Published : 20 Sep 2026, 07:26 PM
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় পুলিশ এক তরুণ ও দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে; যাদের সঙ্গে তার ‘অসম বয়সি বন্ধুত্ব’ ছিল।
এই তিনজনের একজন সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯); যাকে হত্যাকাণ্ডের ‘মূল হোতা’ হিসাবে দাবি করেছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, কুমিল্লার সদর দক্ষিণের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সানন্দা মৈশান বাড়ি এলাকার নূরে আলমের ছেলে সাইফুল ইসলাম তুহিন। তার বয়স ১৯। ২০২৫ সালে কুমিল্লা সিটি কলেজ থেকে একাদশ শ্রেণিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর তিনি ‘ড্রপআউট’ হন।
রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, যে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে তিনজন মিলে হত্যা করেছে, সেটি তুহিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বাসার বিছানার তোষকের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার বিকালে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। রাত পর্যন্ত অপ্রতিম বাসায় না ফেরায় তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন।
পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
অপ্রতিম কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
এ ঘটনায় সিসিটিভি ভিডিও দেখে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) নামে একজনকে প্রথমে আটক করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুই কিশোরকে (১৫) আটক করে পুলিশ। তারা ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
এ ছাড়া আবদাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. সিয়ামকে (১৯) হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কথা জানিয়েছে পুলিশ ।
শনিবার মধ্যরাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেছেন। এতে তুহিন ও দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার দেখানো কথা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
‘তুহিনই প্রথম আঘাত করে’
হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “ঘটনার দিন (শুক্রবার) বিকাল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে শালবন নামক স্থানে চারপাশে পাহাড় ঘেরা নির্জন বনের ভেতরে অপ্রতিমের আইফোনটি তিনজন মিলে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অপ্রতিম তাতে বাধা দেয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
“এর মধ্যে প্রথমে তুহিন, পরবর্তীতে সঙ্গে থাকা দুই কিশোর বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত করে তিনজন। এরপর তুহিন অপ্রতিমের আইফোনটি নেয় এবং বাকি দুই কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।”
এ ছাড়া সিয়াম নামে আরেক কলেজ ছাত্রকে আটকের তথ্য দিয়ে আনিসুজ্জামান বলেন, “তার বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বিষয় এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা, তা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।
পড়াশোনা ছেড়ে বাবার খামারে
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী রকি উল হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশে সানন্দা গ্রামের আশপাশের এলাকাগুলোতে তুহিনের অবাধ যাতায়াত রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে তার যাতায়াত কখনো চোখে পড়েনি।
তিনি বলেন, লালমাই পাহাড়ের যে জায়গায় অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে তার পাশেই তুহিনের বাবার মুরগির খামার। পড়াশুনা ছেড়ে দেওয়ার পর তুহিন ওই খামারে মাঝে মাঝে কাজ করে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় বিশেষ করে তার নাম আরও ছড়িয়ে পড়ে।
রকি উল হাসান বলেন, “এর আগে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুহিনকে সংঘবদ্ধ কিছু ছেলেপেলের সঙ্গে দেখা গেছে। এরা অনেকটা ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ মত করে চলাফেরা করত। বয়সের কারণে হয়ত তুহিনকে এদের মধ্যে ‘লিডার’ ছিল। এগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে হয়ত ছিল।”
তবে কুমিল্লা জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “তুহিনের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো অভিযোগ বা মামলা নেই। তবে সে ভালো না। তার বিরুদ্ধে চুরি ও মাদকের অভিযোগ এলাকা থেকে পাওয়া গিয়েছে। সে কিছু কিছু যুবকের ‘গ্যাং’ বানিয়ে চলতে পছন্দ করত। এ নিয়ে তার এলাকায় একটি আধিপত্য তৈরির ইচ্ছাও থাকতে পারে।”
পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, হত্যায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার তুহিন ও আরও দুই কিশোর অপ্রতিমের পূর্বপরিচিত। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বয়সী শিশু, কিশোর ও যুবকদের মেলামেশা রয়েছে।
‘তুহিনের নামে মামলা-অভিযোগ নেই’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সালমানপুর ও সানন্দা এলাকার মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাংলোর সামনে ‘এনজয়’ নামে একটি ক্যাফেতে তুহিন ও তার সহযোগীদের কয়েকজন নিয়মিত আড্ডা দেয়। এরা বিভিন্ন সময়ে মোটরসাইকেল নিয়ে এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়।
তুহিনের পারিবারিক অবস্থা ভালো; তারা এক ভাই, এক বোন। পরিবারের আদরের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে এক ধরনের ‘বখাটেপনা’ ছিল।
মৈশান এলাকার একজন বাসিন্দা দাবি করেছেন, কিছুদিন আগে এলাকার একটি ছেলের মোটরসাইকেল নিয়ে ঝামেলা হয়। তখন তারা জানতে পারেন, দুই লাখ টাকা দামের সুজুকি মোটরসাইকেলটি নিয়ে তুহিন আর ফেরত দেয়নি।
যদিও পরে এর শেষ কীভাবে হয়েছিল তা জানেন না বলেও জানান ওই বাসিন্দা।
আর তুহিনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা ও অভিযোগ না থাকার কথাও বলেছেন কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।