Published : 06 May 2026, 02:07 AM
একসময় সবুজে আচ্ছাদিত সিলেটের সুউচ্চ শাহ আরেফিন টিলা গত প্রায় দুই দশকে ‘পাথর-খেকোদের’ তাণ্ডবে এখন রীতিমত ‘সাগরে’ পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে হযরত শাহ জালালের (রহ.) সঙ্গী হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) স্মৃতিবিজড়িত ধর্মীয় স্মৃতিচিহ্নও বিলীন হয়ে গেছে।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার এই টিলার ভাঁজে ভাঁজে লালচে-বাদামি আঠালো মাটির নিচে স্তরে স্তরে ছোট-বড় অসংখ্য পাথর; যা স্থানীয়দের কাছে ‘পাথরের খনি’ নামে পরিচিত ছিল। রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসৎ কর্মকর্তারা ‘ভাগেযোগে’ অবৈধ ‘বোমা মেশিন’ বসিয়ে পাথর উত্তোলন করে এই লুটপাট চালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শাহ আরেফিন টিলায় এখন অন্তত ছোট-বড় ১০০ গর্ত আছে; যার গভীরতা ২০ থেকে ৩০০ ফুট পর্যন্ত। তবু থামছে না ‘পাথর-খেকোদের’ তাণ্ডব। রাতের আঁধারে ট্রলি ও ট্রাক্টর দিয়ে পাথর যাচ্ছে ভোলাগঞ্জ এলাকার ক্র্যাশার মিলগুলোতে। উপরে থাকে বালু, আর নিচে পাথর। ট্রাক থেকে টাকা তোলা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগামাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই এখানে পাথর লুটপাট চলছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর’ ব্যাপক হারে পাথর লুট শুরু হয়। শুধু শাহ আরেফিন টিলা নয়, সিলেটের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্র থেকেও ‘বালু-পাথর লুটের মহোৎসব’ শুরু হয়েছিল তখন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে প্রশাসনের ‘তৎপরতা’ কিছুটা বাড়ে। তখন কদিন পাথর উত্তোলন বন্ধ ছিল।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর লুটেরারা আবার ‘দ্বিগুণ উৎসাহ’ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শাহ আরেফিন টিলায়। ফলে এখানে ‘মূল’ টিলার প্রায় কিছুই নেই; ‘৯০ শতাংশ’ পাথর লুট হয়ে গেছে। পাথর তুলে নেওয়ার পর যে গর্ত হয়েছে, তাতে পাশের বসতভিটাগুলোও পড়েছে ভাঙনের মুখে।
স্থানীয় কয়েকজন ও পরিবেশবাদীরা বলছিলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারের সময় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা পাথর কোয়ারি চালুর বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এতে ‘পাথর-খেকোদরা’ আরও উৎসাহ পেয়েছে।
শাহ আরেফিন টিলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, “আমি ওই এলাকায় গিয়েছি; ওইখানকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। এটা যে কী যন্ত্রণা দিচ্ছে… টিলা তো নাই, সাগর বানাই ফেলছে।
“ওইখানকার স্থানীয় লোকজন এত বেপরোয়া। স্থানীয় লোকজনই হচ্ছে মূল সমস্যা। ঠিক আছে, আমরা দেখছি কী করা যায়, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
ধর্মীয় ঐতিহ্য মুছে এখন ‘কঙ্কাল’
লোকমুখে প্রচলিত আছে, প্রায় ৭০০ বছর আগে হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) খাসিয়া পাহাড় এলাকা পরিভ্রমণে এসে এই টিলার চূড়ায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মাঝে-মধ্যেই বসতেন। পরে ওই স্থানে তার নামে আস্তানা গড়ে তোলেন ভক্তরা। সেই থেকেই চিকাডহর মৌজার ওই টিলাটির নামকরণ। বড় আকারের কালো রঙের পাথর দিয়ে সেখানে সীমানা গড়ে তোলা হয়। আস্তানায় ওরসও হতো। বিভিন্ন স্থান থেকে জড়ো হতেন শাহ আরেফিনের ভক্তরা।
