ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক: ৫০০ মিটারে ১০ মাসে ১৩ জনের প্রাণহানি

পদ্মা সেতু চালুর পর এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অন্তত তিন হাজার যানবাহন চলাচল করে।

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 Dec 2023, 03:17 AM
Updated : 6 Dec 2023, 03:17 AM

গাড়ির ওভারটেকিং ও পথচারী চলাচলের রাস্তা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক। ব্যস্ত এ সড়কে প্রতিনিয়তই বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।

প্রায় ৭১ কিলোমিটারের এ সড়কের মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর, কাশিয়ানী ও মুকসুদপুর উপজেলা পড়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অন্তত তিন হাজার যানবাহন চলাচল করে।

মহাসড়কটির গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোবরা ইউনিয়নের ঘোনাপাড়া-পাথালিয়া অংশের ৫০০ মিটার অংশ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এ অংশের মধ্যেই রয়েছে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

প্রতিদিন ঘোনাপাড়া থেকে বিপদজনক এ সড়ক পাড়ি দিয়েই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যাতায়াত করতে হয়। তাছাড়া সড়ক বাতি না থাকায় রাত নামলেই সড়কের ওই অংশ একেবারে অন্ধকারে হয়ে যায়; তখন অঘটনের আশঙ্কা আরও বাড়ে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ঘোনাপাড়া-পাথালিয়া অংশের ৫০০ মিটার অংশে ১০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩ জনের প্রাণ গেছে বলে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া হাইওয়ে থানার ওসি মো. শরিফুল ইসলাম জানান।

ঘোনাপাড়া-পাথালিয়া অংশটি দুর্ঘটনাপ্রবণ জানিয়ে ওসি বলেন, “এখানে প্রাণহানির পাশাপাশি শতধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। ওভারটেকিং, যানবাহনে-যানবাহনে প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়া গতি এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

“দুর্ঘটনা ঠেকাতে মহাসড়কে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে আমরা চেকপোস্ট বসিয়ে প্রায়ই জরিমানা করছি। পথচারীদের জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হতে ও সিগন্যালে গতি কমাতে গাড়ির চালকদের সতর্ক করছি। পাশাপাশি সচেতনতামূলক প্রচারও চালাচ্ছি।”

চালকরা গতি নিয়ন্ত্রণ করে গাড়ি চলালে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করেন হাইওয়ে পুলিশের এ কর্মকর্তা।  

গোবরা ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান চৌধুরী টুটুল বলেন, “শেখ রেহানা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই), টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (টিটিসি) ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ঘোনাপাড়া-পাথালিয়া অংশের ৫০০ মিটারের মধ্যে পড়েছে।

“কিন্তু ওই অংশে কোনো হাঁটার রাস্তা নেই। ফলে ওই তিন প্রতিষ্ঠানের সহস্রাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে চরম ঝুঁকি দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। আর ওই অংশেই সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। প্রাণহানির পাশাপাশি পঙ্গুও হচ্ছেন অনেকে।”

শেখ রেহানা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ইয়ার্ন ডিপার্টমেন্টের প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. আতিকুর রহমান বলেন, “আমি ২০২১ সালে এই কলেজে ভর্তি হয়েছি; তখন থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ঘোনাপাড়া পাথালিয়া অংশে আমার সামনেই অন্তত ১৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে।”

ওই কলেজের অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, “সড়কে পথচারী চলাচল করার মত কোনো ব্যবস্থা নেই। পুরো রাস্তা দিয়েই দ্রুত গতির গাড়ি চলে। এখানে জেব্রা ক্রসিং দেওয়া হয়েছে; সর্বোচ্চ গতিসীমা ৪০ কিলোমিটারও লেখা রয়েছে। কিন্তু এসব কেউ মানে না।”

তিনি বলেন, “এখানে ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চলাচল করে। বামে কিংবা ডানে দেখে রাস্তা পারাপার হতে গেলেও বিপদ। কারণ এখানে প্রতিযোগিতা ও ওভারটেকিং করে গাড়ি চলাচল করে। ফলে যেকোনো সময় গাড়ি প্রাণ কেড়ে নেবে এমন আশঙ্কায় থাকতে হয়।

“এ ছাড়া হর্নের যন্ত্রণায় পড়াশুনাও ঠিকমত হয় না। সড়কবাতিও নাই। ফলে রাতে সড়কটি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।”

মো. আজমত হোসেন চৌধুরী নামের এক অভিভাবক বলেন, “সন্তানকে নিয়ে সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি। দুর্ঘটনার ভয়ে অনেকই শেখ রেহানা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সন্তানকে ভর্তি করতে চান না।”

ঘোনাপাড়-পাথালিয়া অংশে চলাচলকারী বাসের চালক জুলমত আলী খান বলেন, “এ মহাসড়কের তিনটি প্রতিষ্ঠানের সামনে জেব্রা ক্রসিং বা সাইন সিগন্যাল রয়েছে। এখানে গাড়ির গতি ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে রাখার নিয়ম করা হয়েছে।

“খুলনা যাওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫০০ মিটার পর ঘোনাপাড়া বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি থামাতে হয়। ঢাকা যাওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫০০ মিটার আগে ঘোনাপাড়ায় গাড়ি থামে। এতে সময় নষ্ট হয়। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে এসে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের দিকে আমাদের কোনো নজর থাকে না।”

গোপালগঞ্জ শেখ রেহানা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার নয়ন চন্দ্র ঘোষ বলেন, “সড়কটি নিরাপদ করতে ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ ও সড়ক প্রশস্ত করতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনা কমে আসবে। এ ব্যাপারে আমরা গোপালগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর লিখিত একটি আবেদন দিয়েছি।”

গোপালগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, “আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে যানবাহনের গতি কমাতে জেব্রা ক্রসিং ও সাইন সিগন্যাল করে দিয়েছি। এ ছাড়া সড়ক বিভাগের রোড সেফটি ইউনিটকে বিষয়টি জানিয়েছি। তারা যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে মোতাবেক কাজ করে সড়কটিকে নিরাপদ করা হবে।”