Published : 11 Apr 2026, 01:52 AM
সমুদ্রের ডাক শুনে বড় হয়েছেন মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি। শৈশবে কবে প্রথম নৌকায় ভেসে দরিয়ায় গিয়েছিলেন, চল্লিশোর্ধ ইলিয়াস মনেও করতে পারেন না। দরিয়ার ভয় বলতে ছিল শুধু তুফান। সেটা মোকাবিলা করে বেশ কয়েকবার জীবন নিয়ে ঘরেও ফিরেছেন।
পোড় খাওয়া সেই ইলিয়াসের কাছে এখন দরিয়ায় তুফানের চেয়েও বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আরাকান আর্মি। যখন-তখন কোনো কারণ ছাড়াই সমুদ্র থেকে বাংলাদেশের জেলেদের নৌকাসহ অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমানের রাখাইন রাজ্যের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী।
ছয় মাসের বেশি সময় আরাকান আর্মির হাতে বন্দি থাকার পর বাড়ি ফিরতে পারা সুঠাম দেহের ইলিয়াস শরীরের চামড়া টেনে টেনে দাগ দেখিয়ে বিভীষিকার সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “হাড় আর চামড়া নিয়ে ফিরে আসছি। গোসত ছিল না। নির্যাতন করে আমার দুইটা দাঁত ভেঙে দিছে।”
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহ পরীর দ্বীপের সৈকতে দাঁড়িয়ে ইলিয়াস মাঝি যখন কথা বলছিলেন, তখন পাশে তার দুই ছেলেও ছিল। তাদেরকেও বাবার সঙ্গে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল আরাকান আর্মি।
চলতি বছর ১৬ ফেব্রুয়ারি তারা ছাড়া পেয়ে ফিরে আসেন। সন্তানসহ কেন তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এখনও তা স্পষ্ট না তার কাছে।
ধরে নিয়ে যাওয়ার সেই দিনের কথা বলছিলেন ইলিয়াস মাঝি। ঋণ করেই নতুন একটি ট্রলার তৈরি করেছিলেন। দুই ছেলেকে নিয়ে সেই ট্রলারে করে গিয়েছিলেন নাফ নদীতে মাঝ ধরতে।
বাংলাদেশি জেলেদের অপহরণের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে, সে কারণে মাছ ধরতে গেলে সবসময় সতর্ক থাকতেন ইলিয়াস। সেদিনও সর্তক ছিলেন। বাংলাদেশের জলসীমাতেই মাছ ধরছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। 
“আমরা বাংলাদেশের অংশেই ছিলাম, আরাকান সীমান্তে ঢুকিনি। কিন্তু আরাকান আর্মি স্পিডবোট নিয়ে ধাওয়া করল। তাদের স্পিডবোট আর আমার ট্রলার। পালানোর তো সুযোগ নাই। অস্ত্রের মুখে দুই ছেলেসহ আমাদের চারজনকে ধরে নিয়ে গেল।
“দীর্ঘ ছয় মাস আরাকান আর্মির হাতে ছিলাম। আমি একাতো না। আরও অনেকে আছে। ওখানে খাওয়া-দাওয়া বেশি কষ্টের। দিনরাতে শুধু এক বেলা খাওয়া জোটে কপালে। আমার দুই ছেলের কষ্ট দেখে মনকে ধরে রাখতে পারতাম না। আরকান আর্মির নির্যাতনে আমার দুইটা দাঁত পড়ে গেছে।”
ইলিয়াস মাঝি বলছিলেন, তিনি ও তার দুই ছেলে ফিরে এসেছেন। কিন্তু তার ট্রলারটি ফেরত দেয়নি আরাকান আর্মি। অনেক ঋণ করে তিনি ট্রলারটি তৈরি করেছিলেন।
তাদের কেন ধরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখল, কেন নির্যাতন করল কিংবা কেনইবা ছেড়ে দিল–তা স্পষ্ট নয় ইলিয়াস মাঝির কাছে।
এখন এক দিকে পরিবারের দায়, অন্যদিকে ঋণ শোধের চাপ। এই দুই চাপ সামাল দিতে তাকে আবার সেই বিপদ মাথায় নিয়ে সমুদ্রে নামতে হচ্ছে।
ইলিয়াস বলছিলেন, “এখন আমরা অসহায়। মাছ ধরার কাজ ছাড়াতো আর কিছু পারি না। এটা ছাড়া পরিবার চালানো কোনোমতেই সম্ভব না।”
ভয় লাগে না? আবার যদি আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়?
প্রশ্ন শুনে ইলিয়াস বললেন, “ভয় পেলেতো পেটে ভাত জুটত না। নিয়ে গেলে আর কী করা! কতজনরেইতো নিয়ে যাচ্ছে। সবাইতো ফিরছেও না।”

চারজন ফিরলেও আমান ফেরেননি
মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অংশটি রাখাইন রাজ্য। যুদ্ধে জর্জরিত এ রাজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা এখন নিয়ন্ত্রণ করছে আরাকান আর্মি।
সশস্ত্র এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বাংলাদেশি জেলে অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটছে।
এর মধ্যে দুটি নৌকা থেকে ১২ মার্চ তিনজন এবং ১৭ মার্চ আরও চারজনকে শাহপরীর দ্বীপ সংলগ্ন নদীর মোহনা থেকে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায় বলে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধির ভাষ্য।
ধরে নিয়ে যাওয়া অনেক জেলেকে মুক্তিও দিয়েছে আরাকান আর্মি। জেলেদের ভাষ্য, শুরুর দিকে যাদের ধরে নেওয়া হয়েছিল; তাদের অনেকেই মুক্তি পেয়ে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন।
সেসময় অপহৃত ট্রলারও ফেরত দিত আরাকান আর্মি। কিন্তু এখন জেলে-মাঝি ফিরে এলেও মাছ ধরার ট্রলার কিংবা মালামাল ফেরত দিচ্ছে না। ট্রলার ভর্তি মাছ মিয়ানমারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ফিরে আসা জেলেদের অনেকেই নির্যাতনের অভিযোগও করছেন।
এখন পর্যন্ত কতজন জেলে অপহৃত হয়েছেন, কত জেলে ফিরে এসেছেন, কত জেলে আরাকার আর্মির হাতে আটক আছেন তার কোনো সরকারি হিসাব নেই।
তবে জেলে সমিতি ও ট্রলার মালিক সমিতির ধারণা, আরাকান আর্মির হাতে আটক থাকা জেলের সংখ্যা দেড়শর কাছকাছি হবে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সমুদ্রে মাছ ধরার সময় চার সঙ্গী ও ট্রলারসহ জেলে আমান উল্লাকে (৫০) ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি।
আমানের কাড়ি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মাঝেরপাড়ায়। ১৬ ফেব্রুয়ারি চার সঙ্গীকে ছেড়ে দিলেও আরাকান আর্মি তাকে মুক্তি দেয়নি।
আমানের ছেলে জিল্লুর রহমান বলেন, “বাবা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সেটাও জানি না। বাবা না থাকায় সংসারে কোনো শান্তি নেই। পরিবার খুব আর্থিক কষ্টের মধ্যে আছে। বাবাকে উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালাতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।”
অভাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, যারা ফিরে এসেছেন তাদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। সেই জেলেরা জানিয়েছেন, আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যাওয়ার পর একেকজনকে একেক জায়গায় রাখে। তারা চারজন এক ক্যাম্পে ছিলেন। তাদের চারজনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমান উল্লাহর ব্যাপারে তারা আর কিছু জানেন না।
একই অবস্থা টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সাজেদা বেগমের। তার স্বামী আবদুস শুকুর ছয় মাসের বেশি সময় ধরে আরাকান আর্মির হাতে বন্দি।
সাজেদা বলছিলেন, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে স্বামী অপহৃত হওয়ার পর বিজিবি ও উপজেলা প্রশাসনকে তিনি লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে আরকান আর্মির বন্দিশালা থেকে ৭৩ জেলে ফিরে এলেও তার স্বামী ফেরেননি। ছয় মাসের মধ্যে একবারও তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।
তিনি বলেন, “নিজের দেশের সীমানার মধ্যে মাছ ধরাও এখন নিরাপদ না। আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়। সরকার নিরাপত্তা দিতে পারে না। অবিলম্বে আমার স্বামীকে উদ্ধারে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
ঘরে ঘরে কান্নার রোল
টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন জেলে পাড়ায় অনেক পরিবারই এখন আরাকান আর্মির আতঙ্কে ভুগছে। পরিবারের কর্তা বা সন্তান সাগরে মাছ ধরতে গেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত তারা দুশ্চিন্তায় থাকেন। স্বজনের ফেরার অপেক্ষায় সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকেন তারা।
শাহ পরীর দ্বীপ জালিয়া পাড়ার মাহামুদুল্লাহর ট্রলারে করে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মাছ শিকারে যান মোহাম্মদ শাহেদ, মোহাম্মদ ইউনুস, শাহ আলম, মোহাম্মদ আব্বাস ও আবুল হোসন। এক মাসের বেশি সময় পার হলেও তাদের কোনো খোঁজ নেই।
মোহাম্মদ আব্বাসের স্ত্রী শামসুন্নাহার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার স্বামী এবং অন্যরা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন- তা তারা জানেন না।
আরকান আর্মি বাংলাদেশের জেলেদের ধরে নিয়ে গেলে অনেক সময় মিয়ানমারের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে জেলেদের ছবি প্রকাশিত হয়। এখনো পর্যন্ত এই পাঁচজনের ছবি কেউ কোথাও দেখেননি। 
শামসুন্নাহার বলেন, “দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে কষ্টের জীবন যাচ্ছে। স্বামীই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। ছেলেমেয়েরা শুধু জিজ্ঞেস করে, বাবা কবে আসবে।”
একই পাড়ার নিখোঁজ জেলে আবুল হোসেনের স্ত্রী খুরশিদা বেগম বলেন, “পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে এখন খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি। স্বামীর চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছি। টাকার অভাবে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”
জেলেরা কি মিয়ানমারে ঢুকছেন?
ফিরে আসা অনেক জেলে এবং মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই নাফ সীমানায় মাছ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু তার পরেও কিছু জেলে ট্রলার নিয়ে সেখানে মাছ ধরতে যান এবং বিপদে পড়েন।
শাহ পরীর দ্বীপ বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহামদ হাসান বলেন, নাফ নদীর মোহনায় নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় ডুবোচরের কারণে বাংলাদেশ অংশে পানির গভীরতা কমে গেছে। কিন্তু মিয়ানমারের জলসীমা ঘেঁষে পানির গভীরতা বেশি থাকায় অনেকে ভাটার সময় সেই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন।
তবে এর বাইরে আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে। মাছ ধরার সময় তীব্র স্রোতে কখনও কখনও নৌকা ভেসে মিয়ানমারের অংশে চলে যায়।
একই কথা বলেছেন নৌকার মাঝি নুরুল আলম। তার ভাষায়, “আগেও বিভিন্ন সময় বাস্তবতার কারণে এমনটা হয়েছে। কিন্তু তখন মিয়ানমার আটকায় নাই। এখন আরাকান আর্মি আসার পরে কড়াকড়ি শুরু করেছে।”
সমিতির সভাপতি গফুর আলম বলেন, “রাখাইন রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নাফ নদের মিয়ানমার অংশে মাছ ধরায় এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে আরাকান আর্মি। তারা বাংলাদেশি জেলেদেরও মাছ ধরার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করছে।
“সাগর থেকে মাছ ধরে ফেরার সময় অস্ত্রের মুখে জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি। জেলেরা এখন সাগরে যেতে ভয় পান। এভাবে চলতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ করে দিতে হবে।”
তার দাবি, “বিভিন্ন সময় নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে ট্রলারসহ ধরে নিয়ে যাওয়া অন্তত ১৪০ জেলে আরাকান আর্মির হাতে জিন্মি রয়েছেন। তাদের কারও কোনো খোঁজখবর পাচ্ছি না। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের কাছে দাবি জানাই, যত দ্রুত সম্ভব আটক জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।”
এজন্য মিয়ানমার সীমান্তে নাফ নদী ও সাগর পথে সীমানা চিহ্নিত না থাকাকে ‘মূল সমস্যা’ বলে মনে করেন সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম।
তিনি বলেন, “নাফ নদীর মোহনা এখন কেবল সীমান্ত নয়; এটি হয়ে উঠেছে জেলেদের জীবিকার ঝুঁকি। প্রায় সময় নাফ নদীর মোহনা থেকে জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি।
“সীমানা চিহ্নিত না থাকায় জেলেরা বুঝতে পারেন না কোন সীমানায় আছেন। এছাড়া অনেক সময় জোয়ারের পানিতে ভেসে জেলেরা মিয়ানমারের সীমানায় চলে যান। প্রশাসন ঘাটে গিয়ে জেলেদেরকে সতর্ক করছে। কিন্তু তারপরও কাজ হচ্ছে না।”
‘সতর্ক থাকতে হবে’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্য দখলের পর প্রায়ই নাফ নদী ও সাগর থেকে বাংলাদেশি জেলেদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
“এখন মিয়ানমারে কত জেলে আটক রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কারণ অনেক সময় আটক জেলে পরিবারগুলো উপজেলা প্রশাসনকে জানায় না। ধরে নিয়ে যাওয়া জেলেদের ফেরত আনতে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আমরা আশাবাদী, তারা দ্রুত ফিরে আসবেন। তবে জেলেদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন বাংলাদেশের জলসীমা অতিক্রম না করেন।”