বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের বাঁকে বাঁকে ফেদেরারের যত অর্জন-কীর্তি

সুইস কিংবদন্তির বিদায় বেলায় তার সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারে ফিরে তাকানোই যায়।

আবু হোসেন পরাগবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Sept 2022, 07:14 PM
Updated : 15 Sept 2022, 07:14 PM

প্রায় তিন দশক আগে জন্মশহর বাসেলে কাজ শুরু বল বয় হিসেবে। টেনিস খেলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন শৈশবেই। ১৬ বছর বয়সে পা রাখেন পেশাদার টেনিসে। এরপর সময়ের পরিক্রমায় টেনিসকে রজার ফেদেরার নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে। দারুণ সব অর্জনে সমৃদ্ধ হয়েছে ক্যারিয়ার। গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড-কীর্তি। রাফায়েল নাদাল ও নোভাক জোকোভিচের সঙ্গে দ্বৈরথ যেন হয়ে গেছে রূপকথার অংশ। সুইস কিংবদন্তি সেই ক্যারিয়ারের ইতি টানতে যাচ্ছেন কদিন পর। বিদায় বেলায় তার আলো ঝলমলে ক্যারিয়ারে একবার ফিরে তাকানোই যায়।

এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিযোগিতামূলক টেনিসের বাইরে ৪১ বছর বয়সী ফেদেরার। ২০২১ সালের জুলাইয়ে উইম্বলডনের কোয়ার্টার-ফাইনালে হুবের্ত হুরকাজের বিপক্ষে হারের পর আর কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ তিনি খেলেননি। গত দুই বছরে তার হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হয়েছে তিনবার।

এসব ভাবনায় রেখেই ক্যারিয়ার আর প্রলম্বিত করতে চাচ্ছেন না টেনিসের এই মহাতারকা। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর শুরু হতে যাওয়া লেভার কাপ দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক টেনিসকে বিদায় জানানোর ঘোষণা বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেন ২০ বারের গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ী ফেদেরার।

ছেলেদের এককে রেকর্ড আটবার উইম্বলডন, ছয়বার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, পাঁচবার ইউএস ওপেন (সবগুলোই টানা, যা রেকর্ড), একবার ফরাসি ওপেন জিতেছেন ফেদেরার। বিদায়ের আগে ফিরে দেখা যাক তার দুই যুগের পথচলা।

১৯৯৮

মাত্র ১৬ বছর বয়সে পেশাদার টেনিসে ফেদেরারের অভিষেক হয় ১৯৯৮ সালে, সুইস ওপেনে। র‍্যাঙ্কিংয়ে তখন তার অবস্থান ছিল ৭০২ নম্বরে। প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনার লুকাস আর্নল্দ কেরের কাছে সরাসরি সেটে হারেন তিনি।

২০০০

প্রথমবার এটিপি ফাইনালে ওঠেন মার্সেইয়ে। সেখানে স্বদেশী মার্ক রোসেটের কাছে হেরে যান তিনি। পরে তার জন্মস্থান বাসেলে ফাইনালে পাঁচ সেটের লড়াইয়ে হারেন টমাস এন্কভিস্টের বিপক্ষে।

২০০১

প্রথমবারের মতো এটিপি শিরোপা জেতেন ফেদেরার। তবে সেবার তিনি সবার নজর কাড়েন মূলত উইম্বলডনের সেন্টার কোর্টে চতুর্থ রাউন্ডে পাঁচ সেটের লড়াইয়ে পিট সাম্প্রাসকে হারিয়ে। ওই হারে অল ইংল্যান্ড ক্লাবে সাম্প্রাসের টানা ৩১ ম্যাচ জয়ের ধরায় ছেদ পড়েছিল।

২০০২

প্রথম মাস্টার্স শিরোপা জেতেন তিনি হামবুর্গে। পরে আরেকটি জেতেন ভিয়েনায়। এই শিরোপা তিনি উৎসর্গ করেন তার প্রথম কোচ পিটার কার্টারকে, যিনি দুই মাস আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান।

২০০৩

ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের স্বাদ পান তিনি ২০০৩ সালে। উইম্বলডনের সেমি-ফাইনালে অ্যান্ডি রডিককে ও ফাইনালে মার্ক ফিলিপোসিসকে হারান তিনি। বছর শেষ করেছিলেন ৭৮ ম্যাচ জিতে।

২০০৪

বছর শুরু করেন প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপা জিতে। ২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার ওঠেন র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে।

মায়ামি ওপেনে ফেদেরার হারেন রাফায়েল নাদালের কাছে। এই দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ ছিল সেটিই।

পরে তিনি ধরে রাখেন উইম্বলডনের শিরোপা, ফাইনালে রডিককে হারিয়ে। এরপর লেটন হিউটনকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো চুমু আঁকেন ইউএস ওপেনের শিরোপায়।