আড়াই দশক আগেও এখানে ‘উঁচু ও বিস্তৃত’ দুটি টিলা ছিল। পর্যটন ছাড়াও ধর্মীয় কারণে অনেক মানুষ এখানে আসতেন। সরকারি ‘খাস খতিয়ানে’ ১৩৭ দশমিক ৫০ একর জায়গাতে টিলাটির অবস্থান। এ ছাড়া টিলার আশপাশে আরও প্রায় ৩৫০ একর জায়গায় ছিল পাথর।
স্থানীয়রা বলছেন, এখানে হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) এর আস্তানা, মসজিদ ও কবরস্থান ছিল। গত দেড় বছরে শুধু শাহ আরেফিনের (রহ.) আস্তানাই নয়; পুরো টিলা ও পাশের মসজিদ-কবরস্থানের জায়গাও ধ্বংস করে পাথর উত্তোলন করেছে লুটেরারা।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আইনজীবী ফরহাদ খন্দকার বলেন, “টিলার অবশিষ্ট কিছু নেই; শুধু গর্ত আর গর্ত। গর্তের গভীরতা ২০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হবে। শাহ আরেফিন টিলা পর্যটন স্পট ছিল এবং ওইখানে মাজারকে কেন্দ্র করে ছোটখাটো ওরসও হতো। আমরা দেখতে যেতাম, বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন আসত। টিলা ধ্বংসের সঙ্গে সেই ধর্মীয় ঐতিহ্যও হারাল। এটার পুনরুদ্ধার সম্ভব না।”
লুটপাটের মধ্যে ২০০৯ সালে সেখানে পরিবেশ অধিদপ্তর একটি জরিপ চালিয়েছিল। ওই বছরের ১১ নভেম্বর প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে ১৩৭ দশমিক ৫০ একরের টিলাকে ‘কঙ্কাল’ বলা হয়। এখন মসজিদ ও কবরস্থানের অংশবিশেষ ছাড়া সব এলাকাই ধ্বংস হয়ে গেছে।
পরিবেশ গবেষক ও সংগঠক অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, “১৩৭ একর এলাকার পুরোটা দেখলে মনে হবে, যুদ্ধ পরবর্তী ধ্বংস্তূপ, বিরাণ ভূমি। পরিবেশ অধিদপ্তরের রিপোর্টেই বলা হয়েছে ‘কঙ্কাল’। স্থানীয় প্রশাসন এ টিলা রক্ষায় ব্যর্থ বা তাদের ব্যর্থ করা হয়েছে।
“এ ইস্যুটিকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিধ্বনিত করতে হবে। সরকারের উর্ধ্বতন পর্যায় থেকে কঠোর পদক্ষেপ না এলে অবশিষ্টটুকুও থাকবে না।”
বিএনপি আমলে ‘পাথর কোয়ারি’ ইজারা
সর্বপ্রথম বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯২ সালে সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোর ইজারা কার্যক্রম চালু হয়। সর্বশেষ ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল শাহ আরফিন টিলার পাথর কোয়ারি।
কিন্তু ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অবৈধভাবে এবং ইজারার শর্ত ভেঙে ধ্বংসযজ্ঞ চলে আরেফিন টিলা ও সেখানকার ‘পাথর কোয়ারিতে’।
সেখানকার ১৩৭ একর জায়গার মধ্যে ১০ একর ছিল মাজার, তথা আস্তানার ওয়াকফকৃত জায়গা। বাকি অংশ সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। কোয়ারি তালিকাভুক্তি থেকে বাদ পড়লে ওয়াকফের জায়গা ছাড়া বাকি অংশ চলে যায় খাস খতিয়ানে।
স্থানীয়রা বলছেন, অবৈধভাবে টিলার পাথর বিক্রিতে জড়িত ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের ওই এলাকার নেতাকর্মীরা মিলেই অবৈধভাবে টিলার পাথর উত্তোলন করেন। কেউ তাদের অবৈধ কাজের প্রতিবাদ করলে নেমে আসে নির্যাতন। তাই স্থানীয়রা ভয়ে মুখ খুলতে চান না। তবে স্থানীয়দের কেউ-কেউ আবার টিলার জায়গাতে নিজেদের ভূমি দাবি করে বিক্রিও করেছেন ‘পাথর-খেকো’ চক্রটির কাছে।

‘বোমা মেশিনের’ রাজত্ব
গত সপ্তাহে শাহ আরেফিন টিলায় গিয়ে দেখা গেছে, টিলার চারপাশে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত আর ‘বোমা মেশিন’ পড়ে আছে। গর্তের চারপাশে টিলার মাটি ‘স্তূপ’ করে রাখা হয়েছে। এসব গর্তের পানি ‘নীল’ আকার ধারণ করেছে; মূলত গর্তের গভীরতা বেশি থাকায় পানির রং নীল দেখাচ্ছে। আর নিচে বালু-পাথর থাকায় পানি স্বচ্ছ নীল হয়েছে। কোনো কোনো গর্তে একটি, কোনোটায় আবার চারটি ‘বোমা মেশিন’ রয়েছে। টিলা এলাকায় অন্তত ২০০টি ‘বোমা মেশিন’ আছে।
নদী বা কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলনের জন্য এক ধরনের শক্তিশালী ড্রেজার বা পাম্প মেশিনই ‘বোমা মেশিন’ নামে পরিচিত। প্রায় দুই দশক আগে এই যন্ত্র নিষিদ্ধ করে উচ্চ আদালত।
এ অবৈধ যন্ত্র ব্যবহার করে পাথর উত্তোলনের কারণে এখন শাহ আরেফিন টিলাকে দূর থেকে দেখে মনে হবে কোনো ‘ধ্বংসস্তূপ’। দেখে বোঝার উপায় নেই এক সময় ‘সবুজে মোড়ানো’ ছিল এ টিলা। চারপাশে ছিল নানা ধরনের গাছপালাও। বর্তমানে টিলায় নেই একটু সবুজের চিহ্ন। টিলার ‘লালচে-বাদামি’ মাটি আর ছোট ‘সিঙ্গেল’ পাথর ও বালু পড়ে আছে চারপাশে।
এদিকে সুউচ্চ একটি টিলার একটু অংশ অবশিষ্ট রয়েছে। তবে তার চারপাশে রয়েছে বড় বড় গর্ত। গর্তের ভেতরে পড়ে আছে ছোট-বড় পাথর। টিলার পাশ দিয়ে পাথর পরিবহন করায় গাড়ির চাকার টায়ারের দাগ পড়ে গেছে রাস্তায়। দেখে মনে হচ্ছিল, একটু আগে পাথর সরানো হয়েছে। কোনো কোনো গর্তের পাড়ে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে বসার জন্য বানানো হয়েছি ঝুপড়ি।
টিলাটির পশ্চিম দিকে থাকা বাসিন্দাদের বাড়িঘরের পাশেই গর্ত করা হয়েছে। আর তাদের বাড়িঘরের আশেপাশে পাথর আর পাথর। এসব বাড়ির বাসিন্দাদের কেউ কেউ ঘর থেকে বের হয়ে, আবার ঘরের ভেতরে চলে যান। কেউ কোনো কথা বলতে চাননি, তবে তারা দেখছেন কে এসেছে, কী করছে।
টিলার চারপাশে নীরবতা, মাঝে মাঝে কেউ চলাচল করছেন টিলা লাগোয়া রাস্তাটি দিয়ে। সে দিন টিলায় কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে টিলার পূর্বদিকে ট্রাক্টরে পাথর বোঝাই করতে দেখা গেছে। পরে টিলা থেকে ফিরে আসার সময় ট্রাক্টরে উপরে বালু বিছিয়ে তার নিচে পাথর বহন করতে দেখা যায়।
টিলাটির উত্তর দিকে গিয়ে দেখা যায়, বড়শি দিয়ে মাছ ধরছেন কয়েকজন। আর চারপাশে রয়েছে বিশাল বিশাল গর্ত। কেউ প্রথমবার সেখানে গেলে মনে করবেন, এগুলো ‘জলাশয়’, আগে যে এখানে টিলা ছিল, তা বুঝতেই পারবেন না।
স্থানীয় এক যুবক বলছিলেন, “পুরো টিলা এলাকায় ১০০ গর্ত রয়েছে। আর এসব গর্তে কম হলেও ২০০টি ‘বোমা মেশিন’ আছে, সুয়োগ পেলেই যেগুলো চালিয়ে পাথর তোলা হয়। আর ‘বোমা মেশিন’ চালানোর সময় অপরিচিত কাউকে টিলা এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। মেশিন চালানোর সময় আশেপাশে বিকট শব্দ থাকে, তা শুনেই বুঝা যায় পাথর তোলা হচ্ছে। আগে পর্যটক আসত, বর্তমানে আসে না এসব কাজ চলার কারণে।”

বসতবাড়ির আঙিনায় পাথর
ভোলাগঞ্জ এলাকার শাহ আরেফিন পয়েন্ট থেকে যেতে হয় টিলা এলাকায়। সেখানে যেতে সড়ক দিয়ে কিছুটা পথ এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে আশপাশের বাসিন্দাদের বাড়িঘরে রাখা পাথরের স্তূপ। নোয়াগাঁও, বাবুলনগর, জালিয়ারপার, শাহ আরেফিন বাজার, চিকাডহর এলাকার রাস্তার দুইপাশে, ফসলি জমিতে, বাড়ির উঠানে রয়েছে পাথরের স্তূপ।
টিলা থেকে ফিরে আসার সময় বাবুলনগর গ্রামের সামনে পুলিশ সদস্যদের বসে থাকতে দেখা যায়। তার কিছুটা সামনেই চোখে পড়ে ফসলি জমি দিয়ে পাথর পরিবহনের চিহ্ন। পাকা রাস্তায় পাথরবাহী গাড়ি উঠতে গিয়ে মাটিতে পড়ে আছে পাথর।
এ সময় সঙ্গে থাকা এক যুবক বলেন, “অনেক সময় গাড়ি শাহ আরেফিন বাজারের রাস্তা ব্যবহার না করে মাটির রাস্তা দিয়ে এসে পাকা সড়কে উঠে। তারপর ভোলাগঞ্জ এলাকার পাথর ভাঙার মিলে চলে যায়। তবে যেদিকেই পাথর পরিবহন করা হয় কেন, হিসাব কিন্তু পুলিশের কাছে যায়।”
ভোলাগঞ্জের পাথর ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শাহ আরেফিন টিলার প্রতি ঘনফুট পাথর ৯০ থেকে ৯২ টাকায় বিক্রি করা হয় ক্র্যাশার মেশিন বা পাথর ভাঙার কল মালিকদের কাছে। কল মালিকেরা ওই পাথর কয়েকটি আকারে ভেঙে সেগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করেন। মিল মালিকেরা ‘সিঙ্গেল’ পাথর ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায়, ‘হাফ ইঞ্চি’ পাথর ৭০ টাকায় এবং ‘তিন বাই চার’ আকারের পাথর ১৬০ থেকে ১৬২ টাকায় প্রতি ঘনফুট বিক্রি করেন।

‘ওসির লাইন’
স্থানীয়দের অভিযোগ, শাহ আরেফিন টিলা থেকে ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১০০ ট্রলি ও ট্রাক্টর পাথর পরিবহন করা হয়। একেকটি গাড়ি দিনে গড়ে দুই থেকে তিনবার পাথর নিয়ে যায়। প্রতিটি ট্রলি একেকবার অন্তত ৫০ ঘনফুট পাথর পরিবহন করতে পারে। এসব ট্রলিকে প্রতিবার পাথর পরিবহনের জন্য ২০০ টাকা দিতে টহলরত পুলিশকে। বাবুলনগর ও নোয়াগাঁও গ্রামের রাস্তায় ট্রলি আটক করে টাকা নেওয়া হয়। এ সময় পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, মাঝে মাঝে রাতে ‘ওসির লাইন’ নাম দিয়ে টিলা এলাকা থেকে পাথর ভোলাগঞ্জে যায়। পাথর-ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিরা থানার ওসিকে ‘ম্যানেজ’ করে এই লাইন পরিচালনা করেন। তখন বড় ট্রাক্টর দিয়ে পাথর সরানো হয়। অন্তত ১০০টি ট্রাক্টর গড়ে দুইবার পাথর পরিবহন করে।
সর্বশেষ ১৭ মার্চ ‘ওসির লাইন’ পরিচালিত হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। রাত ৩টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ট্রাক্টর নির্বিঘ্নে পাথর পরিবহন করে। এ ছাড়া টাকার ভাগের অংশ স্থানীয় কিছু নেতাও পেয়ে থাকেন বলে জানা গেছে।
‘ওসির লাইন’ এবং প্রতি ট্রলি থেকে ২০০ টাকা নেওয়ার বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মো. সফিকুল ইসলাম খান বলেন, “পুলিশ কোনো টাকা নেয় না। আমার নামে কোনো লাইন চলে না, আপনাদের কাছে তথ্য থাকলে যাচাই করেন। এসব অভিযোগ মিথ্যা।”
কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সিলেটের পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেক বলেছেন।
তিনি বলেন, “কতজন কত কথা বলে। পাথর নিয়ে কী হয়েছে, আপনারা সব জানেন। জেলা পুলিশের থেকে সবোর্চ্চ নির্দেশনা আছে পাথর নিয়ে কোনো অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পাথরবাহী প্রতি গাড়ি থেকে টাকা নেওয়া এবং ওসির নামে ‘লাইন’ চালুর বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “এটি আমার জানা নেই।”

শ্রমিকের ‘মৃত্যুকূপ’
শাহ আরেফিন টিলায় পাথর তুলতে গিয়ে গর্ত ধসে প্রথম শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি। ওইদিন একসঙ্গে ছয়জন শ্রমিক প্রাণ হারান। এ পরিস্থিতি ঠেকাতে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টাস্কফোর্সের ৪৩টি অভিযানে ১৬৮টি ‘বোমা মেশিন’ ধ্বংস করা হয়।
শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনায় সিলেটের জেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু শাফায়াত মুহাম্মদ শাহেদুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, পুলিশ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ ৪৭ জনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি-বেলা জানিয়েছে, নির্বিচার পাথর উত্তোলনের কারণে গর্ত ধসে ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত শাহ আরেফিন টিলায় ৩৮ জন শ্রমিক মারা গেছেন। আহত হন আরও কয়েক শ শ্রমিক।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা বলেন, “এখানে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। লুটেরারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ঢুকে পড়ে। তাই বড় ধরনের রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছাড়া এবং প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা ছাড়া এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমরা আশা করি, সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।”

‘২৫২ কোটি টাকার পাথর লুট’
শাহ আরেফিন টিলা ধ্বংস করে অবৈধভাবে ২৫২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার পাথর তোলার অভিযোগে মোহাম্মদ আলী (৪০) নামে একজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। ২০২১ সালে অক্টোবর মাসে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেন মামলাটি করেন। মামলার আসামি মোহাম্মদ আলী উপজেলার কাঁঠালবাড়ী এলাকার মেসার্স বশির কোম্পানির স্বত্বাধিকারী।
মামলায় বলা হয়, ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে ১৩৭ দশমিক ৫ একর আয়তনের শাহ আরেফিন টিলার ৬১ একর ভূমিতে পাথর তোলারা জন্য বশির কোম্পানিকে এক বছরের ইজারা দেয় খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো। ২০০৫ সালের এপ্রিল থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য এই ইজারা দেওয়া হয়। ইজারায় পাথর উত্তোলনে পরিবেশ সংরক্ষণসহ ১৩টি শর্তও দেওয়া হয়।
তবে কার্যাদেশ পাওয়ার পর সব শর্ত ভেঙে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন শুরু করে বশির কোম্পানি। শর্ত ভাঙার কারণে ইজারা বাতিল করে পাথর উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেয় খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা না মেনে পাথর উত্তোলন অব্যাহত রাখেন মোহাম্মদ আলী। এ ছাড়া গত কয়েক বছরে নির্ধারিত এলাকা ছাড়াও পুরো টিলা এলাকার ১৩৭ দশমিক ৫ একর ভূমি থেকে অবৈধভাবে পাথর তোলেন তারা। এতে ওই এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশের চরম বিপর্যয় ঘটে।
মামলায় বলা হয়েছে, টিলার ১৩৭ দশমিক ৫ একর ভূমি থেকে ৬২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫০ ঘনফুট পাথর তুলেছে মোহাম্মদ আলীর কোম্পানি। যার মাধ্যমে তিনি ২৫২ কোটি ৫৫ লাখ ৯০ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। অবৈধ ও প্রতারণামূলকভাবে পাথর তোলার অভিযোগে মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় মামলটি করে দুদক। মামলাটি চলমান।

লুটপাটে কারা
শাহ আরেফিন টিলায় পাথর লুটপাটের ঘটনায় ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে ৮৭ ‘পাথর-খেকোকে’ চিহ্নিত করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে অধিকাংশই।
চলতি বছরের ৯ এপ্রিল জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের নির্বাহী হাকিম সৈকত রায়হানের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে শাহ আরেফিন টিলা থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত ৯৬ হাজার ৮০০ ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়।
এর আগে ২০ মার্চ স্থানীয় প্রশাসন, বিজিবি, পুলিশের অবৈধ পাথর উত্তোলনবিরোধী যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় ৩৯টি পাথরবাহী ট্রাক্টর জব্ধ করা হয়। তবে ‘পাথরখেকোরা’ সেদিন পুলিশসহ অভিযান-সংশ্লিষ্টদের ওপর হামলা করে। ঘটনার পরদিন পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জ থানায় ১৪ জনের নাম দিয়ে এবং অজ্ঞাতনামা আট থেকে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।
আসামিদের মধ্যে রূপজান বিবি, জাহাঙ্গীর গাজী, মো. বিল্লাল, মো. মাসুক মিয়া, ছালিক মিয়া, আ. কাদির, কালা মিয়া, ফারুক মিয়া, এলাইছ মিয়া, মাসুক মিয়া, সাদ্দাম হোসেন, সোনা মিয়া, আশিক মিয়া, বশর মিয়ার নাম রয়েছে। এই আসামিদের শেষ আটজন আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত এবং একে অপরের ভাই। এ ছাড়া মামলার দুই নম্বর আসামি পাথর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয়রা বলেছেন, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেনের ভাই ও পুলিশের ‘লাইনম্যান’ হিসেবে পরিচিত আজিম আহমদ, পুলিশের ‘সোর্স’ হিসেবে পরিচিত এস কে সোহেল, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল আহমদ, আওয়ামী লীগের সমর্থক আলী হোসেন ও আব্দুল করিম পাথর ব্যবসা ও লুটের সঙ্গে জড়িত।
এ বিষয়ে জানতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল আহমদের মোবাইলে ফোন করলে তিনি ধরেননি।
এস কে সোহেল বলেন, “আমি জড়িত না, যদি আপনাদের কাছে কোনো প্রমাণ থাকে দেখান, আছে না ভিডিও। আর শাহ আরেফিন টিলার জমির মধ্যে আমার এক ইঞ্চি জায়গাও নাই। আমরা মূলত বা সারা এলাকার মানুষ পাথর দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করে।”

আওয়ামী লীগের সমর্থক আলী হোসেন বলেন, “আমি পাথর লুটের সঙ্গে জড়িত না। ভাই, আপনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখতে পারেন।”
আব্দুল করিম বলেন, “মানুষ বলতে পারে। তবে প্রশাসনিকভাবে পাথর চুরির কোনো মামলায় আমি নেই। যে বলছে, সে ভুল তথ্য দিয়েছে।”
এদিকে আজিম আহমদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
পুলিশ ও দলীয় নেতাকর্মীরা জড়িত থাকার বিষয়ে সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ-গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর) আসনের সংসদ সদস্য প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ ও যারা জড়িত তাদের না ধরতে পারলে কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও এবং ওসিকে বলেছি তাদের মামলার আসামি করা হবে।”