ব্রাজিলে লুলা দ্য সিলভার বিজয়ের বৈশ্বিক গুরুত্ব
চরম দক্ষিণপন্থার আগ্রাসন রুখে দিয়ে ব্রাজিলে লুলার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন; কেবল একটি দেশের নির্বাচন নয়, এ বিজয় বিশ্বজুড়ে প্রগতিশীল শক্তির জন্য বড় স্বস্তি ও লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা।
ব্রাজিলে এক ব্যতিক্রমী নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় চতুর্থবারের মতো লুইস ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়লাভ কেবল ব্রাজিলের বা ওই অঞ্চলেরই নয়, বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। লুলা ৪০ লাখ ভোটের ব্যবধানে তার এক চরম দক্ষিণপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়েছেন। লুলার জীবন শুরু একজন শ্রমিক হিসেবে, যিনি কারখানার কাজ করতে গিয়ে তার একটি আঙুলও হারিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদবিহীন সেই তিনি আবার চতুর্থবারে কেবল ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টই হয়েছেন তা নয়, তিনিই ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয় রাউন্ডে জয়লাভ করলেন। তাকে নিয়ে আলোচনা সারা বিশ্বে। কেননা তিনি বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট—কথাটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার। সেও অনেকদিন আগে, ২০০৯-এ লন্ডনে জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে তিনি লুলা সম্পর্কে বলেছিলেন, “তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তি।”
২০১৮ সালে নোয়াম চমস্কি ব্রাজিলে কারাবন্দি লুলাকে দেখতে যান। তিনি সেসময় তার সম্পর্কে বলেছিলেন, বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বন্দি। চমস্কি বলেছিলেন, “একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজনের সঙ্গে প্রতিদিন তো আর দেখা হয় না।” লুলার রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, “লাতিন আমেরিকায় ও তার বাইরে পশ্চিমা মুঠির বাইরের স্বাধীন শক্তিসমূহকে সংঘবদ্ধ করতে ব্রাজিলের ভূমিকা তাদের পছন্দ নয়, যারা বিশ্বকে নিজের আধিপত্যের অধীনে রাখতে চায়।” (নোয়াম চমস্কি, I Just Visited Lula, the World’s Most Prominent Political Prisoner. A “Soft Coup” in Brazil’s Election Will Have Global Consequences, দ্য ইন্টারসেপ্ট, ২ অক্টোবর ২০১৮)
লুলার এবারকার নাটকীয় বিজয় সম্পর্কে দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবাদিক রেডি তিলহাবি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় ডেইলি ম্যাভেরিকে (Lula’s Brazil election win has given the world breathing space) লিখেছেন, “হ্যাঁ, ৫১.৭৫ শতাংশ ভোট নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে লুলার বিজয় স্বস্তি এনেছে। ব্রাজিলের জন্য। দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য। আফ্রিকার জন্য। দক্ষিণ গোলার্ধের জন্য। তাদের জন্য, যারা এখনও বিশ্বাস করে শ্রমিক, দরিদ্র ও বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের বাইরের দেশগুলোরও মনের কথা বলার অধিকার রয়েছে।”
লুলার বিজয় মোটেও সব সমস্যার সমাধান নয়। তবে এ বিজয় তার একারও নয়। বিশ্বে যারা মানবতা ও স্বাধিকারের পক্ষে লড়াই করছেন, এ বিজয় তাদের সবার। ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে যে ফ্যাসিবাদ এখন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম হুমকি, তার বিরুদ্ধে যেসব মানুষ জীবন বাজি রেখে লড়ছেন, এ বিজয় তাদেরও সবার। তিলহাবি লিখেছেন, “তারা একটি সরকারকে রক্ষা করেছেন, যাদের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে—ক্ষুধা, অসাম্য, জলবায়ু বিপর্যয় ও যুদ্ধ সমস্যার সমাধান সম্মিলিত রাজনৈতিক উদ্যোগ দাবি করে। এমন এক মুহূর্তে যখন নির্দয়তা শক্তির পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন এ বিজয় উদযাপন জরুরি।”
এ বিজয় উদযাপন হচ্ছে এভাবেই। ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্কদের অশুভ পরিকল্পনা রুখে দিতে সক্ষম হয়েছেন ব্রাজিলের ভোটাররা। চরম দক্ষিণপন্থি জাইর বোলসোনারোর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন সবার জানা। বর্তমানে তিনি অপরাধের জন্য ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত। তার ছেলে ফ্লাভিও বোলসোনারো জিতলে দেশটি আবার চরম দক্ষিণপন্থিদের হাতে চলে যেত, যার প্রভাব পড়ত অন্যান্য অঞ্চলে ও দেশেও। ইতিমধ্যে লাতিন আমেরিকার সাতটি দেশে দক্ষিণপন্থিদের পক্ষে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে; যে পালাবদলে ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থসহায়তা, নিষেধাজ্ঞা, সরাসরি হস্তক্ষেপ ইত্যাদি ভূমিকা পালন করেছে। লুলার বিজয় সেই ধারাবাহিকতায় বড় রকমের ছেদ ঘটালো।
দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা (২৬ অক্টোবর) তার সম্পাদকীয়তে তাই স্বাভাবিকভাবেই বলেছে, “ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা দ্য সিলভার এ বিজয় তার নিজের জন্য, তার দেশের জন্য ও বিশ্বের জন্য। ৮০ বছর বয়সী রাজনীতিক পরাজয়ের মুখ থেকে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন, চরম দক্ষিণপন্থার উত্থান রুখে দিয়েছেন ও এই গ্রহের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আমাজনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।”
সম্পাদকীয়টিতে আরও এক সত্য চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে এই বাক্যে: “ব্রাজিলের এই নির্বাচনি ফলাফলে বোলসোনারো পরিবারের পর সবচেয়ে বড় হার হয়েছে ট্রাম্পের।” সত্যি সত্যি লুলার এ বিজয় পৃথিবীর দুজন ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে দুঃখজনক হিসেবে হাজির হয়েছে। একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ফ্লাভিও, আরেকজন তার গুরু যুক্তরাষ্ট্রের ডনাল্ড ট্রাম্প। তারা দুজনের কেউ এটি মেনে নিতে পারছেন না। ট্রাম্পের ভাষায় নির্বাচনি এ ফল ‘ভয়ংকর’। ব্রাজিলিয়ান শিষ্য ও আমেরিকান গুরু উভয়েই বলে বেড়াচ্ছেন, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে! অন্যদিকে ব্রাজিলের সাধারণ জনগণের কাছে কিন্তু এ বিজয় উদযাপিত হয়েছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। সেভাবেই রাস্তায় রাস্তায় এটি উদযাপিত হয়েছে।
গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে লুলা তার প্রদত্ত ভাষণে নিজের আদর্শিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। বলেছিলেন, “একটি পরস্পর নির্ভরশীল বিশ্বে নেতৃত্ব প্রদান করার অর্থ হচ্ছে স্বদেশের স্বার্থের সঙ্গে মানবতার স্বার্থের সমন্বয়। এই বক্তব্য এমন একজনের, যে শান্তি ও স্বাধীনতাপ্রেমী একটি জাতির প্রতিনিধিত্ব করছে; যে সামরিক একনায়কত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে ও ক্যু থেকে তার দেশকে রক্ষা করেছে। এটা এমন একজন কারখানা শ্রমিকের বিশ্বাস, যে তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে ও ব্রাজিলে ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।”
ওই ভাষণে তিনি বর্তমান বিশ্বে সাহস, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতাসম্পন্ন যে ধরনের রাষ্ট্রনেতার প্রয়োজন, তার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইয়াসির আরাফাত ও আইজ্যাক রবিনের কথা। বলেন, “তারা অতীতকে চ্যালেঞ্জ করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা রচনা করেন। তারা ঘৃণার কাছে পরাজিত হননি। গাজায় নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে নেতানিয়াহু সরকারের সংঘটিত গণহত্যার যন্ত্রণা ও বেদনা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফিলিস্তিনিরা বহন করে যাবে।”
গণতন্ত্রের জন্য চরম হুমকি স্বরূপ যে দক্ষিণপন্থার রাজনীতির উত্থান ঘটেছে, এ সম্পর্কে তিনি বলেন, “গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত। আমরা আবার নির্বাচনি প্রক্রিয়াসমূহে বিদেশি হস্তক্ষেপ লক্ষ্য করছি। বিশ্বকে নিজ নিজ ক্ষমতা বলয়ে বিভক্ত করা ও কৌশলগত সম্পদ হস্তগত করার জন্য নয়া ঔপনিবেশিক আক্রমণ পরিচালনা অতীত রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য।”
ভাষণটি শেষ করেছেন লুলা এভাবে, “আমরা ঘরের ও বাইরের গণতন্ত্রের কোনো শত্রুকেই জনগণের ইচ্ছাকে নস্যাৎ করতে দেব না। ব্রাজিলের গণতন্ত্র ব্রাজিলের জনগণের। ব্রাজিল একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে বেঁচে থাকবে।”
লুলার বিজয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষত লাতিন আমেরিকায়, আফ্রিকায়, মধ্যপ্রাচ্যে প্রগতিশীল আন্দোলনে আশার সঞ্চার করেছে। ট্রাম্প-নেতানিয়াহু চক্রের অগ্রগতির পথে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। তবে লুলা একা এই ইউএস-ইসরায়েলি অপশক্তিকে রুখে দিতে পারবেন মনে করারও কোনো সুযোগ নেই। তবুও তার বিজয় থেকে বিশ্বের প্রগতিশীল শক্তির শেখার আছে অনেক কিছু।
আলমগীর খান: কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: alamgirhkhan@gmail.com
