারি পুনর্লিখন
ক্ষমতা পটপরিবর্তনের পর একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক ইতিহাস যখন নতুন আইনি ভাষায় পুনর্লিখিত হয়, তখন প্রশ্ন জাগে কোথায় প্রমাণ শেষ আর কোথায় বয়ানের রাজনীতি শুরু?
শাহরিয়ার কবিরের রাজনৈতিক পরিচয় তার ব্যক্তিগত ইতিহাসের বাইরে কোনো বিষয় নয়। লেখক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও মানবাধিকারকর্মী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন জনপরিসরে সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তার অবস্থান প্রকাশ্য। ইসলামপন্থী রাজনীতির কিছু শক্তির সঙ্গে তার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতও নথিবদ্ধ।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা তদন্ত ও প্রতিবেদন তৈরির প্রেক্ষাপটে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’-এর নথিপত্রে তার এই আটক, ‘অ্যান্টি-স্টেট অ্যাক্টিভিটিজ’ বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এবং পরবর্তীতে ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট কর্তৃক তার সেই আটকাদেশকে বেআইনি ঘোষণার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর সারা দেশে বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ সহিংস তাণ্ডব চলেছিল। তৎকালীন সময়ে ওই অঞ্চলগুলোতে হিন্দুদের জনসংখ্যা ছিল বেশ উল্লেখযোগ্য। তবে নির্বাচনের পর পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে হিন্দু নারীদের ওপর যৌনসহিংসতার ঘটনা ঘটে; এর ফলে অজস্র দেশ ত্যাগের ঘটনা ঘটেছে।
২০১৯ সালের অক্টোবরে দৈনিক সমকালে ভোলার লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচন-পরবর্তী সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একটি ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই ইউনিয়নে সহিংসতা চলেছিল ২০০২ সালের প্রথম ভাগ পর্যন্ত। সমকালের ওই প্রতিবেদন বলা হচ্ছে, লালমোহনের লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে গণধর্ষণের শিকার শাশুড়ি-পুত্রবধূ বিষ্ণুপ্রিয়া ও সুজাতা আর দেশে নেই। দেশে ছেড়ে গেছেন ধর্ষণের শিকার শেফালীও। খোঁজ পাওয়া যায়নি জয়ন্তীর। ১ অক্টোবরের ওই নির্বাচনের পর তিন দিনে দুই গ্রামের ২৪ জন নারী ধর্ষিত হয়েছিলেন। মামলা হয়েছিল মাত্র তিনটি এবং চূড়ান্ত সাজা হয়েছে তিনজনের। একসময় লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে হিন্দু ভোটার ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। বর্তমানে ভোটারের সংখ্যা হাজারেরও কম। প্রতি বছরই এই সংখ্যা কমছে। মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালে ভোলা জেলার মোট জনসংখ্যার ৪০ ভাগ ছিল সংখ্যালঘু, বর্তমানে তা ১০ ভাগের নিচে নেমে এসেছে।”
শাহরিয়ার কবির দেশ থেকে সংখ্যালঘুদের বিতাড়ন ঠেকাতে চেয়েছিলেন তখন। পরে ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের সমাবেশ ও এর আনুষঙ্গিক ঘটনাবলি নিয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ব্যানারে তিনি তদন্ত পরিচালনা ও একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেন। এ লক্ষ্যে সংগঠনটি মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করেছিল। মূলত এগুলোই তার অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস। আর সেই রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমির পাশে এখনকার চলমান ফৌজদারি কার্যক্রমকে রেখে বিচার করলে একটি বিশেষ বাস্তবতার দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রাজনীতি ও আদালতের চৌকাঠে ইতিহাসের অমীমাংসিত হিসাবগুলো যখন নতুন করে উঠে আসে, তখন অপরাধের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া আর স্রেফ আইনি নথির পাতায় কারও অভিযুক্ত হওয়া—এই দুয়ের পার্থক্য বোঝাটা জরুরি হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তা আবারও স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে।
গত বছরের ১৮ জুলাই শান্তিনগরের সিদ্ধেশ্বরী নিউ সার্কুলার রোডের এক ভবনের ১৪ তলায় অবস্থানকালে গুলিবিদ্ধ হন লিজা আক্তার নামের এক গৃহকর্মী; ২২ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে ৫ সেপ্টেম্বর রমনা থানায় এই মৃত্যুর ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলার ধারাবাহিকতায় ১৬ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে বনানীর বাসা থেকে শাহরিয়ার কবিরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৭ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে আদালত ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এরপর যাত্রাবাড়ী থানার রফিকুল ইসলাম হত্যা মামলাতেও তাকে আরও দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়—যে মামলাটি গঠিত হয়েছিল ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৯ জুলাই রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু এসবই ফৌজদারি মামলার প্রাথমিক প্রক্রিয়া, অভিযোগ ও বিচারিক কার্যক্রমের রেকর্ড মাত্র। অভিযোগ দায়ের হওয়া বা পুলিশি রিমান্ডের মুখোমুখি হওয়াই অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার চূড়ান্ত দলিল নয়। রিমান্ড কোনো অপরাধের সত্যতা নিশ্চিত করে না, এমনকি প্রাথমিক অভিযোগও কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার আইনি সিদ্ধান্ত হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত অভিযোগকারী পক্ষের দাবি আর বিচারে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্য কখনোই এক বিষয় নয়।
এর মধ্যেই ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই আইনি লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছে আরেক নতুন মাত্রা। চলতি ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) অভিযোগকারী পক্ষ শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে এবং আইসিটি-২ সেদিনই তা গ্রহণ করে। ৫ ও ৬ মে ২০১৩-এর ঘটনাবলিতে ৫৮টি হত্যার সংযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছে অভিযোগকারী পক্ষ, যার মধ্যে ৪১ জনের তালিকায় শাহরিয়ার কবিরের নামও রয়েছে।
২০০১ ও ২০১৩ সালে শাহরিয়ার কবিরের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল একেবারেই স্পষ্ট ও প্রকাশ্য। এখন সেই সময়ের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং ২০২৬ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগগুলো একই নথিপত্র বা রেকর্ডের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে দুটি তথ্য পাশাপাশি থাকলেই তাদের মধ্যে কোনো স্বয়ংক্রিয় কার্যকারণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় না। কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা কোনো আন্দোলনের বিরোধিতা ইতিহাস বা তথ্যের অংশ হতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড, ষড়যন্ত্র বা মানবতাবিরোধী অপরাধে তার ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে আরও একটি গভীর পর্যালোচনার স্তর প্রয়োজন। সেই স্তরটি হলো—ব্যক্তিগত অংশগ্রহণের প্রত্যক্ষ প্রমাণ। অর্থাৎ, কোনো যোগাযোগের প্রমাণ কি ছিল? কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল? কোনো সমন্বয় বা নির্দিষ্ট কাজ করা হয়েছিল? এবং সবচেয়ে বড় কথা, সেই দাবির সপক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো নথি বা সাক্ষ্যপ্রমাণ আদৌ আছে কি না?
শাহরিয়ার কবিরের ক্ষেত্রে আগের রাজনৈতিক সংঘাতের রেকর্ডও এই জায়গায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ২০০১–০৩ সালের আটক এবং তার বিরুদ্ধে তৎকালীন রাষ্ট্রীয় অভিযোগের ইতিহাস দেখায় যে রাজনৈতিক পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় অভিযোগের সম্পর্ক তার ক্ষেত্রে নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সেই রেকর্ড বর্তমান অভিযোগেরও সত্যতা প্রমাণ করে না। আবার বর্তমান অভিযোগও পুরোনো রাজনৈতিক সংঘাতকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয় না।
এই জায়গায় ‘ইউএন ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রারি ডিটেনশন'-এর ‘ওপিনিয়ন নম্বর ৪০/২০২৫' আলাদা গুরুত্ব পায়। জাতিসংঘের এই ওয়ার্কিং গ্রুপ ২০২৫ সালের ২৫–২৯ অগাস্ট অনুষ্ঠিত তাদের ১০৩তম অধিবেশনে শাহরিয়ার কবিরের বিষয়ে এই মতামত বা রায় গ্রহণ করে। নথিটিতে তার এই আটককে ‘আরবিট্রারি ডিটেনশন' (বা বেআইনি আটক) হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং আটকের আইনি ভিত্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ‘ফেয়ার ট্রায়াল সেফগার্ডস' (বা সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার সুরক্ষা)-সহ একাধিক মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আটকটির বৈধতা ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে এটি একটি স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন। একই ব্যক্তিকে ঘিরে এখন অন্তত তিন ধরনের ‘রেকর্ড' পাশাপাশি অবস্থান করছে: ফৌজদারি অভিযোগ, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং আটকসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক এই মূল্যায়ন। এগুলোকে একসূত্রে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করলে প্রতিটি তথ্যের প্রমাণমূল্যই বদলে যায়।
রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে যখন একজন ব্যক্তির পরিচয় নতুন আইনি ভাষায় পুনর্লিখিত হয়, তখন পরিচয়টি আর কেবল পরিচয় থাকে না। সেটি বয়ানের ভিত্তি হয়ে ওঠ, এমনকি অপরাধের শ্রেণিবিন্যাসের অংশও হয়ে উঠতে পারে। শাহরিয়ার কবিরের ক্ষেত্রে তাই শুধু এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয় যে তিনি কোন রাজনৈতিক অবস্থানে ছিলেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই অবস্থানকে বর্তমান অভিযোগের সঙ্গে কোন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বয়ান হতে পারে: এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক অপরাধের তদন্ত। অন্য বয়ান হতে পারে: এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ফৌজদারি কার্যক্রম। কোনো একটি বয়ান গ্রহণ করাই এখানে কাজ নয়। কাজ হলো কোন রেকর্ড কোন দাবিকে সমর্থন করে, কোনটি শুধু প্রেক্ষাপট দেয়, এবং কোথায় প্রমাণ শেষ হয়ে অনুমান শুরু হয়—সেটি আলাদা করা।
আনা নাসরীন: গীতিকার, সংগীতশিল্পী, সুরকার ও সংগীত পরিচালক।ইমেইল:aananasrin@gmail.com
