Published : 02 Jun 2026, 09:52 AM
এক দশকের বেশি সময় ধরে সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য হিসেবে আলোচনায় থাকা ওষুধ থেকে বিদেশি মুদ্রা আয়ের পরিমাণ ধাপে ধাপে বাড়ছে। চলতি অর্থবছরেও সে ধারা বজায় রয়েছে; এখন পর্যন্ত আয় এসেছে প্রায় সাড়ে ১৯ কোটি ডলার।
বিশ্বজুড়ে বাজার বাড়ার পাশাপাশি ওষুধ বিক্রি থেকে আয়ের পরিমাণও বেড়েছে। দেড় দশক আগে এ খাত থেকে যে আয় হত এখন তা পাঁচগুণ বেড়েছে।
ওষুধ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানিতে সাফল্য থাকলেও কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থা এখনও দুর্বল। এ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি করতে পারলে তৈরি পোশাকের পর ওষুধ শিল্প দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি পণ্য খাত হয়ে উঠতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি করে ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে ১৫ বছরের ব্যবধানে পাঁচ গুণের বেশি বেড়ে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে ওঠে।
ওষুধ রপ্তানি করে ২০১০-১১ অর্থবছরের পর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি অর্থবছরেই টানা আয় বেড়েছে। মাঝে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য কমলেও পরের অর্থবছর থেকে তা আবার বাড়তে শুরু করে।
সে ধারা বজায় রেখে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে এ খাত থেকে আয় এসেছে ১৯ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিলে আয়ের পরিমাণ ছিল ১৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার।
একক মাসের হিসেবে সবশেষ এপ্রিলে এ খাত থেকে আয় বেড়েছে ১০০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গত মাসে ২ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে যা ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
চলতি অর্থবছরের বাকি দুই মাসে (মে ও জুন) এপ্রিলের মত আয় হলে এবার ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় প্রায় ২৫ কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছাবে। রপ্তানিকারকরা প্রথমবারের মত এ মাইলফলকে পৌঁছানোর বিষয়ে আশাবাদী।

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির বলছেন, দেশে ওষুষের কাঁচামাল তৈরির ব্যবস্থা করা গেলে পাঁচ বছরের মধ্যে এই খাত থেকে আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “অনেক দেশের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় বাংলাদেশ দ্রুত ভালোমানের ও কম দামের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
“সবচেয়ে বড় কথা ৪৮টি স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মধ্যে বাংলাদেশই ওষুধ উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের ১০টি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে।”
কাঁচামালকে প্রধান সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য যে এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট) পার্ক তৈরি করা হচ্ছে, সেটা পুরোদমে চালু হলে সেখানে কাঁচামাল তৈরি করা হবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অনেকে কারখানা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। এখানে কাঁচামাল উৎপাদন শুরু হলে দেশের ওষুধশিল্প আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
তবে ওষুধের কাঁচামাল তৈরির এই পার্ক দেড় দশকের বেশি সময়েও দাঁড়াতে পারেনি। এ শিল্পের জন্য বরাদ্দ জমি ফাঁকা পড়ে আছে। চাহিদার ৯৫ শতাংশ ওষুধ দেশে তৈরি হলেও এর কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। এজন্য প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যায়।
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ১৭ বছর আগে এ শিল্প নগরী প্রতিষ্ঠার জন্য জমি বরাদ্দ দিয়েছিল সরকার। সেখানে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল উৎপাদন শুরু করেছে। আরও দুটি কোম্পানি প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। ২৩টির জন্য বরাদ্দ জমি ফাঁকা পড়ে আছে।
সাধারণত ওষুধে দুই ধরনের উপাদান থাকে। একটি হল- মূল কাঁচামাল অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই)। অন্যটি- সহযোগী নিষ্ক্রিয় উপাদান (এক্সিপিয়েন্ট)। যেমন– প্যারাসিটামল বড়ির এপিআইয়ের নাম ‘প্যারাএসাইটাল অ্যামাইনোফেনাল’। এটা মানুষের শরীরে কাজ করে, রোগ সারায়। কিন্তু প্যারাসিটামল বড়িতে সেলুলোজ, ট্যাল্কসহ কিছু উপাদান থাকে। এগুলো হল–এক্সিপিয়েন্ট; যা এপিআইকে বড়ির আকার দিতে, বড়ি মানুষের শরীরে দ্রুত দ্রবীভূত হতে সহায়তা করে। তবে এক্সিপিয়েন্ট শরীরে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখায় না।
ওষুধশিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রতিবছর অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার এপিআই আমদানি করে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে এপিআই আমদানি খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি এপিআই উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়বে।
বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো চীন ও ভারত থেকে বেশি এপিআই আমদানি করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সঠিক পদক্ষেপ নিলে ওষুধের কাঁচামাল আমদানি কমানো সম্ভব।
এপিআই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএআইএমএ) বলছে, গত আট বছরে স্থানীয় ওষুধ কোম্পানি ৪০টির বেশি এপিআই তৈরি করেছে। কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান নিজে এপিআই তৈরি করে নিজের ওষুধ কোম্পানিতে তা কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে। কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান এপিআই তৈরি করে দেশের মধ্যে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে।
দেশি কোম্পানিগুলো আর্থিক নিরাপত্তা ও প্রণোদনা পেলে অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এপিআই দেশেই তৈরি সম্ভব বলে সংগঠনটির তরফে বলা হয়েছে।
বিআইএমএর সভাপতি এস এম সাইফুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটমকে বলেন, “ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর–প্রতিটি দেশ এই শিল্পকে নিরাপত্তা দিয়েছে, ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিয়েছে। আমাদের তা দিতে হবে। পাশাপাশি নমুনা পরীক্ষা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। ওষুধশিল্পের যে অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আছে, তা এই শিল্পকে দৃঢ় ভিত্তি দিতে সহায়তা করবে।

“নতুন সরকারের কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আশা করছি, সরকার এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে; নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী ইতিবাচক ঘোষণা দেবেন।”
এপিআই শিল্পের জন্য ভারতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি আছে। দেশে একটি টাস্কফোর্স বা কমিশন গঠন করার প্রস্তাব করেন তিনি।
ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির মনে করছেন, বাংলাদেশ তৈরি পোশাকশিল্পে যে সাফল্য দেখিয়েছে, ওষুধের কাঁচামালের ক্ষেত্রেও সেই সাফল্য দেখানোর সামর্থ্য রাখে। বাংলাদেশ এখন যেকোনো ‘মলিকিউল’ তৈরি করতে পারে। তৈরি পোশাকশিল্পে বাংলাদেশের প্রতিযোগী ৩০ থেকে ৩৫টি দেশ। ওষুধ বা ওষুধের কাঁচামালের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিযোগী শুধু চীন ও ভারতের মতো দু-তিনটি দেশ।
“রপ্তানি বাড়াতে আমাদের ওষুধ কোম্পানিগুলো সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এখন রপ্তানি বাড়তেই থাকবে। আমরা আশাবাদী- সরকারি সহায়তা পেলে, স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়তে পারলে এই খাত থেকে আরও বেশি বিদেশি মুদ্রা দেশে আসবে।“
দেড় দশকে কমছে শুধু একবারই
বাংলাদেশ থেকে ওষুধ রপ্তানি শুরু হয় ১৯৮৫ সালে। এরপর গত কয়েক দশকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় ওষুধের বৃহত্তম উৎস হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতেও রপ্তানি হচ্ছে।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছরে মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই রপ্তানি করেছে তিনটি প্রতিষ্ঠান¬- বেক্সিমকো, স্কয়ার ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস। এর মধ্যে সবচেয়ে রপ্তানি করেছে বেক্সিমকো ফার্মা। দ্বিতীয় ইনসেপ্টা ও তৃতীয় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।
রপ্তানির দিক থেকে শীর্ষ দশের তালিকায় থাকা অন্য কোম্পানিগুলো হচ্ছে- রেনাটা, একমি, অ্যারিস্টোফার্মা, এসকেএফ, জেনারেল, বিকন ও ওরিয়ন ফার্মা।
ঔষধ শিল্প সমিতির তথ্য বলছে, গত দুই বছরে ১ হাজার ২০০টি ওষুধপণ্য রপ্তানির জন্য নিবন্ধন পেয়েছে। বর্তমানে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশসহ ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান বাজারে রপ্তানিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি করে মাত্র ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই আয় প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ডলার হয়েছে।
এই ১৫ বছরে শুধু এক বছর ছাড়া সব অর্থবছরেই রপ্তানি বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি থেকে আসে ১৮ কোটি ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার। পরের ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ শতাংশ কমে আয় হয় ১৭ কোটি ৫৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। পরের অর্থবছর ২০২৩-২৫৪ এ তা ঘুরে দাঁড়ায়, যা এখন পর্যন্ত আর কমেনি।
শুধু ঘুরে দাঁড়ায়নি ওষুধ রপ্তানি থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মত ২০ কোটি ডলারের বেশি আয় হয়; আসে ২০ কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার ডলারের বিদেশি মুদ্রা। প্রবৃদ্ধি হয় ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ।