Published : 08 Dec 2022, 08:40 AM
শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ফরিদপুরে খেজুরের গুড় তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গাছিরা।
‘ভেজালমুক্ত’ ও ‘গুণ-মান ঠিক’ থাকায় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও এখানকার খেজুর গুড়ের চাহিদা রয়েছে বলে গাছি ও স্থানীয়রা জানান।
তবে গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এখন কম রস উৎপাদন হচ্ছে এবং এর ফলে গ্রাহকের চাহিদামতো গুড় তৈরি করা যাচ্ছে না বলে গাছিরা জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রশিক্ষিত গাছিরা রাজশাহী থেকে এ জেলায় এসে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করছেন।
গত কয়েক বছর ধরে শীত মৌসুমে এরা দলবেঁধে ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় আসেন। প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে খেজুর গাছ ভাড়া নেন। পুরো শীত মৌসুম ধরে রস সংগ্রহ করে তৈরি করেন গুড়।

গাছের রস বের করা থেকে শুরু করে গুড় তৈরি পর্যন্ত পুরো কাজটি গাছিরাই করেন।
গাছিদের ভাষ্য, দেশে বেশ কয়েক বছর ধরে খেজুরের রসে নিপা ভাইরাসের প্রার্দুভাবের কারণে তারা হাঁড়ির মুখে নীল কাপড় বেঁধে বিশেষ প্রক্রিয়ায় রস সংগ্রহ করছেন।
কোনো রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার ছাড়াই এসব গুড় তৈরি করা হয়; খাঁটি গুড়ের নিশ্চয়তায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন গুড় নিতে আসেন বলে গাছিদের দাবি।
গাছিরা জানান, গুড় তৈরির জন্য খেজুর গাছের রস কম মিলছে। উৎপাদন কম হওয়ায় ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে পারছেন না তারা।
সরেজমিনে ফরিদপুর শহরতলীর গঙ্গাবর্দী এলাকার কৃষি ইনস্টিটিউট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা।
প্রথমে তারা বিভিন্ন খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে একত্রিত করেন। সেই রস চার কোণাকৃতির বড় লোহার পাত্রে ঢেলে চুলায় জ্বাল দেওয়া হয়। গুড় হওয়ার পর বিভিন্ন আকৃতির মাটির ও প্লাস্টিকের পাত্রে ঢেলে রাখলে ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে জমাট বেঁধে যায়।
এভাবে তৈরি গুড়ের চাহিদা বেশি বলে জানান কারিগররা।
খেজুর-গুড় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন শহরতলীর কৃষি কলেজ এলাকার বাসিন্দা এনামুল হাসান গিয়াস। কথা হয় তার সঙ্গে।
তিনি বলেন, খেজুর গাছের সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে। তাছাড়া গাছ কেটে রস বের করার মতো লোকও পাওয়া যায় না। রাজশাহী, যশোরসহ দূর-দূরান্তের বিভিন্ন জেলা থেকে গাছি আনতে হয়।

জেলায় প্রায় দেড় হাজার গাছ দেখভাল করেন জানিয়ে তিনি বলেন, “কোনো লাভের জন্য নয়, এই জেলার বিখ্যাত গুড় মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতেই এ কাজটি করি।”
বছর চুক্তিতে গাছিদের কাছে গাছ লিজ নিয়ে দেন জানিয়ে এনামুল হাসান আরও বলেন, “সারা বছর চাহিদা থাকলেও রসের জোগান না থাকায় গুড় দিতে হিমশিম খেতে হয়।”
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দিঘা গ্রামের বাসিন্দা মো. লালন আলী প্রামাণিক একজন গাছি। তিনি গত নভেম্বরের শুরুতে দুই সহযোগীকে নিয়ে ফরিদপুরে এসেছেন।
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি বাড়ি ফিরবেন জানিয়ে লালন বলেন, “কৃষি কলেজ ও আশপাশের ১৫০টি খেজুর গাছ আমরা তিনজন দেখভাল করছি।
“প্রতিটি গাছ আমরা তিনশ টাকা করে এ বছরের জন্য লিজ নিয়েছি। গাছ কাটার প্রথম এক মাস রস বের হয় না। পরের দুই মাস রস পাওয়া যায়।”
প্রতি লিটার রস ৪০ টাকায় বিক্রি করছেন জানিয়ে লালন, “এছাড়া এক হাঁড়ি (৮ লিটার) নিচ্ছি ৩৫০ টাকা। ঝোলা গুড় ৩০০ ও শক্ত পাটালি বিক্রি করছি ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা কেজি দরে।”

সেলিম মণ্ডল নামের আরেক গাছি বলেন, “১৫০টি গাছের মধ্যে প্রতিদিন ৮০টি থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। তাতে রোজ ২৫০ লিটার রস সংগ্রহ করতে পারি, যা দিয়ে প্রায় ১৫ কেজি করে গুড় তৈরি হচ্ছে।
“অনেকেই সামনে দাঁড়িয়ে থেকে গুড় নিয়ে যান। চাহিদার তুলানায় রস না মেলায় অনেককেই গুড় দিতে পারি না।”
আরশাদ শেখ বলেন, “আমরা রাজশাহী থেকে এসেছি। এখানে চার মাস থাকব। এ সময় থাকা-খাওয়া ও গুড় তৈরির জ্বালানি খরচ বাদে একেকজন ৭০-৮০ হাজার টাকা নিয়ে যেতে পারব।”
রস বেশি পাওয়া গেলে লাভ কিছুটা বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
গুড় কিনতে উপজেলার কানাইপুর থেকে আসা রহিম শেখ বলেন, “এখানে ভেজালমুক্ত গুড় পাওয়া যায়, তাই কিনতে এলাম। আগে দুই কেজি নিয়েছিলাম। বিদেশে ছেলের কাছে পাঠাব বলে এবার কিনতে এলাম কিন্তু ওরা দিতে পারল না। বলল, কয়েকদিন দেরি হবে। অগ্রিম টাকা দিয়ে গেলাম; পরে এসে নিয়ে যাব।”

ফরিদপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “সারা দেশে ফরিদপুরের খেজুর গুড়ের সুনাম আছে। কিন্তু দিন দিন গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় গুড়ের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে।”
সম্প্রতি কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে খেজুর গাছ লাগানো হচ্ছে বলে জানান আনোয়ার হোসেন।
“জেলায় পাট ও পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের পাশাপাশি খেজুর গুড়ের উৎপাদন ধরে রাখতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে,” বলেন এ কৃষি কর্মকর্তা।