হবিগঞ্জের মঈনের পরিচয়ে ২২ বছর কারারক্ষীর চাকরিতে কুমিল্লার তাজুল

২০২০ সালের শেষ দিকে গণমাধ্যমের সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে।

কুমিল্লা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Jan 2023, 02:31 PM
Updated : 13 Jan 2023, 02:31 PM

অন্য একজনের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ২২ বছর ধরে কারাগারে চাকরি করা কুমিল্লার এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। 

শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান র‌্যাব-১১, সিপিসি-২ কুমিল্লার কোম্পানি কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন। 

গ্রেপ্তার তাজুল ইসলাম কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দক্ষিণ শশীদল এলাকার মৃত মো. কালা মিয়ার ছেলে। তিনি সবশেষ সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে রক্ষী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাকে বৃহস্পতিবার বিকেলে ব্রাহ্মণপাড়া বাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। 

এ সময় তার কাছ থেকে তিন সেট ইউনিফর্ম, একটি জ্যাকেট, এক সেট রেইনকোট, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করা হয়। তাকে পুলিশে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে র‌্যাব। 

মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন জানান, হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার শাহজাহানপুর গ্রামের মো. মঈন উদ্দিন খান ২০০১ সালে কারারক্ষী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে হাজির হয়ে শারীরিক ফিটনেস, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দেন। সেই পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণও হন। পরবর্তী সময়ে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ জানায়, উত্তীর্ণ প্রত্যেকের স্থায়ী ঠিকানায় নিয়োগপত্র ডাকযোগে পাঠানো হবে। 

একই পদের পরীক্ষা দেন কুমিল্লার তাজুল ইসলামও। তবে তিনি অকৃতকার্য হন। পরবর্তী সময়ে তাজুল কৃতকার্য মঈনের পরিচয়, নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য সব কাগজপত্র নকল করে চাকরিতে যোগ দেন। তখন বিষয়টি কর্তৃপক্ষ ধরতে পারেনি। 

সিলেট বিভাগের স্থায়ী বাসিন্দা নন, কিন্তু সেই বিভাগের পরিচয়ে প্রায় ২০০ জন কারারক্ষী ২০-২২ বছর ধরে বিভিন্ন কারাগারে চাকরি করছেন- এমন একটি সংবাদ ২০২০ সালের শেষ দিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত হয়। এই সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতিই হবিগঞ্জের মো. মঈন উদ্দিন খানের ঘটনাটি সামনে আসে। 

মঈন নিজে খোঁজ নিয়ে বিষয়টি জানতে পারেন এবং চাকরি ফিরে পেতে আদালতে মামলা করেন। মামলার পর তাজুল ইসলাম তাকে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এতে মঈন রাজি না হলে তাজুল সিলেটের কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। 

র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর সাকিব জানান, মামলা হওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা মঈনের পরিচয়ে যিনি চাকরি করছেন তাকে খুঁজতে থাকেন। এ ব্যাপারে তিনি র‌্যাবের সহায়তা চান। তখন র‌্যাব এ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। এবং একপর্যায়ে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার তাজুল ইসলামকে শনাক্ত করেন। 

র‌্যাব আরও জানায়, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর ২০০১ সালে তাজুলসহ আরও দুইজন হবিগঞ্জের মঈন উদ্দিন খানের বাড়িতে যান এবং নিজেদের কারা কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। তাজুল ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা মঈনকে বলেন, চাকরি নিয়োগপত্র পেতে হলে তাকে টাকা দিতে হবে। কিন্তু মঈন উদ্দিন ঘুষ দিয়ে চাকরি করবেন না বলে জানান।

হয়তো কোনো কৌশলে মঈনের নিয়োগপত্রটি প্রতারক তাজুল হস্তগত করেছিলেন। মঈন নিয়োগপত্র না পেয়ে হতাশায় বেসরকারি চাকরি করা শুরু করেন। আর প্রকৃত মঈন উদ্দিন খানের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে প্রতারক তাজুল কারারক্ষী হিসেবে চাকরি শুরু করেন। 

২২ বছর ধরে বিভিন্ন কারাগারে চাকরি করে তাজুল সবশেষ সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে যান। 

এর মধ্যে জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫ অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রাপ্তির জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হলে তখন তাজুল অসৎ উপায়ে মঈন উদ্দিন খানের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে একটি জাতীয় পরিচয়পত্রও তৈরি করে ফেলেন। 

২০২০ সালে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আলোচনায় এলে সিলেট কারাগার কর্তৃপক্ষ মঈন উদ্দিন খানের ঠিকানা যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নেয়। তখন হবিগঞ্জের শাহাজাহানপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে মঈন উদ্দিন খান সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা কি-না এ ব্যাপারে একটি প্রত্যয়ণপত্র পাঠাতে বলেন সিলেট কারাগারের উপ-মহাপরিদর্শক। 

এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউপি চেয়ারম্যান প্রত্যয়ণপত্রে উল্লেখ করেন, মঈন উদ্দিন খানকে তিনি চিনেন। তবে মঈন কারারক্ষী হিসেবে চাকরি করেন না। বরং তিনি স্থানীয়ভাবে ওষুধের ব্যবসা করেন।  

চেয়ারম্যানের প্রত্যয়ণপত্রের বিষয়টি প্রতারক তাজুল কৌশলে জেনে যান এবং সঙ্গে সঙ্গে চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন জানান।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক