শনিবার টাঙ্গাইলে একটি কমিউনিটি সেন্টারে জেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বর্ধিত সভায় বক্তব্য দেন আবদুল কাদের সিদ্দিকী।
Published : 12 Aug 2023, 09:13 PM
‘উৎসবমুখর’ হলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন গত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির শরিক কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকী।
তিনি বলেছেন, “দেশের মানুষ যদি ভোট দেয় আর ভোট যদি চুরি করা না হয়, তাহলে সেটাই হবে সংবিধান মত একটি নির্বাচন। কিন্তু গত বেশ কয়েক বছর মানুষ ভোট দিতে পারে না। শয়তানরা ভোট দেয়। দিনের ভোট রাতে হয়।”
শনিবার বিকালে শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে টাঙ্গাইলে জেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বর্ধিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন।
জনতা লীগ ভোটে আসবে কি-না, সেই প্রশ্নে কাদের সিদ্দিকী বলেন, “যদি সত্যিই উৎসবমুখর নির্বাচন হয়, তাহলে আমরা সব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।”
বিএনপির অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, “বিএনপি নির্বাচনে যাবে না, এটা তারা বলতেই পারে। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারে। আওয়ামী লীগও তো নির্বাচনে না যেতে পারে। বিএনপি-আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচনে না যায়, আর দেশে যদি নির্বাচন হয় আর সেই নির্বাচনে যদি ভোটাররা অংশগ্রহণ করতে পারে এবং অংশগ্রহণমূলক ভোট হয় তাহলে কারও কোনও দ্বিধা থাকার কথা না।”
জোটবদ্ধ হয়ে গত নির্বাচনে যাওয়া নিয়েও কথা বলেন কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, “আজও অনেকে মনে করেন, আমরা বিএনপির জোটে গিয়েছিলাম। আমি এক মুহূর্তের জন্যও বিএনপির জোটে যাইনি। আমি ড. কামাল হোসেনকে দেখে তার নেতৃত্বকে মেনে জোটে গিয়েছিলাম।”
মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত কাদের সিদ্দিকীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই তৈরি হয়েছে গুঞ্জন।
১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ থেকে সরে গিয়ে নিজে রাজনৈতিক দল গঠনের দুই বছরের পরে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলে ধারণা করা হয়। ২০১৮ সালে বিএনপি জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়ে টাঙ্গাইল-৪ ও টাঙ্গাইল-৮ আসন থেকে জোটের মনোনয়ন পান তিনি। তবে খেলাপি ঋণের অভিযোগে দুটি মনোনয়নই বাতিল হয়ে যায়।
পরে টাঙ্গাইল-৮ আসনে মনোনয়ন পান তার মেয়ে কুঁড়ি সিদ্দিকী। তবে নৌকার প্রার্থীর কাছে হেরে যান বড় ব্যবধানে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জোয়াহেরুল ইসলাম পান ২ লাখ ৮ হাজার ৩৩৪ ভোট। কুঁড়ির বাক্সে পড়ে ৭২ হাজার ২১১ ভোট।
ভোটের পরে সবার আগে ঐক্যফ্রন্ট ছাড়েন কাদের সিদ্দিকী। পরে এক আলোচনায় বলেন, “আমি একজন গাধা। এ জন্য ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টে গিয়েছিলাম।”
২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন আলোচনা। সেদিন গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সপরিবারে দেখা করেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নেতা। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী নাসরিন সিদ্দিকী এবং তাদের দুই কন্যা।
আওয়ামী লীগ ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ‘কাছাকাছি আসার’ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় পরে। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র জমাদানের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ২৫ জানুয়ারি টাঙ্গাইলে যে অনুষ্ঠান হয়, তাতে প্রধান অতিথি হয়ে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।
সেদিন কাদের সিদ্দিকী বলেন, “বাংলার বাপ একটাই। বাংলার বাপ ২, ৩, ৪টা নয়, তিনি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শে পথ চলতে চাই।”
তবে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমার বোনের (শেখ হাসিনা) সঙ্গে একটু দেখা হওয়ায় আমার দলের অনেক মানুষ মনে করছে আমাগো নেতা গেছে গা, নৌকা মার্কা হইয়া গেছে। অনেক আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছে আমাগো কাম হইছে। না, কিছুই হয় নাই। আমি বঙ্গবন্ধুর ছিলাম, বঙ্গবন্ধুর আছি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে আমার সারা কাটিয়ে যাব, এখানে কোনো আপস নেই।’
আলোচনায় নির্বাচন কমিশনেরও সমালোচনা করেন কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, “ভোট চুরি ঠেকাতে নাকি সকালে কেন্দ্রে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। রাতে কোনো কেন্দ্রে ব্যালট পেপার যাবে না। যারা রক্ষক, তারাই যদি ভক্ষক হয় তাহলে ব্যালট পেপার সকালে গেলেও যা হবে, রাতে গেলেও তা হবে।”
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তুমুল আলোচিত অগাস্ট মাস নিয়েও কথা বলেন কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, “অগাস্ট মাস আসলে আমার জীবন আপনাআপনি বদলে যায়। মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম মারাত্মক একটি আশা নিয়ে। আমাদের একটি আশা ছিল, পাকিস্তান যেভাবে চলছে বাংলাদেশ সেভাবে চলবে না। বাংলাদেশ হবে সাধারণ মানুষের দেশ। ন্যায়, নীতি, ভালোবাসা ও মানবতার দেশ হবে বাংলাদেশ। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু কারো সঙ্গে কারো শত্রুতা থাকবে না। দীর্ঘ ৫৪ বছরে আমরা তা খুঁজে পাইনি।
“আমরা এক অর্থে কঠিন অবস্থার মধ্যে আছি। দেশ ভালো চলছে, এটা বলার মত আমার অন্তর থেকে তাগিদ অনুভব করি না। সরকারে যারা আছেন, তারা প্রতি মুহূর্ত মনে করেন দেশ স্বর্গরাজ্য হয়েছে। কিছুদিন আগে এক মন্ত্রী বলেছেন, আমরা বেহেশতে আছি। নির্বোধকে কোনোভাবে বোঝানো যায় না। যদি নিজেরা বোঝে, তাহলে অন্যের বোঝাতে হয় না। আমি খুব অস্বস্তিতে আছি।”
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের টাঙ্গাইল শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বদিউর রহমান বদির সভাপতিত্বে বর্ধিত সভায় আরও বক্তব্য দেন দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তালুকদার বীর প্রতীক, সদস্য শামীম আল মনছুর আজাদ সিদ্দিকী, বাসাইল পৌরসভার মেয়র রাহাত হাসান টিপু, জেলার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এ টি এম সালেক হিটলু, সহসভাপতি আব্দুল কুদ্দুস, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল গফুর।