খাবারের দাম বৃদ্ধি: ‘সকালের নাস্তা ও দুপুরের খাবার একসাথে খাই’

পরিবারের পক্ষ থেকে যে টাকা মাসিক খরচ হিসেবে পাঠায় তা দিয়ে পুরো মাস চলতে হয়।

হাসিবুর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 July 2022, 05:40 PM
Updated : 26 July 2022, 05:40 PM

হাসিবুর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

“আগে সকালের নাস্তা ঠিক সময়েই করতাম। ইদানীং খাবারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সকালের নাস্তা এবং দুপুরের খাবার একসাথে বেলা ১২টার দিকে খাই।”

খাবারের দাম বৃদ্ধির পর খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের বিষয়ে বলতে গিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক শিক্ষার্থী কথাগুলো বলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহীদ সালাম বরকত হলের এই শিক্ষার্থী বলেন, “সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ায় টিউশন পরিচালনা করা আমার পক্ষে কঠিন। সুতরাং, আমার পরিবারের পক্ষ থেকে যে টাকা মাসিক খরচ হিসেবে পাঠায় তা দিয়ে পুরো মাস চলতে হয়।”

তাছাড়া কম দামের খাবারই এখন খেতে হয় বলে জানান এই শিক্ষার্থী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন আরও অনেক শিক্ষার্থী তাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন। খাবারের দাম বৃদ্ধি এবং অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এখন তুলনামূলকভাবে সস্তা আইটেমের খাবারের প্রতি অনেক শিক্ষার্থী ঝুঁকছেন।

স্বল্প ও অপুষ্টিকর খাবার গ্রহণের কারণে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক জানিয়েছেন।

নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষার্থী আদনান করিম বলেন, “খাবারের দাম বাড়লেও আমাদের মাসিক খরচের যে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা সেটা কিন্তু বাড়েনি। হোক সেটা পরিবার থেকে কিংবা টিউশন থেকে। যার ফলে চাহিদা মাফিক খাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। অধিকাংশ সময় কমদামি খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বেশ কিছু খাবারের দোকান রয়েছে। ওইসব দোকান মালিকদের ভাষ্য, অধিকাংশ দোকানিই মেন্যু পরিবর্তন করেছেন।

‘বাংলার স্বাদ’ খাবার হোটেলের মালিক ইমাম হোসেন বলেন, “শিক্ষার্থীরা খাসির মাংস, গরুর মাংস কিংবা বিরিয়ানির মতো আইটেমে আগ্রহ কম দেখায়, তাই এসব মেন্যু থেকে বাদ দিয়েছি। তেল-ময়দা-পেঁয়াজ ছাড়াও অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির ফলে আমাদেরও খাবারের দাম বাড়াতে হয়েছে। এরপর থেকেই মাংস বা অন্যান্য ভালো খাবারের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে।”

ইদানিং সবজি বিক্রি অনেক বেড়েছে বলে জানান ইমাম হোসেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ টি হলের মধ্যে বেশ কয়েকটি হল ক্যান্টিনের মালিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকার ১০ টিরও বেশি খাবারের দোকান মালিক জানান, সকালের খাবারের সময় লোকজন কম হওয়ায় তারা সকালের নাস্তার বন্ধ রেখেছেন।

আ ফ ম কামালউদ্দিন হল ক্যান্টিনের মালিক রহমান মল্লিক বলেন, “গত কয়েক মাস ধরে ক্যান্টিনের খাবার বিক্রি করে লাভের অঙ্ক করতে পারছি না। যে হারে মুদি জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে; তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের হলে শত শত শিক্ষার্থীর বিপরীতে সকালের নাস্তা করে মাত্র ৩০ জনের মতো।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকার খাবারের দোকানগুলোর তত্ত্বাবধায়ক সহকারী অধ্যাপক মো. ইখতিয়ার উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, “বেশিরভাগ খাবারের দোকানে শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের প্রধান ডা. শামসুর রহমান বলেন, “আমাদের এখানে চিকিৎসা গ্রহণকারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কার্বোহাইড্রেটের অভ্যাসের কারণে স্থূলতা, অপুষ্টিতে ভুগছেন। তাছাড়া কেউ যদি প্রয়োজনের চেয়ে কম খাবার গ্রহণ করে তাহলে তা হবে তাদের শরীরের উপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব।”

“শিক্ষার্থীরা কম পরিমাণে এবং কম পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে অপুষ্টিতে ভুগবে এবং তাদের শক্তির মাত্রা কমে যাবে। এটি তাদের পড়াশোনায় মনোযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।”

তাছাড়া সকালের নাস্তা বাদ দেওয়ার অভ্যাস যাদের রয়েছে – এক থেকে দুই বছরের মধ্যে স্থায়ী অসুস্থতার জন্য তাদেরকে সতর্কও করেছেন ডা. শামসুর রহমান।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক