Published : 19 Jul 2026, 12:39 PM
ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অভিযোগ করায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে।
শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী খাইরুল খন্দকারকে মারধর করা হয় বলে তিনি নিজে এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
শাহপরাণ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী খাইরুলকে সিলেট নগরীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় অভিযোগের মুখে থাকা দুজন হলেন- পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের যোগাযোগ সম্পাদক হাসিবুর রহমান এবং পরিসংখ্যান বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও সহ-দপ্তর সম্পাদক তারেক রহমান। তারাও একই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
এ ঘটনার প্রতিবাদ এবং জড়িতদের বিচারের দাবিতে রাত শনিবার ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এরপর রাত সাড়ে ৩টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম সেখানে গিয়ে তিন কার্যদিবসের মধ্যে এ ঘটনা তদন্ত করে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
প্রত্যক্ষদর্শী অর্থনীতি বিভাগের আবরার বিন সেলিম বলেছেন, “ঘটনার সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের একটি দোকানে বসে ছিলাম। তখন দেখি, পরিসংখ্যান বিভাগের তারেক ভাই ও পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের হাসিব ভাইয়ের সঙ্গে খাইরুলের তর্কাতর্কি হচ্ছে।
“আমি এগিয়ে গিয়ে তাদের সিন ক্রিয়েট করতে বারণ করি এবং বিভাগের সিনিয়দের মাধ্যমে বিষয়টা সমাধান করতে বলি।”
তিনি বলেন, “তখন তারেক ভাই আমাকে হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ক্যান্টিনের খাবার নিয়ে খাইরুলের করা অভিযোগের ব্যাপারে জানান। আমি তারেক ভাই ও হাসিব ভাই দুজনের কথা শুনি। শেষে যখন খাইরুলের বক্তব্য শুনছিলাম, তখন হাসিব ভাই বারবার তার কথার মধ্যে ইন্টারফেয়ার করছিল।

“এক পর্যায়ের তার কথার জবাবে খাইরুল বলেন, ‘ভাই, আপনি কি দলীয় প্রভাব দেখাচ্ছেন? আমি যদি এ নিয়ে কথা বলি তাহলে সেটা হল প্রভোস্টের সঙ্গেই বলব। আপনাদের সঙ্গে কেন কথা বলব?”
আবরারের ভাষ্য, “তখন হাসিব ভাই খাইরুলের বুকে জোরে লাথি মারেন। এতে তিনি নিজেই মাটিতে পড়ে যান। এরপর তারেক ভাই খাইরুলের মাথার পেছনে ঘাড়ের ওপরের সংবেদনশীল স্থানে আঘাত করতে শুরু করেন।”
এভাবে হাসিব ও তারেক ভাই মিলে খাইরুলকে খাইরুলকে এতটাই নির্মমভাবে মারধর করতে থাকেন যে, আমি আমার পুরো জীবনে কখনও দেখিনি।”
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী খায়রুল খন্দকার বলেন, “শাহপরাণ হলের ক্যান্টিনের খাবারে ছাত্রদের পচা মাছের তরকারি পরিবেশন করা হচ্ছে অভিযোগ তুলে প্রভোস্ট স্যারকে মেনশন দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মেসেজ দেই। সেখানে তাকে খাবারের মান ভালো করতে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাই। এ নিয়ে শুক্রবার বিকালে ছাত্রদলের তারেক ভাই আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে আমাকে ডেকে পাঠান। তার কাছে গেলে তিনি বলেন, হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ওই পোস্টের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনক্ষুন্ন হয়েছেন।
“সেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কে? আমি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি হলের প্রভোস্ট স্যার। এরপর তিনি আমাকে প্রভোস্ট স্যারের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন। আমি বিষয়টি শুনে সেখান থেকে চলে আসি।”
খাইরুল বলেন, “এরপর রাতেই ক্যান্টিনে গিয়ে দেখি নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। এনিয়ে প্রভোস্ট স্যারকে মেনশন করে হলের গ্রুপে আবার একটি পোস্ট দিই। সেখানে লিখি, ‘ক্যান্টিনে আমাদের যা-তা খাওয়ানো হচ্ছে’।’”
“এরপর শনিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে গেলে হাসিব ও তারেক আমাকে হলের গ্রুপে খাবারের পোস্ট দেওয়া নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তখন আমি বলি যে, এ বিষয়ে কিছু বলার থাকলে হল প্রভোস্ট আমাকে বলবে, আপনারা কেন বলবেন? তখন হাসিব আমাকে জোরে বুকে লাথি মারে ও তারেক মাথার পেছনে ও মুখে আমাকে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। এরপর আশপাশ লোকজন কয়েকজন এগিয়ে এলে সিনিয়র ভাই ও বন্ধুরা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক তারেক রহমান বলেন, “হলের গ্রুপে খাবারের বিষয়ে কথা বলায় প্রভোস্ট স্যার একটু মন খারাপ করছেন। আমার বিষয়টি খায়রুলকে বুঝাচ্ছিলাম।
“কিন্ত সে জুনিয়র হয়েও আমাদের সঙ্গে খুব বাজে আচরণ করে। যেটা সিনিয়র হিসেবে আমাদের কাছে খুব খারাপ লাগছে। তখন এক কথা, দুই কথা হইতে হইতে বিষয়টা বড় পর্যায়ে চলে গেছে।”
তারেকের ভাষ্য, “এক পর্যায়ে সে তেড়ে এসে আমার ‘শরীরে টাচ’ করছে। তখন হাসিব বাধা দিতে গেলে ঘটনাটি হাতাহাতি পর্যায়ে চলে যায়। এ ঘটনায় হাসিবের চশমা ভেঙে গেছে; হাত কেটে গেছে। তার ফোন পুরোটা ডেড হয়ে গেছে।”

এ বিষয়ে জানতে হাসিবুর রহমানকে কল দিলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আপনার নাম উল্লেখ করে পোস্ট দেওয়ার পর এ ঘটনা ঘটেছে- এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহপরাণ হলের প্রভোস্ট ইফতেখার আহমদ বলেন, “এখানে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কাউকে মারধর করার জন্য মদদও দেইনি।
“হলের সমস্যা নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী অভিযোগ করলে আমি আমার রুমে ডেকে তার সঙ্গে কথা বলে সমাধান করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী আমার কাছে সমান।”
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। ঘটনার যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হবে।”