২০০৫

সেবার ফেদেরার ধরে রাখেন উইম্বলডন ও ইউএস ওপেনের শিরোপা। দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম-সহ মোট ১১টি শিরোপা জিতে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বছর শেষ করেন র‍্যাঙ্কিংয়ের চূড়ায় থেকে।

১৯৩৭ থেকে ১৯৩৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডন বাজের পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে পরপর দুই বছর উইম্বলডন ও ইউএস ওপেন জয়ের কীর্তি গড়েন ফেদেরার।  

২০০৬

সেবার তিনি জেতেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, উইম্বলডন ও ইউএস ওপেন শিরোপা। সঙ্গে এটিপির সর্বোচ্চ ১২টি শিরোপা জিতে টানা তৃতীয়বারের মতো বছর শেষ করেন র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থেকে। আরও চারটি মাস্টার্স শিরোপাও ওই বছর জেতেন তিনি।

১৯৬৯ সালে রড লেভারের পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে সেবার বছরের চার গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনালে উঠেন তিনি। ফরাসি ওপেনের ফাইনালে হারেন রাফায়েল নাদালের কাছে।

ওই বছরই ফেদেরার প্রথমবার নোভাক জোকোভিচের মুখোমুখি হন। মন্টে কার্লো ওপেনে রাউন্ড অব ৬৪ এর লড়াইয়ে তিনি কোর্ট ছাড়েন জয় নিয়ে।

২০০৭

ওই বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, উইম্বলডন ও ইউএস ওপেন- তিনটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম ও আটটি শিরোপা জেতেন ফেদেরার। টানা চতুর্থবারের মতো বছর শেষ করেন র‍্যাঙ্কিংয়ে সবার ওপরে থেকে।

সেবার হামবুর্গের ফাইনালে তিনি হারান নাদালকে। থেমে যায় ক্লে কোর্টে নাদালের ৮১ ম্যাচের জয়যাত্রা। তবে ফরাসি ওপেনের ফাইনালে চার সেটের লড়াইয়ে নাদালের কাছে হেরে যান ফেদেরার, টানা দ্বিতীয়বারের মতো।

২০০৮

টানা পঞ্চমবারের মতো ইউএস ওপেন জেতেন ফেদেরার। সেই বছর মন্টে কার্লো, হামবুর্গ, ফরাসি ওপেন ও উইম্বলডনের ফাইনালে তিনি হারেন নাদালের বিপক্ষে। উইম্বলডনে পাঁচ সেটের মহাকাব্যিক সেই ফাইনালে শেষ সেটের ফয়সালা হয়েছিল ৯-৭-এ!

স্তানিস্লাস ভাভরিঙ্কার সঙ্গে জুটি বেঁধে ওই বছর বেইজিং অলিম্পিকে দ্বৈতে সোনা জেতেন ফেদেরার।

২০০৯

টানা তিন ফাইনালে নাদালের কাছে হারের পর ওই বছর প্রথমবার ফরাসি ওপেন জয়ের স্বাদ পান ফেদেরার। ষষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ারে চার গ্র্যান্ড স্ল্যামের সবগুলো জয়ের কীর্তি গড়েন তিনি। পরে গ্র্যান্ড স্ল্যামের সংখ্যা ১৫ তে নিয়ে যান উইম্বলডন জিতে। অল ইংল্যান্ড ক্লাবে সেটি ছিল তার ষষ্ঠ।

ওই বছরই নিজ শহর বাসেলে তিনি বিয়ে করেন মিরকা ভাভরিনকেকে।

ইউএস ওপেনে আগের পাঁচ আসরের চ্যাম্পিয়ন, প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৫ কোটি ডলার প্রাইজমানি ছাড়িয়ে যাওয়া ফেদেরার সেবার ফাইনালে হেরে যান আর্জেন্টিনার হুয়ান মার্তিন দেল পোর্তোর কাছে।

২০১০

অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতে গ্র্যান্ড স্ল্যামের সংখ্যা তিনি নিয়ে যান ১৬ তে। ২৮৫ সপ্তাহ র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকার পর জুন মাসে নেমে যান দুই নম্বরে। ফরাসি ওপেন ও উইম্বলডনে তার শিরোপা ধরে রাখার অভিযান থেমে যায় কোয়ার্টার-ফাইনালে। 

২০১১

অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের সেমি-ফাইনালে ফেদেরার হেরে যান জোকোভিচের বিপক্ষে। তবে ফরাসি ওপেনের শেষ চারে তিনি হারিয়ে দেন সার্বিয়ান খেলোয়াড়কে। থেমে যায় জোকোভিচের ৪৩ ম্যাচের জয়যাত্রা। পরে ফাইনালে আরও একবার নাদালের কাছে হারেন ফেদেরার।

২০১২

ফাইনালে অ্যান্ডি মারেকে হারিয়ে সপ্তম উইম্বলডন শিরোপা জেতার পরপরই র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে পিট সাম্প্রাসের ২৮৬ সপ্তাহের রেকর্ড ভেঙে দেন ফেদেরার।

২০১৩

সেবার তিনি শুধু একটি শিরোপা জিততে পারেন, ঘাসের কোর্টে। বছর শেষ করেন র‍্যাঙ্কিংয়ের ছয় নম্বরে থেকে।

ওই বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে তিনি উঠতে পারেন সেমি-ফাইনালে, ফরাসি ওপেনে শেষ আটে। উইম্বলডনে দ্বিতীয় রাউন্ডেই হেরে যান র‍্যাঙ্কিংয়ে ১১৬ নম্বরে থাকা খেলোয়াড়ের বিপক্ষে।

আর ইউএস ওপেন থেকে বিদায় নেন চতুর্থ রাউন্ডে। নিউ ইয়র্কে ১০ বছরের মধ্যে তার সবচেয়ে আগেভাগে বিদায় সেটি।

২০১৪

ফাইনালে ফ্রান্সকে ৩-১-এ  হারিয়ে প্রথমবারের মতো সুইজারল্যান্ডের হয়ে ডেভিস কাপ জয়ের স্বাদ পান ফেদেরার। 

২০১৫

সেই বছর তিনি ছয়টি শিরোপা জেতেন। তবে ইন্ডিয়ান ওয়েলস, রোম, উইম্বলডন, ইউএস ওপেন ও ওয়ার্ল্ড ট্যুর ফাইনালস- সবগুলোর ফাইনালে হেরে যান জোকোভিচের কাছে।

ব্রিজবেনের ফাইনালে জয় ছিল তার ক্যারিয়ারের হাজারতম জয়।

২০১৬

২০০০ সালের পর প্রথমবার ফেদেরার কোনো শিরোপা জিততে ব্যর্থ হন ২০১৬ সালে। ফেব্রুয়ারিতে তার বাম হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হয়। যার কারণে ওই বছর মাত্র সাতটি টুর্নামেন্টে খেলতে পারেন তিনি।

২০১৭

অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও উইম্বলডনে জেতেন ক্যারিয়ারের ১৮তম ও ১৯তম গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা। 

২০১৮

র‌্যাঙ্কিংয়ের ৪৫ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বের এক নম্বর হন তিনি ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে, ৩৬ বছর বয়সে।

অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার মারিন সিলিচকে হারিয়ে ফেদেরার গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপার সংখ্যা নিয়ে যান ২০-এ।

ম্যাচ পয়েন্ট থাকা সত্ত্বেও উইম্বলডনের কোয়ার্টার-ফাইনালে তিনি হেরে যান কেভিন অ্যান্ডারসনের কাছে৷

২০১৯

উইম্বলডনের ফাইনালে জোকোভিচের কাছে তিনি হেরে যান পাঁচ সেটের মহাকাব্যিক লড়াইয়ে।

ম্যাচের স্থায়িত্ব ছিল পাঁচ ঘণ্টার স্রেফ তিন মিনিট কম। টুর্নামেন্টটির ইতিহাসে দীর্ঘতম ফাইনাল এটি। শেষ সেটে টাইব্রেকে নিষ্পত্তি হয়েছিল ম্যাচের ফল।

২০২০

১৫তম বারের মতো অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের সেমি-ফাইনালে উঠে যান ফেদেরার। সেখানে তিনি হারেন জোকোভিচের কাছে। দুজনের এটি ছিল ৫০তম মুখোমুখি লড়াই।

কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে পরে বন্ধ হয়ে যায় খেলা। ওই সময়ে হাঁটুতে দুবার অস্ত্রোপচার করান ফেদেরার।

২০২১

তৃতীয় রাউন্ডের পর ফরাসি ওপেন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। জুলাইয়ে উইম্বলডনের কোয়ার্টার-ফাইনালে হেরে যান হুবের্ত হুরকাজের বিপক্ষে।

পরে নাম প্রত্যাহার করে নেন টোকিও অলিম্পিক থেকে।

২০২২

লেভার কাপ দিয়ে বিদায়ের ঘোষণা দেন ফেদেরার।

আরও যত অর্জন

# ফেদেরারের মোট শিরোপা ১০৩টি। উন্মুক্ত যুগে যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আর সর্বোচ্চ জিমি কনরসের ১০৯টি।

# ক্যারিয়ারে রেকর্ড ৩১০ সপ্তাহ র‍্যাঙ্কিংয়ের চূড়ায় ছিলেন ফেদেরার। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে ছাড়িয়ে যান নোভাক জোকোভিচ।

# ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৮ সালের অগাস্ট পর্যন্ত টানা ২৩৭ সপ্তাহ ফেদেরার র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ছিলেন। যেটি এখনও রেকর্ড।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক