Published : 12 Sep 2025, 11:36 PM
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-জাকসু নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে ফের নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম।
তাদের অভিযোগ, ‘মিথ্যা আর অপপ্রচার করে’ ভোট শুরুর আগেই ছাত্রদলকে কোনঠাসা করে ফেলা হয়েছে। সেজন্য তারা নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন সদস্যকে দায়ী করছেন, যারা 'বিশেষ রাজনৈতিক মতাবলম্বী’।
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম শুক্রবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেছে, “এই বিশেষ রাজনৈতিক দল যদিও মুখে মুখে সব সময় সৃষ্টিকর্তার নাম নেয়, কিন্তু একটি নির্বাচনে বিজয়ের জন্য এরা মিথ্যাচারের মত পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত হয়নি।”
এর আগে বৃহস্পতিবার নির্বাচনে ভোটগ্রহণের মধ্যেই অনিয়ম আর কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করে ছাত্রদল। নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ক্যাম্পাসে কয়েক দফা বিক্ষোভ করে তারা।
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের বিবৃতিতে বলা হয়, “গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসত্য তথ্য প্রকাশ করা হয়। একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সদস্য ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা সেটি ফলাও করে প্রচার (ভাইরাল) করে।
“অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, ওই সময় রিটার্নিং অফিসারদের তত্ত্বাবধানে শুধুমাত্র ব্যালটবাক্সসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি পাঠানো হয়। ব্যালট পেপার বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠানো হয় নির্বাচনের দিন অর্থাৎ পরদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে। এ ধরনের ঘৃণ্য মিথ্যাচারের মাধ্যমে নির্বাচনের আগেই ছাত্রদলকে কোনঠাসা করে ফেলা হয়।”
ইসলামী ছাত্রশিবিরের নাম না নিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, “এই বিশেষ রাজনৈতিক দল যদিও মুখে মুখে সব সময় সৃষ্টিকর্তার নাম নেয়, কিন্তু একটি নির্বাচনে বিজয়ের জন্য এরা মিথ্যাচারের মত পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত হয়নি।”
বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা বলছেন, “নির্বাচন কমিশনের ওই 'বিশেষ রাজনৈতিক মতাবলম্বী সদস্যদের' ও তাদের দোসর প্রভোস্টদের অপতৎপরতায় জাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বয়কট করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল।
“জাল ভোট দেয়া ও প্রার্থী, প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকদের হয়রানি (মব) করার অভিযোগ উঠে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল (১৫ নং হল), জাহানারা ইমাম হল, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে।
“১৫ নম্বর হলের প্রভোস্ট সরাসরি একটি প্যানেলের পক্ষে ভোট চেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ও পর্যবেক্ষক দল ওই হলে ব্যালট পড়ে থাকা সহ নানা অনিয়ম প্রত্যক্ষ করেছেন। এছাড়া বিস্ময়করভাবে হল সংসদ নির্বাচনের ব্যালটে ক্রমিক নম্বর ও মুড়ি থাকলেও জাকসুর ব্যালটে এগুলো ছিল না। অথচ ক্রমিক নম্বর হল ভোটের বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য ব্যালট পেপারে থাকা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা, যা গণনার জন্য ব্যবহার করা হয়।”
বিবৃতিতে বলা হয়, “এমনকি পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকাও ছবি-সংযুক্ত আকারে সরবরাহ করা হয়নি, যা ভোটার শনাক্তকরণে জটিলতা সৃষ্টি করেছে। ভোটার তালিকায় অসঙ্গতি থাকায় বহু শিক্ষার্থী নিজ হলে ভোট দিতে পারেননি। দ্বৈত ভোটদানের মত নির্বাচনী জালিয়াতি প্রতিরোধের জন্য নির্বাচনী অমোচনীয় কালি ব্যবহার করা হয়নি অনেক ক্ষেত্রেই।
“আমরা মনে করি নির্বাচনের আগের রাতে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো ও নির্বাচনের দিন বিভিন্ন অনিয়ম একই সূত্রে গাঁথা। আমরা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের জিতিয়ে আনার জন্য আয়োজিত এই প্রহসনের নির্বাচনের তীব্র নিন্দা জানাই ও অভিযোগগুলো সুষ্ঠু সুরাহার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জোর দাবি জানাই।”
বৃহস্পতিবার দিনভর ভোটগ্রহণ করে রাত ১০টার পর ভোট গণণা শুরু হয়। কিন্তু গণনা শেষ না হওয়ায় শুক্রবার মধ্যরাতেও ফল ঘোষণা করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর এই ক্যাম্পাসে দিনভর ভোট শেষে প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলেও জামায়াত সংশ্লিষ্ট কোম্পানি থেকে ব্যালট পেপার ও ওএমআর মেশিন সরবরাহ করা, পোলিং এজেন্টের অনুমতি থাকলেও তাদের প্রবেশে বাধা দেওয়া, ডোপটেস্টের ফলাফল না আসা, নির্বাচনকে ‘ম্যানিপুলেট’ করার নানা অভিযোগ ওঠে এ নির্বাচনে।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার দেড় ঘণ্টা আগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল। পরে ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ) সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানায়। পরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয় ‘সংশপ্তক পর্ষদ’ প্যানেল। একই পথে হাঁটে ‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আংশিক প্যানেলের প্রার্থীরা। তাদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও ঘোষণা দেন ভোট বর্জনের।
এ ছাড়া নির্বাচনি দায়িত্ব থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষক। তারা হলেন, গণিত বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম ও অধ্যাপক শামিমা সুলতানা।
শুক্রবার রাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার।