২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের সমীকরণ বদলে দিল লুলার জয়

ট্রাম্প তার মিত্রদের ব্যবহার করে পুরো অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব বিস্তারে ‘ডনরো ডকট্রিন’ নামের কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছিলেন।

লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের সমীকরণ বদলে দিল লুলার জয়

সাউ পাউলুতে ব্রাজিলের পতাকা হাতে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 27 Oct 2026, 03:33 PM

Updated : 27 Oct 2026, 03:33 PM

“ব্রাজিল কখনো কোনো দেশের অধীনতা মেনে নেবে না”, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের পর দেওয়া ভাষণে সরাসরি ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে এই সতর্কবার্তা দেন ব্রাজিলের বামপন্থি নেতা লুইস ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা।

বিবিসি লিখেছে, সাধারণত রাষ্ট্রীয় নির্বাচনে পররাষ্ট্রনীতি সচরাচর মূল নিয়ামক হয়ে ওঠে না; কিন্তু মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লুলার এই অবস্থান এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের ডাক তার প্রচারণায় এক দেশপ্রেমের জোয়ার তৈরি করে, যা কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

সাবেক ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে লুলার ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর রাজনৈতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে এই বিষয়গুলো মিলে যায়।

বিপরীতভাবে, লুলার এই কঠোর অবস্থান ট্রাম্পের কাছ থেকে একধরনের শ্রদ্ধাও আদায় করে নিয়েছে বলে মনে হয়। ফল ঘোষণার পর ট্রাম্প মন্তব্য করেন, “আমি লুলাকে পছন্দ করি, আমাদের সম্পর্ক ভালো।”

এর পর তিনি আরও বলেন, “আমি কোনো পক্ষ নিইনি।” তবে একই মুখে এই নির্বাচনকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলেও দাবি করেন তিনি।

ব্রাজিলের সর্বোচ্চ নির্বাচনী আদালত ভোটে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পায়নি। তা সত্ত্বেও পরাজয় মেনে নিতে চাননি লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বোলসোনারো।

ট্রাম্প অবশ্য ফ্লাভিওকে সরাসরি সমর্থন দেননি; তবে ফ্লাভিওর বাবা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর সঙ্গে তার গভীর সখ্য ছিল।

প্রায় এক বছর আগে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। সে সময় লুলা জানিয়েছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই এবং তিনি ফোন করার কোনো প্রয়োজনও মনে করেন না।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর বিচারকে ট্রাম্প ‘উইচ-হান্ট’ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে ব্রাজিলের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করলে এই টানাপোড়েন তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও লুলা ‘ব্রাজিল ব্রাজিলীয়দের’ লেখা নীল ক্যাপ পরে জাতীয় সার্বভৌমত্বের পক্ষে তোপ দাগেন। শুল্কের পক্ষে লবিং করায় বোলসোনারো পরিবারকে তিনি ‘দেশপ্রেমহীন’ আখ্যা দেন, যা ঐতিহ্যগতভাবে দেশপ্রেমের দাবি করা ডানপন্থি শিবিরের জন্য ছিল বড় ধাক্কা।

এমনকি মার্কিন বাণিজ্যনির্ভর ব্রাজিলের প্রভাবশালী কৃষি খাতের অনেকে লুলার কথায় যুক্তি খুঁজে পান।

লুলার শক্ত অবস্থানের মুখে তার জনপ্রিয়তার পারদ চড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন শুল্ক কমাতে বাধ্য হয়, যদিও পরবর্তীতে তা আবার বাড়ানো হয়েছিল।

পরবর্তীতে হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে দুই নেতার ইতিবাচক বৈঠক হয়। ট্রাম্প আলোচনাটিকে ‘খুবই ভালো’ বলে অভিহিত করেন এবং লুলা জানান যে তিনি ‘খুবই সন্তুষ্ট’ হয়ে সেখান থেকে ফিরেছেন।

সম্ভবত এটি আরেকটি ইঙ্গিত যে, ট্রাম্প শক্তিশালী নেতাদের পছন্দ করেন।

Image

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

তবে লুলার এই প্রত্যাবর্তনে ট্রাম্প কেন অসন্তুষ্ট হতে পারেন?

লাতিন আমেরিকা ইদানীং ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে; একুয়েডর, চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও পেরু; এই সব দেশেই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নেতারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ট্রাম্প এই মিত্রদের ব্যবহার করে পুরো অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব বিস্তারে ‘ডনরো ডকট্রিন’ নাম দিয়ে কৌশলগত পরিকল্পনা করেছিলেন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চ্যাথাম হাউজ’এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্রিস্টোফার সাবাতিনির মতে, ফ্লাভিও বোলসোনারো প্রথম দফায় এগিয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্প ভেবেছিলেন লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি ব্রাজিল হবে তার এই জোটের ‘১০ম এবং সর্ববৃহৎ উপহার’।

অর্থনৈতিক শক্তি এবং চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল খনিজ সম্পদের মালিক ব্রাজিলকে নিজের বলয়ে এনে এই সম্পদে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার দিকে নজর ছিল ওয়াশিংটনের। ব্রাজিলকে নিজেদের মাদকবিরোধী ‘শিল্ড অব আমেরিকাস’ জোটে টেনে আনাও ছিল ওয়াশিংটনের আরেক লক্ষ্য।

ব্রাজিল চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ আনে, এতে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অস্বস্তি দেখা দেয়। যার একপর্যায়ে ব্রাজিল সফরে ইচ্ছুক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দুই কর্মকর্তার ভিসা বাতিল করে ব্রাজিল। এর জবাবে ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের ভিসা প্রত্যাহার করে।

ট্রাম্প যদি ব্রাজিলের নির্বাচনকে ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলতে থাকেন, তবে সামনে কূটনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক ইস্যুতেও দুই দেশের নীতিগত ফারাক স্পষ্ট। লুলা ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার বা মাদকবাহী জাহাজে মার্কিন বোমাবর্ষণের মতো সামরিক অভিযানের তীব্র বিরোধী। বোলসোনারোর লবিংয়ের পর ব্রাজিলের অপরাধী চক্রকে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পদক্ষেপকেও তিনি দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে মনে করেন।

বিংশ শতাব্দীতে কমিউনিজম প্রতিরোধের নামে সিআইএ সমর্থিত সামরিক স্বৈরশাসনের স্মৃতির কারণে লাতিন আমেরিকার বামপন্থিদের কাছে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।

প্রযুক্তি খাতে প্রচারণায় মেটার বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তোলে লুলার শিবির। মেটা এটি অস্বীকার করলেও কিছু পোস্ট ভুলবশত সরিয়ে নেওয়ার কারিগরি ত্রুটি স্বীকার করে।

এর জবাবে এক কোটি সদস্যের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা ছড়িয়ে পাল্টা প্রচারণা চালায় লুলার সমর্থকেরা। তাছাড়া ব্রাজিলের তাৎক্ষণিক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা ‘পিক্স’ মার্কিন ক্রেডিট কার্ড প্রতিষ্ঠান ভিসা ও মাস্টারকার্ডের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও ক্ষুব্ধ ট্রাম্প প্রশাসন।

এই দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও চরম বিভক্ত করেছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় বোলসোনারোর সমর্থকেরা মার্কিন পতাকা এবং ‘ট্রাম্প নিউক ব্রাজিল’ লেখা বেলুন ওড়ালেও লুলার শিবির তাদের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার অভিযোগ তোলে।

তবে বাণিজ্যিক বাস্তবতা ভিন্ন। চীনের পর যুক্তরাষ্ট্র এখনো ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং আপাতত দুই নেতার সম্পর্ক স্বাভাবিক রয়েছে।

ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করছে ব্রাজিলের বিষয়ে ওয়াশিংটন কতখানি হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলে এবং জবাবে লুলা ঠিক কতটা দৃঢ় অবস্থান নেন, তার ওপর।